বাঙালি জাতিকে শোষণ করার দীর্ঘ একটি ইতিহাস আছে। অতীতে বিভিন্ন সময় বাঙালি জাতি শোষিত হয়েছে বহিরাগত শাসকগোষ্ঠীর মাধ্যমে। এখন বহিরাগত শাসক নেই, তবু শোষিত হচ্ছে। শোষিত হচ্ছে নিজেদের দ্বারাই। নিজেদের মধ্যেই এখন সৃষ্টি হয়েছে একটি শোষকগোষ্ঠী। শোষণ করছে নিজেদেরকেই। তাই বাঙালি এখন একই সাথে শোষক ও শোষিত।
স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে এই বিভাজন তৈরি হয়েছে এবং ক্রমশ বেড়েছে। ব্রিটিশ ও পাকিস্তান আমলে নিজেদের মধ্যে এই শোষক-শোষিত বিভাজন ছিল না। কারণ, তখন সবাই ছিল শোষিত। শোষিতদের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই একটি ঐক্য থাকে। শোষণের অবসান ঘটলে সেই ঐক্য আর থাকে না। তখন মানুষ ব্যক্তিকেন্দ্রিক হয়ে যায়। ব্যক্তিস্বাতন্ত্রবাদী চেতনা মানুষকে বিচ্ছিন্ন করে। বিচ্ছিন্ন মানুষ সব সময় নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত থাকে। নিজের স্বার্থে অন্যের স্বার্থ নষ্ট করে। নিজের সাথে অন্যের একটি বিভাজন সৃষ্টি করে। এভাবে সে হয় শোষক হয়ে ওঠে, নয়তো শোষিত হয়।
সাম্রাজ্যবাদী শোষণ কিংবা ঔপনিবেশিক শোষণের সাথে জাতির অভ্যন্তরীণ শ্রেণিশোষণের একটি পার্থক্য আছে। সাম্রাজ্যবাদী শোষণ হলো দখলদার কর্তৃক শোষণ। অন্যের দখলে থাকলে শোষিত হতে হয়। সেই শোষণ মেনে না নিয়ে উপায় থাকে না। তখন শোষিত জনগোষ্ঠী ঐক্যবদ্ধভাবে শোষিত হয়। ঔপনিবেশিক শোষণের চিত্রও অনেকটা একই। দখলকে দীর্ঘস্থায়ী করার জন্য দখলদাররাই উপনিবেশ তৈরি করে।
ঔপনিবেশিক শক্তি সব সময় শোষণের একটি রূপরেখা তৈরি করে নেয়। সেই রূপরেখায় শাসক ও শাসিতের মধ্যে একটি আইনগত বিষয় থাকে বটে; কিন্তু শোষণের পথও উন্মুক্ত থাকে। শাসকশক্তি উপনিবেশকে নানাভাবে শোষণ করে নিজেদের দেশকে সমৃদ্ধ করে। ভারতবর্ষ যখন ব্রিটিশ উপনিবেশ ছিল, তখন ব্রিটিশ শাসক ভারতবর্ষে কিছু উন্নয়নমূলক কাজ করেছে। অবকাঠামো উন্নয়ন ছাড়াও শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়ন, স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়ন এবং কিছু আচরণিক উন্নয়নের ফলে ভারতবাসীর জীবনযাত্রায় পরিবর্তন এসেছিল বলে অনেকে ইংরেজ শাসকের প্রশংসা করেন।
ভারতবাসীকে আধুনিক বিশ্বের সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে ইংরেজ। আবার ভারতকে শোষণও করেছে সবচেয়ে বেশি। দেশভাগের সাথে বৃহৎ বাংলাও বিভক্ত হয়েছিল। বাংলার পূর্ব অংশ মুসলিমপ্রধান হওয়ায় পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল। পাকিস্তান সরকার ঔপনিবেশিক কায়দায় শোষণ করেছে দেশের এই পূর্ব অংশটি। ভৌগোলিকভাবে বিচ্ছিন্ন থাকার কারণে এই বৈষম্য ও শোষণ এতটাই উন্মুক্ত হয়েছিল যে তার সমাপ্তি ঘটেছিল মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশ নামক নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ফলে। বাঙালি জাতির এই ধারাবাহিক শোষণ ও সম্পদ নির্গমনের বিষয় তুলে ধরাই বর্তমান প্রবন্ধের লক্ষ্য।
পাল যুগ, সেন যুগ ও সুলতানি আমলে বাঙালি জাতির সমাজজীবনে খুব বেশি পরিবর্তন সাধিত হয়নি। সে সময় শাসকগোষ্ঠী ধর্ম, ভাষা ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে বিশেষ ভাষা ও ধর্মের পৃষ্ঠপোষকতা দিত বলে অন্যান্য ধর্ম, ভাষা ও সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল সমৃদ্ধ হতে পারত না। এটাকে সাংস্কৃতিক শোষণ বলা যেতে পারে।
মোগল আমল থেকে অর্থনৈতিক শোষণ প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেতে থাকে। এ সময় বাংলায় স্বাধীন নবাবি আমলের সূচনা হলেও দিল্লির সম্রাটকে মোটা অঙ্কের অর্থ দিয়েই নবাবি শাসন পরিচালনা করতে হতো। মোগল সম্রাট আকবর ১৫৮৬ খ্রিস্টাব্দে বাংলা অধিকার করে নতুন রাজস্বব্যবস্থা চালু করেন। তার আগে বারো ভূঁইয়ারা স্বাধীনভাবেই নিজ নিজ জমিদারি পরিচালনা করতেন।
বারো ভূঁইয়াদের হাত থেকে বাংলা অধিকার করে সম্রাট আকবর রাজা মানসিংহকে বাংলার সুবাদার নিযুক্ত করেন (১৫৯৪)। তখন থেকে সুবা বাংলার রাজস্ব দিয়ে বাংলার উন্নয়ন হোক বা না হোক, দিল্লির দরবারে নিয়মিত রাজস্ব দিতেই হয়েছে। সম্রাট আকবরের মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র জাহাঙ্গীর দিল্লির সিংহাসনে আরোহণ করেন।
সম্রাট জাহাঙ্গীর বাংলা থেকে বছরে ১০ লাখ টাকা নিতেন। সুবাদার শায়েস্তা খানের দৈনিক আয় ছিল দুই লাখ টাকা, যা তৎকালীন বিশ্বে ছিল বিরল ঘটনা। তাঁর সময় খাদ্যদ্রব্যের মূল্য কম ছিল। এই কম থাকার একটি মন্দ দিকও ছিল। টাকায় আট মণ চাল পাওয়া যেত বলে যে ইতিহাস পাওয়া যায়, সে ইতিহাসের উল্টোপিঠও বিবেচনায় আনা প্রয়োজন।
তখন বাংলার বেশির ভাগ লোক কৃষক ছিল। ফসল বিক্রি করেই তারা অন্যান্য প্রয়োজন মেটাত। তাই শস্যের দাম কম হওয়ায় তাদের খুব একটা লাভ হয়নি। বরং কম দামে শস্য বিক্রি করে খাজনা পরিশোধ করা তাদের জন্য কষ্টকর হয়েছে। মোগল সম্রাটদের মাত্রাতিরিক্ত বিলাসিতা আর ব্যয়বহুল স্থাপত্যের পেছনে ব্যয়িত বিপুল পরিমাণ অর্থের একটি বড় অংশের জোগান দিতে হয়েছে বাংলার দরিদ্র কৃষকদের।
মোগল হেরেম আর দৃষ্টিনন্দন দিল্লি শহর নির্মাণের পেছনে যে বাংলার কত হতদরিদ্র কৃষকের চোখের জলও যুক্ত আছে, সে খবর কে রেখেছে? কিছুটা পাওয়া যায় সাহিত্যে। এ বিষয়ে বহুল প্রচলিত লোকছড়াটি হলো-
খোকা ঘুমালো পাড়া জুড়ালো
বর্গী এলো দেশে। বুলবুলিতে ধান খেয়েছে
খাজনা দিব কিসে। ধান ফুরালো পান ফুরালো
খাজনার উপায় কী। আর কটা দিন সবুর করো
রসুন বুনেছি।
শান্তিপ্রিয় আর অসহায় কৃষকদের কষ্টার্জিত শস্য বর্গিরা লুট করে নিলে বুলবুলি পাখি বা অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগে ফসল খোয়া গেলে, এমনকি ধান ও পান ফুরিয়ে গেলেও সামনে যে শস্য ঘরে আসছে (রসুন) সেই শস্য বিক্রি করে খাজনা দেয়ার কথা চিন্তা করতে হতো কৃষকদের। বোঝাই যায়, শতকষ্টেও বাংলার কৃষকদের খাজনা দিতে হতো শাসকগোষ্ঠীর বিলাসিতার ব্যয় মেটানোর জন্য।
সুবাদার ইসলাম খাঁ সমগ্র বাংলায় মোগল শাসন সুদৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তিনি ঢাকায় অবস্থান করতেন এবং রাজমহল থেকে ঢাকায় রাজধানী স্থানান্তর করেছিলেন। মোগল সিম্রাট জাহাঙ্গীরের প্রতি গভীর আনুগত্য দেখিয়ে নতুন রাজধানী ঢাকার নামকরণ করেছিলেন জাহাঙ্গীরনগর (১৬১২)। মোগল আমলে বাংলার আরেকজন প্রভাবশালী সুবাদার ছিলেন শাহজাদা সুজা (সম্রাট শাহজাহানের পুত্র)। তিনি প্রায় ২১ বছর বাংলার শাসক ছিলেন। বাংলায় ইংরেজ বেনিয়াদের বাণিজ্যিক প্রভাব বিস্তারের সুযোগ সৃষ্টি করে দিয়েছিলেন তিনি। জেব্রাইল ব্রাউটন নামক এক ইংরেজ ডাক্তারের চিকিৎসায় সন্তুষ্ট হয়ে তিনি মাত্র তিন হাজার টাকা নজরানার বিনিময়ে সারা বাংলায় ইংরেজ বণিকদের বিনা শুল্কে বাণিজ্য করার অনুমতি দিয়েছিলেন। এতে বাংলার ব্যবসায়ীরা দারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল এবং বাংলার সম্পদ ইংল্যান্ডের ডান্ডি, ম্যানচেস্টারে পাচার হওয়ার পথ সৃষ্টি হয়েছিল।
পরবর্তী সময়ে বাংলায় ইংরেজ বণিকদের বাণিজ্য বহুগুণে বৃদ্ধি পেলেও তারা আগের মতোই তিন হাজার টাকাই নজরানা দিয়ে বিনা শুল্কে বাণিজ্য করত। সম্রাট আওরঙ্গজেবের আমলে সুবাদার শায়েস্তা খান ইংরেজ বণিকদের এই বিশেষ সুবিধা বাতিল করার চেষ্টা করলে ইংরেজদের সাথে সম্পর্কের অবনতি ঘটে। সম্রাট আওরঙ্গজেবের শাসনামলের শেষ দিকেই মোগল সাম্রাজ্যের পতন শুরু হয়। এ সময় মোগল রাজপরিবার প্রধানত বাংলার রাজস্ব দিয়েই চলত। ফলে তৎকালীন বাংলার সুবাদার মুর্শিদকুলী খানকে সম্রাট রাজস্ব ব্যাপারে সম্পূর্ণ স্বাধীনতা দিয়েছিলেন। এই স্বাধীনতার সুযোগে সুবাদার মুর্শিদকুলী খান নিজেকে নবাব হিসেবে ঘোষণা করে নবাবি আমলের সূত্রপাত করেন। কিন্তু তখনো বাংলা থেকে দিল্লির দরবারে রাজস্ব পাঠানো হতো। ‘নবাবি আমলে বাংলা থেকে দিল্লিতে (মোগল সম্রাটের দরবারে) এক কোটি পাঁচ লাখ টাকা থেকে এক কোটি পঁচিশ লাখ টাকা পর্যন্ত রাজস্ব নজরানাস্বরূপ পাঠানো হতো’ [ ড. এস এম হাসান, বাংলার ইতিহাস, পৃ.৩৩৭]।
মোগল সাম্রাজ্যের পতনের মাধ্যমে ভারতবর্ষে ইংরেজ শাসনের সূচনা হয়। বাংলায় নবাব আলীবর্দী খানের শাসনামলে ইংরেজ বণিকদের প্রভাব অনেক বেড়ে যায়। আলীবর্দী খান মারাঠা দস্যু বা বর্গীদের দমন করার জন্য প্রচুর অর্থ খরচ করেন এবং সময় সময় এই অর্থ ইংরেজদের নিকট থেকেও আদায় করতেন। নবাবকে সাহায্য করার সুযোগ নিয়ে ইংরেজরা আরও প্রভাবশালী হয়ে ওঠে। পরবর্তী সময়ে সিরাজউদ্দৌলার শাসনামলে পলাশীর যুদ্ধে (১৭৫৭) ষড়যন্ত্রমূলকভাবে বিজয়ী হয়ে শাসন ও শোষণ ক্ষমতা লাভের পথ নির্মাণ করে। বক্সারের যুদ্ধে (১৭৬৪) মীর কাসিমকে পরাজিত করে বাংলার আধিপত্য লাভ করে ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। ১৭৬৫ খ্রিস্টাব্দে সম্রাট দ্বিতীয় শাহ আলমের এক ফরমান বলে কোম্পানি বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার দেওয়ানি লাভ করে এবং একই সাথে বাংলায় নবাবের রাজত্ব শেষ হয় এবং কোম্পানির শাসন শুরু হয়। শুরুতেই কোম্পানি দিল্লির সম্রাটের বৃত্তি বন্ধ করে দেয় এবং বাংলার নবাবের বৃত্তি ৫৩ লাখ টাকা থেকে কমিয়ে প্রথমে ৪১ লাখ এবং পরে তা ৩২ লাখ নির্ধারণ করে। অন্যদিকে রাজস্ব আদায় মাত্রাতিরিক্ত হারে বৃদ্ধি করে। এ সম্পর্কে রেজা খান অভিযোগ করেন যে, নবাব আলীবর্দী খানের আমলে পূর্ণিয়া জেলায় বাৎসরিক রাজস্ব যেখানে মাত্র ৪ লাখ টাকা ছিল, সেখানে ১৭৬৯ খ্রিস্টাব্দে তা বৃদ্ধি করে ২৫ লাখ টাকায় উন্নীত করা হয়। অন্যান্য জেলাতেও একইভাবে রাজস্ব বৃদ্ধি পায়। রাজস্ব বৃদ্ধি পেলেও তা দিয়ে বাংলার উন্নয়ন হয়নি। বেশির ভাগ অর্থই চলে গেছে ইংল্যান্ডে। এর ফলেই বাংলায় দেখা দিয়েছিল ‘ছিয়াত্তরের মন্বন্তর’ (১১৭৬ বঙ্গাব্দ) নামক ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ। সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর ‘আনন্দমঠ’ উপন্যাসে এই ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের বর্ণনা দিয়েছেন। কোম্পানির শাসনামলে বাংলাকে যেভাবে শোষণ করা হয়েছিল, তা শোষণের ইতিহাসের এক বড় অধ্যায়। ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দে সিপাহি বিপ্লবের মাধ্যমে এক শ বছরের কোম্পানি শাসনের অবসান হলে যে প্রকৃত ব্রিটিশ শাসন শুরু হয়, সেই শাসনেও বাংলার সম্পদ নির্গমনের ধারাবাহিকতা বজায় ছিল।
১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দে ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটে। বাংলা দুইভাবে বিভক্ত হয়ে পাকিস্তান অংশে পড়ে মুসলিম প্রধান পূর্ব বাংলা। শুরু হয় শোষণের আরেক ইতিহাস। এবার শুধু অর্থনৈতিক শোষণ নয়, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক শোষণের কবলে পড়ে বাঙালি জাতি। বাঙালি জাতির আত্মপরিচয় বিলুপ্ত করার ষড়যন্ত্র শুরু করে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী। প্রথমে বাংলা ভাষার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে ব্যর্থ হয়। তারপর বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের বাতিঘর রবীন্দ্রনাথকে বর্জন করে। মূলত সেখানেও ব্যর্থ হয়। কিন্তু অর্থনৈতিক শোষণ চালায় খুব সফলভাবে। পূর্ব পাকিস্তানের জনসংখ্যা বেশি হলেও রাজধানী স্থাপন করে পশ্চিম পাকিস্তানে। রাজনৈতিক তাৎপর্যমণ্ডিত শহর লাহোরকে বাদ দিয়ে করাচিতে রাজধানী স্থাপন করা হয় এবং রাজধানী উন্নয়নের নামে ২০০ কোটি টাকা খরচ করা হয়। পরবর্তী সময়ে আইয়ুব খান ইসলামাবাদে রাজধানী স্থানান্তর করে এর উন্নয়নের জন্য ব্যয় করেন ২০ কোটি টাকা। এ সময় ঢাকার উন্নয়নের জন্য ব্যয় করা হয় মাত্র ২ কোটি টাকা। সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনীর সদর দপ্তর এবং সমস্ত অস্ত্র কারখানা স্থাপিত হয় পশ্চিম পাকিস্তানে। সামরিক বাহিনীর চাকরিগুলো ছিল পশ্চিম পাকিস্তানের প্রায় একচেটিয়া। ফলে সামরিক খাতে ব্যয়িত অর্থের (বার্ষিক আয়ের ৭৫% এবং পরে ৬০%) সুবিধাভোগী ছিল সম্পূর্ণ পশ্চিম পাকিস্তানের জনগণ। ১৯৫৯-৬০ খ্রিস্টাব্দে পশ্চিম পাকিস্তানের জনগণের মাথাপিছু আয় ছিল পূর্ব পাকিস্তানের তুলনায় ৩২% বেশি। দশ বছর পরে (১৯৬৯-৭০) পার্থক্যের পরিমাণ এসে দাঁড়ায় ৬১%। কেন্দ্রীয় সরকারের সব হেড অফিস ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের হেড অফিস পশ্চিম পাকিস্তানে থাকায় পূর্ব পাকিস্তান থেকে অবাধে অর্থ চলে যেত পশ্চিম পাকিস্তানে। এভাবে পূর্ব পাকিস্তানের অর্জিত অর্থ দিয়েই হতো পশ্চিম পাকিস্তানের উন্নয়ন। পাকিস্তানের মোট জনসংখ্যার ৫৬% ছিল পূর্ব পাকিস্তানে। অথচ কেন্দ্রীয় সরকার পূর্ব পাকিস্তানের জন্য ব্যয় করত ২০% (পরে ৩০% করা হয়েছিল)। পাকিস্তান সৃষ্টির ১৫ বছরের মাথায় পূর্ব পাকিস্তানের রাজস্ব ঘাটতি দেখা দেয় ৬০ কোটি টাকা। অথচ পশ্চিম পাকিস্তানে উদ্বৃত্ত হয় ৩৮ কোটি টাকা। কেন্দ্রীয় সরকারের এই সীমাহীন শোষণের ফলেই বাঙালি জাতি মুক্তির সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং ১৯৭১- এর ১৬ ডিসেম্বর অর্জন করে হাজার বছরের কাঙিক্ষত স্বাধীনতা।
একাত্তর-পরবর্তী বাংলাদেশ কি শোষণমুক্ত হতে পেরেছে? মোগল আমলে দিল্লির অধীনস্ত হওয়ার আগে প্রায় চার শতাব্দী পর্যন্ত অধিকাংশ সময় বাংলা স্বাধীন ছিল। সে সময় বাংলার ধন-সম্পদ বাংলায়ই থাকত। ফলে মোগলপূর্ব বাংলা খুবই সমৃদ্ধ ছিল। বিশ্ববিখ্যাত পর্যটক ইবনে বতুতা বাংলায় এসেছিলেন ১৩৪৬ খ্রিস্টাব্দে। তাঁর বর্ণনা থেকেও বাংলার সেই সমৃদ্ধির প্রমাণ পাওয়া যায়। মূলত মোগল আমল থেকেই শুরু হয় শোষণের সংস্কৃতি। মোগল আমলে বাংলার অর্থ চলে গেছে দিল্লিতে, ইংরেজ আমলে বাংলার অর্থ চলে গেছে ইংল্যান্ডে আর পাকিস্তান আমলে বাংলার অর্থ চলে গেছে পশ্চিম পাকিস্তানে। একাত্তর-পরবর্তী স্বাধীন বাংলাদেশের অর্থ কোথাও যাবে না; বাংলাদেশেই ব্যয় হবে, বাংলাদেশ হবে সুখী-সমৃদ্ধ সোনার বাংলা; এই আকাঙ্ক্ষা থেকেই মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী বাংলাদেশ শোষণমুক্ত হয়নি। বাংলাদেশের অর্থ বিদেশে পাচার হওয়াও বন্ধ হয়নি। এখন মোগল নেই, ইংরেজ নেই, পাকিস্তানি শোষকরাও নেই। তাহলে কে শোষক? শোষক নিজেদের মধ্যেই।
এখন বাঙালি নিজেদের দ্বারাই নিজেরা শোষিত। বাংলাদেশের অর্থ এখন আমেরিকা, কানাডা, মালয়েশিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পাচার হয় দেশের একশ্রেণির নীতিহীন রাজনীতিক, দুর্নীতিবাজ আমলা ও অসাধু ব্যবসায়ী-শিল্পপতিদের দ্বারা। যে দেশপ্রেমের চেতনায় মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল, তা এখন বিলুপ্তির পথে। দেশপ্রেম আর মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এখন আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে গেছে। জাতির জনক শেখ মুজিবুর রহমান বড় দুঃখ করে বলেছিলেন, “সবাই পায় সোনার খনি আর আমি পেয়েছি চোরের খনি।” বঙ্গবন্ধুর স্বল্পকালীন শাসনামলে ওই চোরদের দমন করা সম্ভব হয়নি। এখন ওই চোরদেরই বংশবিস্তার ঘটেছে। এরা দেশের টাকা চুরি করে বিদেশে পালিয়ে যায়। পাকিস্তান আমলে সামারিক-বেসামরিক অনেক আমলা টাকার কুমির হয়েছিল। তাদের পরিবার-পরিজন বিলাসী জীবন যাপন করতে করতে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল। বিষয়টিকে উপজীব্য করে কবি ও সাংবাদিক আব্দুল গণি হাজারী লিখেছিলেন ‘আমরা কতিপয় আমলার স্ত্রী’ নামক একটি প্রতীকী কবিতা। কবিতাটি ১৯৬৪ খ্রিস্টাব্দে ইউনেস্কো পুরস্কার লাভ করেছিল। বর্তমানে বাংলাদেশেও সামরিক-বেসামরিক অনেক আমলা সীমাহীন সম্পদের মালিক হয়ে যাচ্ছে। অসাধু রাজনীতিক ও ব্যবসায়ীরাও সম্পদের পাহাড় গড়ছে। বিদেশেও পাচার করছে। কানাডায় বেগম পাড়া আর মালয়েশিয়ায় সেকেন্ড হোম এই বাংলাদেশের অর্থেই গড়ে উঠেছে।
প্রাচীন বাংলা ধন-সম্পদে পরিপূর্ণ ছিল। বাংলার কৃষকের ‘গোলাভরা ধান, গোয়ালভরা গরু আর পুকুরভরা মাছ’ ছিল - কথাটি শুধু কথার কথা নয়। ইবনে বতুতা বাংলাকে ‘দোজখপুর নিয়ামত’ বা ধন-সম্পদে পরিপূর্ণ নরক বলেছিলেন। কারণ, বাংলার ধন-সম্পদে আকৃষ্ট হয়ে বহিঃর্শক্তি বাংলা আক্রমণ করে ধন-সম্পদ লুট করে নিত। লুণ্ঠনের এই ধারাবাহিকতা বর্তমানেও চলছে। তবে এখন বাইরের শক্তি নয়; ভেতরের শক্তিই লুণ্ঠন করছে। তারাই সম্পদ পাচার করছে। সম্পদ পাচারের সাথে এখন যোগ হয়েছে মেধা পাচার। মেধাবীরা এখন দেশ ছেড়ে যাওয়ার জন্য ব্যস্ত। ধরে রাখার চেষ্টাও নেই খুব একটা। প্রবাসে গিয়ে প্রায় সবাই স্থায়ী হতে চায়। যারা পিছিয়ে পড়ে, তারাই ফিরে আসে। ভালো কিছু করতে পারলে স্থায়ী হয়ে যায় প্রবাসেই। এটা দেশের জন্য শুভ লক্ষণ নয়। দেশের অবকাঠামো উন্নয়ন হচ্ছে। তবে সুশাসন ব্যতিত শুধু অবকাঠামো উন্নয়নকে প্রকৃত উন্নয়ন বলা যায় না। দুর্নীতি ক্রমশ বাড়ছে। ফলে মানবিক সমাজ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হচ্ছে না। শোষণ ও দুর্নীতিমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠিত না হলে সম্পদ ও মেধা দুটোই পাচার হয়ে যাবে। যেখানে মানুষের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠিত নয়, মানুষ সেখান থেকে মাইগ্রেট হয়ে যাবেই। তবে বাঙালির মাইগ্রেশন ঘটেছে দুইভাবে। কেউ শোষিত হয়ে দেশ ছেড়েছে। আবার কেউ শোষণ করে দেশ ছেড়েছে। যারা শোষণ করে দেশ ছেড়েছে, তারা একা যায়নি, সম্পদ নিয়ে গেছে। এখনো যাচ্ছে।
মোবারক হোসেন ছিলেন শহরের প্রান্তে ছোট একটি ব্যবসার মালিক। সারা জীবন হিসাবি, কিপ্টে ও আত্মকেন্দ্রিক মনোভাবের কারণে তাঁর সুনাম কখনো গড়ে ওঠেনি। ছেলেবেলায় তাঁর পরিবার অভাবী ছিল, কিন্তু মা-বাবা সব সময় চেষ্টা করতেন সন্তানদের প্রয়োজন পূরণ করতে। অথচ সেই মোবারক সামান্য টাকা জমাতে গিয়ে মা-বাবার ওষুধ কেনা থেকেও পিছপা হয়েছেন। আত্মীয়স্বজনের বিপদে কখনো একটি পয়সা দেননি, এমনকি বন্ধুবান্ধবের কাছ থেকে দূরে থেকেছেন কেউ ধার চেয়ে বসে এই ভয়ে। সময়ের সাথে সাথে মোবারকের ব্যবসা জমে উঠল। দোকান থেকে উপার্জিত টাকা তিনি ব্যাংকে জমাতেন, ফিক্সড ডিপোজিট করতেন, আর স্বর্ণ কিনে লুকিয়ে রাখতেন পুরোনো ট্রাংকে। কেউ জানত না তাঁর আসল সম্পদের পরিমাণ। অথচ নিজের বাড়িটাও পুরোনো, ফাটল ধরা দেয়ালে ভরা। সেখানেই থাকতেন একাকী, রান্নার কাজ করতেন নিজেই, যেন একটা ডিমও অপচয় না হয়। বয়স যখন ষাট পেরিয়েছে, তখন হঠাৎ একদিন সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি একটি বাগানবাড়ি বানাবেন শহরের বাইরে। শেষ বয়সে একটু খোলামেলা পরিবেশে থাকা যাবে, এই যুক্তি দেখিয়ে অনেক টাকা খরচ করলেন। বাড়িটি বানাতে গিয়ে বহু শ্রমিক, ইঞ্জিনিয়ার নিয়োগ দিলেন। মোবারক বাড়ির সব খরচ নিজ হাতে হিসাব রাখতেন। ঘরগুলো আধুনিক, দেয়ালে কাঠের কারুকাজ, বারান্দায় দোলনা — সবই পরিপাটি, নিখুঁত। কিন্তু তবুও কেউ ছিল না পাশে। তিন বছর পর ওই বাড়িতে গিয়ে থাকতে শুরু করলেন মোবারক। বড় গেট, ফুলে ভরা বাগান, হাঁটার পথ, বিশ্রামের ছায়া — সবই ছিল, কিন্তু সঙ্গী বলতে কেউ ছিল না। একদিন হঠাৎ অসুস্থ বোধ করলেন। গা কাঁপুনি, জ্বর, দুর্বলতা। স্থানীয় ডাক্তার প্রথমে পাত্তা দিলেন না। কিন্তু দিন পেরোতে না পেরোতেই বোঝা গেল সমস্যাটা গুরুতর। শহরে গিয়ে রক্ত পরীক্ষা করালেন। ধরা পড়ল প্যানক্রিয়াস ক্যান্সার, তৃতীয় স্টেজ। হাসপাতালে শুয়ে শুয়ে মোবারক প্রথমবারের মতো ভাবলেন, এই বিশাল বাড়ি, জমানো টাকা, ব্যাংক ব্যালেন্স — সবই কেমন অর্থহীন লাগছে! জীবন এতটাই ক্ষণস্থায়ী, অথচ তিনি সারা জীবন কাটালেন হিসেব কষে। বাবার জীবনের শেষ সময়ে একটা ইনহেলার কেনেননি, মায়ের চোখে ছানি অপারেশনের খরচ দিতে অস্বীকার করেছিলেন। ভাতিজার পড়াশোনার খরচ না দেয়ায় কলেজে ভর্তি হতে পারেনি ছেলেটি। আজ সেই মোবারকের পাশে কেউ নেই। এক সন্ধ্যায় হাসপাতালের জানালায় তাকিয়ে থাকতে থাকতে চোখ ভিজে উঠল তাঁর। ছোট একটি মেয়ে পাশের রোগীকে তার বাবাকে ফল খাওয়াচ্ছে। দৃশ্যটি তাঁকে মনে করিয়ে দিল, তাঁর একটাই দোষ, ‘ভয় আর অবিশ্বাসে ভরা এক হৃদয়’। তিনি ভালোবাসতে পারেননি, কাউকে বিশ্বাস করতে পারেননি, এমনকি কাছের লোকজনকেও সাহায্য করতে পারেননি। টাকা ছিল, হৃদয় ছিল না। মোবারক সেই রাতে একজন নার্সকে ডেকে বললেন, “একটা কাজ করে দেবে মা?” নার্স বলল, “বলুন কাকা।” তিনি বললেন, “এই চিঠিটা আমার এলাকার মসজিদের ইমাম সাহেবকে পৌঁছে দেবে। আর যদি আমি বেঁচে না থাকি, আমার ঘরের আলমারির ভেতর থেকে সব কাগজ ও টাকা আমার গ্রামের দরিদ্র লোকজনের জন্য ওয়াকফ করে দিয়ো।” চিঠিতে তিনি তাঁর কিপ্টামির স্বীকারোক্তি লিখেছিলেন। ক্ষমা চেয়েছিলেন মা-বাবার কাছেও। আর সব সম্পত্তি দিয়ে যেতে চেয়েছিলেন এতিমখানা, হাসপাতাল এবং গ্রামের দরিদ্রদের জন্য। দুদিন পর মোবারক হোসেন মারা গেলেন। কেউ খুব একটা কাঁদেনি, কিন্তু তাঁর চিঠি যখন প্রকাশিত হলো, তখন অনেকের চোখে পানি এসেছিল। এক কাপুরুষ, কিপ্টে মানুষ শেষ জীবনে বুঝেছিলেন, মানুষের জীবনের আসল সম্পদ টাকা নয়, বরং সম্পর্ক, সহানুভূতি আর উদারতা। তাঁর তৈরি বাগানবাড়িটি এখন এক বৃদ্ধাশ্রম, যেখানে অনাথ ও অসহায় বৃদ্ধরা বসবাস করেন। তাঁর কিপ্টে জীবনের শেষ অধ্যায়ে পাওয়া অনুশোচনাই হয়তো মানুষের জন্য বড় একটি প্রাপ্তি হয়ে রয়ে গেল — একটা নিঃশব্দ শিক্ষা।
চলতি বছরের আগস্টের শেষ দিকে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে বলে জানিয়েছেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম। তিনি আশা প্রকাশ করেন, আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে কেন্দ্রটির প্রথম ইউনিট থেকে ১,০০০ মেগাওয়াটেরও বেশি বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা সম্ভব হবে। অন্যদিকে নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেডের (এনপিসিবিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. মো. জাহেদুল হাসান জানিয়েছেন, কেন্দ্রটির প্রথম ইউনিট ২০২৭ সালের শুরুতে এবং দ্বিতীয় ইউনিট ২০২৮ সালের শুরুতে পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্যিক উৎপাদনে যাবে। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের নিরাপত্তা, কমিশনিং, পরিচালনাগত প্রস্তুতি এবং সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত নানা প্রতিবেদনকে কেন্দ্র করে জনমনে বিভিন্ন প্রশ্ন ও কৌতূহল তৈরি হয়েছে। এসব বিষয়ে ড. জাহেদুল হাসানের সঙ্গে কথা হলে তিনি কেন্দ্রটির নিরাপত্তা, পরিচালনা, আন্তর্জাতিক তদারকি কাঠামোসহ গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সম্পর্কে ব্যাখ্যা দেন। ড. জাহেদুল হাসান বলেন, একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র কোনো একক প্রতিষ্ঠানের সিদ্ধান্তে পরিচালিত হয় না। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে একাধিক স্বাধীন কারিগরি, নিয়ন্ত্রক ও নিরাপত্তা সংস্থার সমন্বিত তদারকির মাধ্যমে এর প্রতিটি ধাপ পরিচালিত হয়। তিনি জানান, বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন (বিএইসি) প্রকল্পের মালিক হিসেবে নির্মাণ চুক্তি বাস্তবায়ন এবং স্থাপনা গ্রহণের দায়িত্ব পালন করছে। নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেড আইন অনুযায়ী কেন্দ্রটির অপারেটিং অর্গানাইজেশন। কমিশনিং, নিরাপদ পরিচালনা, রক্ষণাবেক্ষণ এবং ভবিষ্যতে ডিকমিশনিং পর্যন্ত সব অপারেশনাল দায়িত্ব এনপিসিবিএলের ওপর ন্যস্ত। অন্যদিকে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ একটি স্বাধীন নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে আন্তর্জাতিক ও জাতীয় নিরাপত্তা মানদণ্ড অনুযায়ী প্রকল্পের প্রতিটি ধাপ মূল্যায়ন করে প্রয়োজনীয় লাইসেন্স প্রদান করছে। কমিশনিং কার্যক্রমের স্বাধীন কারিগরি মূল্যায়নের জন্য বিএইবিএ আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ভিও সেফটিকে এক্সপার্ট অর্গানাইজেশন হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে। এ ছাড়া রাশিয়ার সিআরইএ কমিশনিং, অপারেশনাল প্রস্তুতি, অপারেটর প্রশিক্ষণ এবং জ্ঞান স্থানান্তরে এনপিসিবিএলকে সহায়তা করছে। রাশিয়ার স্বাধীন নিয়ন্ত্রক সংস্থা Rostechnadzor গুরুত্বপূর্ণ কমিশনিং পর্যায়ে বিএইআরএর সঙ্গে প্রযুক্তিগত অভিজ্ঞতা বিনিময় করছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা বিভিন্ন Peer Review Mission ও Technical Review পরিচালনার মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রস্তুতি আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মানদণ্ড অনুযায়ী মূল্যায়ন করছে এবং প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিচ্ছে। ড. জাহেদুল বলেন, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত একাধিক জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের স্বাধীন কারিগরি মূল্যায়ন, নিয়ন্ত্রক অনুমোদন এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মানদণ্ড অনুসরণ করেই গ্রহণ করা হয়। এনপিসিবিএল এখনো দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় সক্ষমতা অর্জন করতে পারেনি—এমন সমালোচনার বিষয়ে ড. জাহেদুল বলেন, পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনার মূল ভিত্তি হলো দক্ষ জনবল ও শক্তিশালী নিরাপত্তা সংস্কৃতি। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, গত এক দশকে সরকার এ খাতে ব্যাপক বিনিয়োগ করেছে। শত শত প্রকৌশলী, অপারেটর, রিঅ্যাক্টর বিশেষজ্ঞ, রসায়নবিদ, বিকিরণ সুরক্ষা কর্মকর্তা, রক্ষণাবেক্ষণ প্রকৌশলী রাশিয়াসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছেন। তারা Full Scope Simulator, On-the-Job Training এবং Classroom Training-সহ আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ সফলভাবে সম্পন্ন করেছেন। তিনি আরও বলেন, প্রতিটি অপারেটরকে বিএইআরএর কঠোর লাইসেন্সিং ও মূল্যায়ন প্রক্রিয়া অতিক্রম করতে হয়। একই সময়ে সিআরইএর বিশেষজ্ঞরা কমিশনিং পর্যায়ে এনপিসিবিএলের কর্মীদের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করে আন্তর্জাতিক সর্বোত্তম চর্চা অনুযায়ী জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা স্থানান্তর নিশ্চিত করছেন। ফলেএনপিসিবিএল বর্তমানে প্রযুক্তিগত, অপারেশনাল ও প্রাতিষ্ঠানিক—সব দিক থেকেই দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনার জন্য একটি সক্ষম Operating Organization হিসেবে গড়ে উঠেছে। স্পেন্ট ফুয়েল (ব্যবহৃত পারমাণবিক জ্বালানি) ব্যবস্থাপনা এবং রাশিয়ার সঙ্গে এ বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত চুক্তি হয়নি—এমন আলোচনার প্রসঙ্গে ড. জাহেদুল বলেন, আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শিল্পের প্রচলিত পদ্ধতি সম্পর্কে সীমিত ধারণার কারণেই এ ধরনের বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছে। তিনি জানান, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক সংস্থা রোসাটমের মধ্যে চুক্তি ইতোমধ্যে স্বাক্ষরিত হয়েছে। এর পাশাপাশি বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন ও টিভিইলের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি পারমাণবিক জ্বালানি সরবরাহের ফ্রেমওয়ার্ক এগ্রিমেন্ট বিদ্যমান রয়েছে। তিনি আরও বলেন, আইএইএর নিরাপত্তা নির্দেশিকা অনুযায়ী ব্যবহৃত পারমাণবিক জ্বালানি রিঅ্যাক্টর থেকে অপসারণের পর তাৎক্ষণিকভাবে অন্য দেশে পাঠানো হয় না। প্রথমে কেন্দ্রের নকশার অংশ হিসেবে নির্মিত স্পেন্ট ফুয়েল পোলে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত নিরাপদে সংরক্ষণ ও শীতলীকরণ করা হয়, যা বিশ্বের সব আধুনিক পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রেই অনুসরণ করা হয়। পরবর্তীতে বিদ্যমান আন্তঃরাষ্ট্রীয় চুক্তি, বাণিজ্যিক ব্যবস্থা এবং সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষের অনুমোদনের ভিত্তিতে পরবর্তী ব্যবস্থাপনা সম্পন্ন হয়। উল্লেখ্য, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পে রাশিয়ার ভিবিইআর-১২০০ মডেলের তৃতীয় প্রজন্মের দুটি রিয়্যাক্টর স্থাপন করা হচ্ছে। প্রতিটি ইউনিটের উৎপাদন ক্ষমতা ১,২০০ মেগাওয়াট। দুটি ইউনিট চালু হলে কেন্দ্রটির মোট উৎপাদন ক্ষমতা হবে ২,৪০০ মেগাওয়াট। সংশ্লিষ্টদের মতে, রিয়্যাক্টরগুলো আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মানদণ্ড পূরণে সক্ষম। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক সংস্থা রোসাটম।
আকাশের নীলে কীবা কবিতার মিলে না গোলাপের সুরভিতে ডানা মেলা চিলে না। গোধূলির রং এসে সন্ধ্যায় যায় মেশে কোথাও তো নেই তুমি গল্পের শুরু-শেষে। চাদরের আদরে না না ভোরের রবিতে না শিমুল কোলে থাকা কোকিলের ছবিতে। রিমঝিম টুপটাপ বরষার ছন্দে তোমাকেই খুঁজে পাই কামিনীর গন্ধে।
অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়েছে পৃথিবীর ভাগ্যাকাশ শুরু হয়েছে একের পর এক দুর্যোগ, দুর্ভিক্ষ; মহামারি চলছে পাল্লা দিয়ে। বর্ণাঢ্য আয়োজনে পশুত্ব গিলছে মনুষ্যত্ব অ-অনুমেয়— কতটা লম্বা মৃত্যুর মিছিল? অশান্ত, ভীষণ প্রকৃতি এখন। ধৈর্য, সহনশীলতার হয়েছে অকালমৃত্যু দানবীয় শক্তিতে জ্বলে উঠেছে আগ্নেয়গিরি। বিষাক্ত বিষ উদগিরিত হচ্ছে গলগলিয়ে লাভার তাপে অঙ্গার হলো পাখির নীড়। এমন দুর্যোগকালীন সময়ে তোমাকে ভীষণ প্রয়োজন, কবিতা। কেবল তুমিই জানো স্বার্থের বেড়া ভেঙে প্রেমের কুটির রচনার মন্ত্র। তুমিই পারো ধ্বংসস্তূপকে রূপ দিতে শৈল্পিক। এমন ধবধবে ভূতুড়ে দিনে তোমাকে ভীষণ প্রয়োজন, কবিতা। তোমার জাদুকরি শব্দরাই পারবে মোহের ঝকমকি সরিয়ে জাগ্রত পতাকা ওড়াতে। তোমার আগুনঝরা কথা স্ফুলিঙ্গের মতো ঘুরবে কালের আকাশে।
পিঠে পেট ঠেকেছে, তবু আনন্দ-বেসাতির কমতি নেই রোদে পুড়ে ঝড়-বৃষ্টিতে ভিজে একটা মানুষ জীবন-যুদ্ধে লড়ে যায় অহর্নিশি প্রসন্নতার আলপথে খোঁজে কষ্টের সুখ চোখের দীপ্র জ্যোতিতে প্রিয় সন্তানের মুখ কষ্টের টানাপোড়েনেও বাবা যেন সাঁকো বাঁধা সেতু- জীবন-নদীর দুই তীর অপত্য স্নেহে আগলে বেঁধে রাখে। নদীর স্রোত কোথাও খরস্রোতা, কোথাও ধীর লয় রোদে পুড়ে, ঝড়-বৃষ্টিতে ভিজে পরিশ্রমী বাবারা এমনই বহমান নদী।
জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৪৫ সালের ২৪ অক্টোবর। ভাবা গিয়েছিল, এ সংস্থা আন্তর্জাতিক শান্তি রক্ষার্থে বৃহৎ ভূমিকা নেবে। মানবাধিকার রক্ষা করবে। সেই সাথে বিশ্বব্যাপী আর্থ- সামাজিক উন্নতির ক্ষেত্রেও মুখ্য একটা চালিকাশক্তি হিসেবে অবতীর্ণ হবে। কূটনৈতিক সম্পর্ক, আন্তর্জাতিক সহায়তা, যুদ্ধ প্রতিরোধ, নিরস্ত্রীকরণ প্রভৃতি বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে জাতিসংঘ। সোজা কথায় বলা যায়, বিশ্বাস ও আস্থার দূত হয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মধ্যে সুসম্পর্ক গড়ে তুলবে। জাতিসংঘের বিচার বিভাগীয় অঙ্গ, যা ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিস রূপে পরিচিত, তা সদস্য দেশগুলোর মধ্যে আইনি বিরোধ দেখা দিলে তার নিষ্পত্তি করবে। আন্তর্জাতিক আইন প্রণয়ন এবং তার প্রয়োগ জাতিসংঘের অন্যতম দায়িত্ব। ঔপনিবেশিক শাসন, সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের সার্বিক বিরোধিতা এবং পরাধীন জাতির স্বাধীনতা ও আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার অর্জনের বিষয়টিতেও সক্রিয় ভূমিকা পালন করবে। জাতিসংঘ গুরুত্বপূর্ণ এক অনুঘটক। মানুষের শাশ্বত মর্যাদা রক্ষার শপথ গ্রহণ করেছিল জাতিসংঘ। ১৯৪৬ খ্রিস্টাব্দে জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদ তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টের স্ত্রী এলিনর রুজভেল্টের সভাপতিত্বে একটা মানবাধিকার কমিশন গঠন করে। মানবাধিকার নিয়ে বহু আলোচনা, বহু সভা, বহু মতামত - সবাই ইতিবাচকতার পক্ষে। কিন্তু এখানেই আবার একটা সন্দেহের বাতাবরণ তৈরি হচ্ছে। লিখিত খসড়া আর বাস্তবতায় অনেক পার্থক্যের অবলোকন। সিদ্ধান্তকে কার্যকর করতে সত্যিই কি জাতিসংঘের নিজস্ব সিস্টেম বা ব্যবস্থা আছে? মনে হয় কারও মুখাপেক্ষী! মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরাক আক্রমণ করল। মানবাধিকার ও সার্বভৌম ক্ষমতার প্রতি আঘাত। মানবাধিকারের জনক জাতিসংঘ নীরব। উদাহরণ এখানেই থেমে যায় না। আজকের উদ্ভূত পরিস্থিতি ভীষণ জটিল ও সংকটময়। রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণ। যুক্তরাষ্ট্রের ইরান আক্রমণ। ইসরায়েলের সিরিয়া, ইরান, লেবানন আক্রমণ। তারও অনেক আগে ইংল্যান্ড আর্জেন্টিনার ফকল্যান্ড নিয়ে যুদ্ধ। এ রকম অনেক উদাহরণ আছে। কখনো সামনাসামনি আবার কখনো ছায়াযুদ্ধ। এই তো কদিন আগেই ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে উত্তেজক পরিস্থিতি এবং ভয়ংকর যুদ্ধের সূচনা। আফ্রিকার ছোট ছোট দেশগুলো হয় গৃহযুদ্ধ নয়তো বহিঃশত্রুর সঙ্গে লড়াইয়ে বিপর্যস্তপ্রায়। তাহলে জাতিসংঘের ভূমিকা কী? দোষ-ত্রুটির কথা আলোচনার টেবিলে আসুক। যুদ্ধ সমাধান হতে পারে না। জাতিসংঘের যে উদ্দেশ্যে স্থাপনা, সেই উদ্দেশ্য থেকে অনেক দূরে কি? কার্যপদ্ধতির মধ্য দিয়েই বিভিন্ন দেশের মানুষের আস্থা-ভরসা অর্জন করার ক্ষেত্রে একটা ফাঁক রয়ে যাচ্ছে মনে হয়। ‘পিস কিপিং অপারেশন’ বড় একটা কার্যক্রম জাতিসংঘের। সনদের ষষ্ঠ ও সপ্তম অধ্যায়ে বলা হয়েছে, শান্তিরক্ষার প্রয়োজনে জাতিসংঘ বিবদমান রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সামরিক ব্যবস্থা পর্যন্ত নিতে পারে। শান্তিরক্ষক হিসেবে কঠোর হতে পারে। ১৯৯১-৯২ সালে উপসাগরীয় যুদ্ধে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে এবং পঞ্চাশের দশকে কোরিয়ায় যৌথ সামরিক অভিযান হয়েছে। আজ যে দেশেই হোক, যুদ্ধবিধ্বস্ত শিশু, নারী, অসহায় সাধারণ মানুষ। আগ্রাসন আক্রমণ কখনো কাম্য নয়। গাজা, ফিলিস্তিনের বিধ্বস্ত চিত্র প্রতিনিয়ত দেখছি। আতঙ্কে শিউরে উঠছি। খাবার নেই। জল নেই। রাস্তাঘাট চূর্ণ। তিল তিল করে গড়ে তোলা সুন্দর গ্রাম, শহর, নগর, কলকারখানা, বন্দর ধ্বংস হয়ে গেছে। হাহাকারের চিহ্ন বুকে নিয়ে কান্নারত আক্রান্ত দেশ। ক্ষতি তো সবার। আক্রমণকারীও কি ভালো থাকে? ব্যুমেরাং হয়ে বুকে বাজে অভিশাপ তারও। ক্ষতিগ্রস্ত হয় দুনিয়া। একটা যুদ্ধ যখন দুটি দেশের মধ্যে হয়, তার প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে অন্যান্য সব দেশেও। এখানেই চরম দায়িত্বশীল হয়ে উঠতে হবে জাতিসংঘকে। শান্তিবিঘ্নকারীর প্রতি কঠোরতার অবলম্বন চাই। ই বি টমকিনস তাঁর ‘The UN in Perspective’ বইয়ে বলেছেন, ‘বিশ্বজোড়া বিপর্যয় এড়াতে বা রাষ্ট্রসমূহকে সমূহ সংকট থেকে উদ্ধার পেতে যে পদ্ধতি অবলম্বন করতে হবে, তা শান্তিরক্ষামূলক কর্মপদ্ধতি।’ রোসালিন হিগিনসের মন্তব্য খুবই প্রাসঙ্গিক, ‘জাতিসংঘের শান্তিরক্ষামূলক কার্যক্রমের উদ্দেশ্য হলো আন্তর্জাতিকভাবে সংগঠিত এবং নির্দেশিত তৃতীয় পক্ষের মধ্যস্থতায় বিভিন্ন রাষ্ট্রের মধ্যে বা কোনো রাষ্ট্রের মধ্যে সংঘর্ষের প্রতিরোধ, সংকোচন, তীব্রতা হ্রাস বা অবসান।’ যুক্তি দেখাতে পারেন অনেকে, সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সম্মতি, আন্তর্জাতিক মহলের সমর্থন, সব পক্ষেরই সহযোগিতা ইত্যাদির প্রয়োজন। কিন্তু নেতৃত্বের জায়গায় তো আসতেই হবে জাতিসংঘকে। বলপ্রয়োগমূলক কিছু ব্যবস্থা সব সময় নিতে হবে তা নয়। ড. রাধারমণ চক্রবর্তীর কথায়, ‘বলপ্রয়োগমূলক ব্যবস্থা এবং হাল্কা কূটনৈতিক ব্যবস্থা - দুইয়ের মাঝামাঝি।’ আজকের এই পরিবর্তিত বিশ্বে উদ্ভূত সংকটময় পরিস্থিতিতে জাতিসংঘকে আরও গণতান্ত্রিক, কার্যকর ও নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করতে হবে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে অনেক বিষয়ের সফল সমাধান ঘটছে না। বিশ্বকে নিরাপদ রাখার দায়িত্ব নিতেই হবে। লাশের স্তূপের ওপর বসে পিশাচের উল্লাস আর দেখতে চাই না। আগামী প্রজন্মের কাছে একটা সুন্দর পৃথিবী থাক মানবতায় গড়া। জাতিসংঘের শুভ উদ্যোগ এবং সার্থক প্রয়াস হোক দিশারি।
একসময় বিদেশি ভাষা শেখাকে শখ হিসেবে দেখা হতো। কেউ সাহিত্য পড়তেন। কেউ ভ্রমণের জন্য শিখতেন। কেউ আবার ব্যক্তিগত আগ্রহে নতুন ভাষা আয়ত্ত করতেন। এখন সেই বাস্তবতা বদলে গেছে। আজ বিদেশি ভাষাশিক্ষা একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক দক্ষতা। এটি উচ্চশিক্ষা, চাকরি, গবেষণা, ব্যবসা, অভিবাসন ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগের সঙ্গে যুক্ত। বিশেষ করে, পঞ্চম শিল্পবিপ্লবের যুগে ভাষাজ্ঞান মানুষের পেশাগত ও মানবিক সক্ষমতাকে নতুন মাত্রা দিচ্ছে। বর্তমান বিশ্বে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবট, অটোমেশন ও তথ্য বিশ্লেষণ দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। প্রযুক্তি আমাদের কাজের ধরন বদলে দিচ্ছে। কিন্তু ভবিষ্যতের সমাজ শুধু যন্ত্রনির্ভর হবে না। সেখানে মানুষের সৃজনশীলতা, নৈতিকতা, সহমর্মিতা ও যোগাযোগ ক্ষমতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ হবে। এ প্রযুক্তি ও মানবিকতার সমন্বয়ই পঞ্চম শিল্পবিপ্লব বা ইন্ডাস্ট্রি ৫.০-এর মূল কথা। চতুর্থ শিল্পবিপ্লব প্রযুক্তি, উৎপাদনশীলতা ও অটোমেশনের ওপর বেশি গুরুত্ব দিয়েছিল। পঞ্চম শিল্পবিপ্লব সেই প্রযুক্তিকে মানুষের আরও কাছে নিয়ে আসে। এখানে শুধু প্রশ্ন করা হয় না, একটি যন্ত্র কত দ্রুত কাজ করতে পারে? প্রশ্ন করা হয়, সেই যন্ত্র মানুষের জীবন কতটা সহজ করছে? প্রযুক্তি কি নিরাপত্তা বাড়াচ্ছে? এটি কি পরিবেশ রক্ষা করছে? কর্মক্ষেত্রে মানুষের মর্যাদা কি বজায় থাকছে? সমাজের দুর্বল জনগোষ্ঠী কি প্রযুক্তির সুবিধা পাচ্ছে? পঞ্চম শিল্পবিপ্লব মানুষকে উৎপাদনব্যবস্থার কেন্দ্রে রাখে। এটি প্রযুক্তিকে মানুষের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখে না। বরং সহযোগী হিসেবে দেখে। একটি রোবট ভারী কাজ করতে পারে। এটি পুনরাবৃত্তিমূলক কাজও করতে পারে। কিন্তু নেতৃত্ব, সহানুভূতি, পরিকল্পনা, নৈতিক সিদ্ধান্ত ও সংকট ব্যবস্থাপনা মানুষের দায়িত্ব। তাই ভবিষ্যতের কর্মক্ষেত্রে প্রযুক্তিগত জ্ঞানের পাশাপাশি ভাষা ও যোগাযোগ দক্ষতা প্রয়োজন। জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বা এসডিজির উদ্দেশ্য হলো ন্যায়সংগত, শান্তিপূর্ণ ও পরিবেশবান্ধব একটি বিশ্ব গড়ে তোলা। এসডিজির ১৭টি লক্ষ্য শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, বৈষম্য, পরিবেশ, শিল্প, শান্তি ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার সঙ্গে সম্পর্কিত। শুধু প্রযুক্তি দিয়ে উন্নয়ন সম্ভব নয়। সহযোগিতা প্রয়োজন। বোঝাপড়া প্রয়োজন। বিভিন্ন ভাষা ও সংস্কৃতির মানুষের মধ্যে কার্যকর যোগাযোগ প্রয়োজন। এসডিজি কোনো এক দেশের একক দায়িত্ব নয়। জলবায়ু পরিবর্তন, দারিদ্র্য, খাদ্যনিরাপত্তা, জনস্বাস্থ্য ও শিক্ষা এখন বৈশ্বিক বিষয়। এসব সমস্যা মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক অংশীদারত্ব জরুরি। আর সেই অংশীদারত্বের ভিত্তি হলো ভাষা ও যোগাযোগ। বিশ্বের বহু দেশে বাংলা ভাষাভাষী মানুষ বসবাস করেন। ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা, মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা ও এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে বাঙালি জনগোষ্ঠী রয়েছে। এই বৈশ্বিক বাস্তবতায় ফরাসি ভাষা শেখা একটি ভবিষ্যৎমুখী সিদ্ধান্ত। ফরাসি শুধু ফ্রান্সের ভাষা নয়, এটি কানাডা, বেলজিয়াম, সুইজারল্যান্ড এবং আফ্রিকার বহু দেশে ব্যবহৃত হয়। অনেক আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে ফরাসি একটি গুরুত্বপূর্ণ ভাষা। উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রেও ফরাসির গুরুত্ব রয়েছে। ফ্রান্স, কানাডা, বেলজিয়াম ও সুইজারল্যান্ডের অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি মাধ্যমে পড়াশোনার সুযোগ আছে। কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও ফরাসি গুরুত্বপূর্ণ। দূতাবাস, আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা, জাতিসংঘের প্রতিষ্ঠান, বহুজাতিক কোম্পানি, বিমান সংস্থা, পর্যটন, অনুবাদ, গণমাধ্যম এবং মানবিক সহায়তা কার্যক্রমে ফরাসি জানা প্রার্থীরা বাড়তি সুবিধা পান। বাংলাদেশের তৈরি পোশাক, ওষুধ, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষিপণ্য, চামড়া ও সেবা খাতের আন্তর্জাতিক বাজার রয়েছে। ফরাসিভাষী দেশের ক্রেতা ও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ ব্যবসায়িক সম্পর্ককে শক্তিশালী করতে পারে। আফ্রিকার বহু দেশে ফরাসি প্রশাসন, শিক্ষা ও ব্যবসার ভাষা। সেখানে কৃষি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, পরিবেশ, জলবায়ু পরিবর্তন ও মানবিক সহায়তায় কাজ করতে ফরাসি দক্ষতা কার্যকর। বিদেশি ভাষা শেখা শুধু শব্দ ও ব্যাকরণ শেখা নয়, এটি মানুষের আবেগ বোঝার ক্ষমতাও বাড়াতে পারে। আবেগিক বুদ্ধিমত্তা হলো নিজের এবং অন্যের আবেগ শনাক্ত করা, বোঝা, প্রকাশ করা ও নিয়ন্ত্রণ করার সক্ষমতা। এর মধ্যে আত্মসচেতনতা, আত্মনিয়ন্ত্রণ, সহমর্মিতা ও সম্পর্ক পরিচালনা অন্তর্ভুক্ত। বাংলায় ‘অভিমান’, ‘মায়া’, ‘লজ্জা’ বা ‘সম্মান’ যেভাবে প্রকাশ করা হয়, অন্য ভাষায় তা ভিন্ন হতে পারে। একই অনুভূতি বিভিন্ন সংস্কৃতিতে ভিন্ন শব্দ, ভিন্ন ভঙ্গি এবং ভিন্ন সামাজিক অর্থ বহন করে। বিদেশি ভাষা শেখার সময় শিক্ষার্থী বুঝতে পারেন যে অনুভূতি সর্বজনীন হলেও তার প্রকাশ সংস্কৃতিনির্ভর। এই উপলব্ধি আবেগ সম্পর্কে তার দৃষ্টিভঙ্গিকে আরও সূক্ষ্ম করে। বিদেশি ভাষায় কথা বলার সময় একজন মানুষ শব্দ নির্বাচন, কণ্ঠস্বর ও শ্রোতার প্রতিক্রিয়ার দিকে বেশি মনোযোগ দেন। এই অনুশীলন আত্মনিয়ন্ত্রণ ও সহমর্মিতা বাড়াতে পারে। প্রকৃত আবেগিক বুদ্ধিমত্তা আবেগকে দমন করা নয়, বরং আবেগকে বুঝে যথাযথভাবে পরিচালনা করা এবং সাংস্কৃতিক বুদ্ধিমত্তা হলো ভিন্ন সংস্কৃতির মানুষের সঙ্গে সম্মানজনক ও কার্যকরভাবে কাজ করার সক্ষমতা। ভাষা ও সংস্কৃতিকে আলাদা করা যায় না। একটি ভাষার সম্ভাষণ, সম্বোধন, রসিকতা, নীরবতা, ভদ্রতা ও মতবিরোধ প্রকাশের ধরন সেই সমাজের মূল্যবোধ বহন করে। কোনো সংস্কৃতিতে সরাসরি কথা বলা স্বাভাবিক। অন্য সংস্কৃতিতে পরোক্ষ ভাষা বেশি গ্রহণযোগ্য। কোথাও প্রথম নাম ধরে ডাকা স্বাভাবিক। কোথাও পদবি ও সম্মানসূচক শব্দ জরুরি। বিদেশি ভাষা শেখার সময় শিক্ষার্থী এসব পার্থক্য দেখতে পান। তিনি বুঝতে শেখেন যে নিজের সংস্কৃতির আচরণই একমাত্র স্বাভাবিক আচরণ নয়। এটি সাংস্কৃতিক আপেক্ষিকতার ধারণা তৈরি করে। এর অর্থ সব আচরণকে অন্ধভাবে গ্রহণ করা নয়। বরং কোনো আচরণ বিচার করার আগে তার সামাজিক ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বোঝা। এই দক্ষতা আন্তর্জাতিক শিক্ষা, কূটনীতি, ব্যবসা, উন্নয়নকর্ম, পর্যটন ও বহুজাতিক কর্মক্ষেত্রে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সামাজিক বুদ্ধিমত্তা হলো সামাজিক সংকেত বোঝা, সম্পর্ক তৈরি করা, পরিস্থিতি অনুযায়ী আচরণ করা এবং বিরোধ সামলানোর সক্ষমতা। বিদেশি ভাষায় কথা বলার সময় সঠিক শব্দ সব সময় মনে পড়ে না। তখন শিক্ষার্থীকে সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা করতে হয়। অঙ্গভঙ্গি ব্যবহার করতে হয়। শ্রোতার মুখভঙ্গি লক্ষ করতে হয়। প্রয়োজনে নিজের বক্তব্য নতুনভাবে সাজাতে হয়। এই প্রক্রিয়া যোগাযোগের নমনীয়তা বাড়ায়। এটি ধৈর্য শেখায়। মনোযোগ দিয়ে শুনতে শেখায়। ভুল স্বীকার করতে শেখায়। ফরাসিভাষী অঞ্চলে শুধু ইংরেজির ওপর নির্ভর করলে সামাজিক দূরত্ব তৈরি হতে পারে। স্থানীয় ভাষা জানলে বন্ধুত্ব গড়া সহজ হয়। প্রতিবেশীর সঙ্গে যোগাযোগ উন্নত হয়। কর্মক্ষেত্রে সম্পর্ক শক্তিশালী হয়। তাই ফরাসি শেখা শুধু পেশাগত দক্ষতা নয়, এটি সামাজিক অন্তর্ভুক্তিরও একটি কার্যকর মাধ্যম। বিদেশি ভাষা শেখার সময় মস্তিষ্ককে একসঙ্গে অনেক কাজ করতে হয়। নতুন শব্দ মনে রাখতে হয়। ব্যাকরণ প্রয়োগ করতে হয়। উচ্চারণ শনাক্ত করতে হয়। মাতৃভাষার প্রভাব নিয়ন্ত্রণ করতে হয়। আবার প্রয়োজনের সময় সঠিক ভাষাটি দ্রুত নির্বাচন করতে হয়। এই অনুশীলন মনোযোগ, কার্যকর স্মৃতি, ভাষাগত সচেতনতা ও মানসিক নমনীয়তার সঙ্গে যুক্ত। দুটি ভাষার গঠন তুলনা করতে করতে একজন শিক্ষার্থী ভাষা কীভাবে কাজ করে, তা বুঝতে শেখেন। একে ভাষা-সম্পর্কিত উচ্চতর সচেতনতা বলা হয়। মানুষের মস্তিষ্ক স্থির নয়। অভিজ্ঞতা ও অনুশীলনের মাধ্যমে মস্তিষ্কের কার্যকর সংযোগ বদলাতে পারে। এই সক্ষমতাকে Neuroplasticity বলা হয়। বিদেশি ভাষা শেখা শ্রবণ, স্মৃতি, মনোযোগ, উচ্চারণ ও অর্থ প্রক্রিয়াকরণের সঙ্গে যুক্ত স্নায়বিক ব্যবস্থাকে সক্রিয় করে। Neuro-Linguistic Programming বা NLP ভাষা, চিন্তার ধরন ও আচরণগত অভ্যাসের সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করে। এর প্রবক্তারা মনে করেন, ভাষা ও মানসিক কাঠামো পরিবর্তন করে যোগাযোগ ও আচরণে পরিবর্তন আনা সম্ভব। ভাষা শিক্ষায় এর কিছু ধারণার ব্যবহার দেখা যায়। যেমন ইতিবাচক আত্মকথন। ভুলের ভয়কে নতুনভাবে দেখা। ফরাসি শেখার পথে বাংলা ভাষাভাষীদের কিছু বাস্তব সমস্যা রয়েছে। সবচেয়ে বড় বাধা হলো ভুল করার ভয়। এই ভয় আত্মবিশ্বাস কমিয়ে দেয়। ভাষা শেখার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো ছোট কিন্তু নিয়মিত অনুশীলন। প্রতিদিন ৩০ থেকে ৪০ মিনিট। বিচ্ছিন্ন শব্দ মুখস্থ না করে পুরো বাক্য শিখতে হবে। শুনতে হবে। বলতে হবে। পড়তে হবে। লিখতে হবে। উচ্চারণ উন্নত করতে অডিও শুনে বক্তার সঙ্গে সঙ্গে বলতে হবে। এই পদ্ধতিকে Shadowing বলা হয়। নিজের কণ্ঠ রেকর্ড করতে হবে। পুরোনো ও নতুন রেকর্ড তুলনা করতে হবে। এতে অগ্রগতি বোঝা যায়। মোবাইল অ্যাপ, অনলাইন ভিডিও, পডকাস্ট, ডিজিটাল অভিধান ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করা যায়। AI-এর সঙ্গে কথোপকথন করা যায়। ভুল বাক্য সংশোধন করা যায়। অনুশীলন করা যায়। তবে প্রযুক্তি বাস্তব মানুষের বিকল্প নয়। শিক্ষক, বন্ধু বা ভাষাসঙ্গীর সঙ্গে কথা বলা জরুরি। কারণ আবেগ, নীরবতা, কণ্ঠস্বর ও সামাজিক আচরণ শুধু অ্যাপ দিয়ে পুরোপুরি শেখা যায় না। ভুলকে ব্যর্থতা নয়, শেখার অংশ হিসেবে দেখতে হবে। যত বেশি কথা বলা হবে, তত বেশি ভুল হবে। আবার তত দ্রুত উন্নতি হবে। বিদেশি ভাষাশিক্ষা একটি মানসিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক যাত্রা। এটি নতুনভাবে কথা বলতে শেখায়। একই সঙ্গে নতুনভাবে শুনতে, ভাবতে, অনুভব করতে ও মানুষকে বুঝতে শেখায়। ফরাসি ভাষা বাংলা ভাষাভাষীদের জন্য উচ্চশিক্ষা, চাকরি, ব্যবসা, গবেষণা, অভিবাসন ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার নতুন দরজা খুলতে পারে। এটি আবেগিক বুদ্ধিমত্তা, সাংস্কৃতিক বুদ্ধিমত্তা, সামাজিক বুদ্ধিমত্তা ও জ্ঞানীয় বুদ্ধিমত্তার বিকাশেও সহায়ক হতে পারে। তবে এর জন্য প্রয়োজন নিয়মিত অনুশীলন। বাস্তব যোগাযোগ। সাংস্কৃতিক কৌতূহল ও ভুল করার সাহস। পঞ্চম শিল্পবিপ্লবের যুগে শুধু প্রযুক্তি জানাই যথেষ্ট নয়। মানুষের প্রয়োজন যোগাযোগ ক্ষমতা, সৃজনশীলতা, নৈতিকতা ও সাংস্কৃতিক বোঝাপড়া। এ কারণে ফরাসি শেখা কোনো বিলাসিতা নয়। এটি একটি বাস্তব বিনিয়োগ। এটি নতুন মানুষ, নতুন সংস্কৃতি এবং নতুন সম্ভাবনার সঙ্গে সংযোগ তৈরির শক্তিশালী সেতু।