Breaking news

মতামত

রাষ্ট্রের নিরাপত্তায় জাতিসংঘ এক কাগুজে প্রতিষ্ঠান

জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৪৫ সালের ২৪ অক্টোবর। ভাবা গিয়েছিল, এ সংস্থা আন্তর্জাতিক শান্তি রক্ষার্থে বৃহৎ ভূমিকা নেবে। মানবাধিকার রক্ষা করবে। সেই সাথে বিশ্বব্যাপী আর্থ- সামাজিক উন্নতির ক্ষেত্রেও মুখ্য একটা চালিকাশক্তি হিসেবে অবতীর্ণ হবে।   কূটনৈতিক সম্পর্ক, আন্তর্জাতিক সহায়তা, যুদ্ধ প্রতিরোধ, নিরস্ত্রীকরণ প্রভৃতি বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে জাতিসংঘ। সোজা কথায় বলা যায়, বিশ্বাস ও আস্থার দূত হয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মধ্যে সুসম্পর্ক গড়ে তুলবে।   জাতিসংঘের বিচার বিভাগীয় অঙ্গ, যা ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিস রূপে পরিচিত, তা সদস্য দেশগুলোর মধ্যে আইনি বিরোধ দেখা দিলে তার নিষ্পত্তি করবে। আন্তর্জাতিক আইন প্রণয়ন এবং তার প্রয়োগ জাতিসংঘের অন্যতম দায়িত্ব। ঔপনিবেশিক শাসন, সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের সার্বিক বিরোধিতা এবং পরাধীন জাতির স্বাধীনতা ও আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার অর্জনের বিষয়টিতেও সক্রিয় ভূমিকা পালন করবে।   জাতিসংঘ গুরুত্বপূর্ণ এক অনুঘটক। মানুষের শাশ্বত মর্যাদা রক্ষার শপথ গ্রহণ করেছিল জাতিসংঘ। ১৯৪৬ খ্রিস্টাব্দে জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদ তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টের স্ত্রী এলিনর রুজভেল্টের সভাপতিত্বে একটা মানবাধিকার কমিশন গঠন করে। মানবাধিকার নিয়ে বহু আলোচনা, বহু সভা, বহু মতামত - সবাই ইতিবাচকতার পক্ষে। কিন্তু এখানেই আবার একটা সন্দেহের বাতাবরণ তৈরি হচ্ছে। লিখিত খসড়া আর বাস্তবতায় অনেক পার্থক্যের অবলোকন।   সিদ্ধান্তকে কার্যকর করতে সত্যিই কি জাতিসংঘের নিজস্ব সিস্টেম বা ব্যবস্থা আছে? মনে হয় কারও মুখাপেক্ষী! মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরাক আক্রমণ করল। মানবাধিকার ও সার্বভৌম ক্ষমতার প্রতি আঘাত। মানবাধিকারের জনক জাতিসংঘ নীরব। উদাহরণ এখানেই থেমে যায় না।   আজকের উদ্ভূত পরিস্থিতি ভীষণ জটিল ও সংকটময়। রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণ। যুক্তরাষ্ট্রের ইরান আক্রমণ। ইসরায়েলের সিরিয়া, ইরান, লেবানন আক্রমণ। তারও অনেক আগে ইংল্যান্ড আর্জেন্টিনার ফকল্যান্ড নিয়ে যুদ্ধ। এ রকম অনেক উদাহরণ আছে।   কখনো সামনাসামনি আবার কখনো ছায়াযুদ্ধ। এই তো কদিন আগেই ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে উত্তেজক পরিস্থিতি এবং ভয়ংকর যুদ্ধের সূচনা। আফ্রিকার ছোট ছোট দেশগুলো হয় গৃহযুদ্ধ নয়তো বহিঃশত্রুর সঙ্গে লড়াইয়ে বিপর্যস্তপ্রায়। তাহলে জাতিসংঘের ভূমিকা কী?   দোষ-ত্রুটির কথা আলোচনার টেবিলে আসুক। যুদ্ধ সমাধান হতে পারে না। জাতিসংঘের যে উদ্দেশ্যে স্থাপনা, সেই উদ্দেশ্য থেকে অনেক দূরে কি? কার্যপদ্ধতির মধ্য দিয়েই বিভিন্ন দেশের মানুষের আস্থা-ভরসা অর্জন করার ক্ষেত্রে একটা ফাঁক রয়ে যাচ্ছে মনে হয়। ‘পিস কিপিং অপারেশন’ বড় একটা  কার্যক্রম জাতিসংঘের। সনদের ষষ্ঠ ও সপ্তম অধ্যায়ে বলা হয়েছে, শান্তিরক্ষার প্রয়োজনে জাতিসংঘ বিবদমান রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সামরিক ব্যবস্থা পর্যন্ত নিতে পারে। শান্তিরক্ষক হিসেবে কঠোর হতে পারে।   ১৯৯১-৯২ সালে উপসাগরীয় যুদ্ধে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে এবং  পঞ্চাশের দশকে কোরিয়ায় যৌথ সামরিক অভিযান হয়েছে। আজ যে দেশেই হোক, যুদ্ধবিধ্বস্ত শিশু, নারী, অসহায় সাধারণ মানুষ। আগ্রাসন আক্রমণ কখনো কাম্য নয়।   গাজা, ফিলিস্তিনের বিধ্বস্ত চিত্র প্রতিনিয়ত দেখছি। আতঙ্কে শিউরে উঠছি। খাবার নেই। জল নেই। রাস্তাঘাট চূর্ণ। তিল তিল করে গড়ে তোলা সুন্দর গ্রাম, শহর, নগর, কলকারখানা, বন্দর ধ্বংস হয়ে গেছে। হাহাকারের চিহ্ন বুকে নিয়ে কান্নারত আক্রান্ত দেশ। ক্ষতি তো সবার। আক্রমণকারীও কি ভালো থাকে? ব্যুমেরাং হয়ে বুকে বাজে অভিশাপ তারও। ক্ষতিগ্রস্ত হয় দুনিয়া।   একটা যুদ্ধ যখন দুটি দেশের মধ্যে হয়, তার প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে অন্যান্য সব দেশেও। এখানেই চরম দায়িত্বশীল হয়ে উঠতে হবে জাতিসংঘকে। শান্তিবিঘ্নকারীর প্রতি কঠোরতার অবলম্বন চাই। ই বি টমকিনস তাঁর ‘The UN in Perspective’ বইয়ে বলেছেন, ‘বিশ্বজোড়া বিপর্যয় এড়াতে বা রাষ্ট্রসমূহকে সমূহ সংকট থেকে উদ্ধার পেতে যে পদ্ধতি অবলম্বন করতে হবে, তা শান্তিরক্ষামূলক কর্মপদ্ধতি।’   রোসালিন হিগিনসের মন্তব্য খুবই প্রাসঙ্গিক, ‘জাতিসংঘের শান্তিরক্ষামূলক কার্যক্রমের উদ্দেশ্য হলো আন্তর্জাতিকভাবে সংগঠিত এবং নির্দেশিত তৃতীয় পক্ষের মধ্যস্থতায় বিভিন্ন রাষ্ট্রের মধ্যে বা কোনো রাষ্ট্রের মধ্যে সংঘর্ষের প্রতিরোধ, সংকোচন, তীব্রতা হ্রাস বা অবসান।’   যুক্তি দেখাতে পারেন অনেকে, সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সম্মতি, আন্তর্জাতিক মহলের সমর্থন, সব পক্ষেরই সহযোগিতা ইত্যাদির প্রয়োজন। কিন্তু নেতৃত্বের জায়গায় তো আসতেই হবে জাতিসংঘকে। বলপ্রয়োগমূলক কিছু ব্যবস্থা সব সময় নিতে হবে তা নয়। ড. রাধারমণ চক্রবর্তীর কথায়, ‘বলপ্রয়োগমূলক ব্যবস্থা এবং হাল্কা কূটনৈতিক ব্যবস্থা - দুইয়ের মাঝামাঝি।’   আজকের এই পরিবর্তিত বিশ্বে উদ্ভূত সংকটময় পরিস্থিতিতে জাতিসংঘকে আরও গণতান্ত্রিক, কার্যকর ও নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করতে হবে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে অনেক বিষয়ের সফল সমাধান ঘটছে না। বিশ্বকে নিরাপদ রাখার দায়িত্ব নিতেই হবে। লাশের স্তূপের ওপর বসে পিশাচের উল্লাস আর দেখতে চাই না।   আগামী প্রজন্মের কাছে একটা সুন্দর পৃথিবী থাক মানবতায় গড়া। জাতিসংঘের শুভ উদ্যোগ এবং সার্থক প্রয়াস হোক দিশারি।    

জুলাই ১৯, ২০২৬ 0
ভেনেজুয়েলায় ভূমিকম্প : আমরা কতটা প্রস্তুত
ভেনেজুয়েলায় ভূমিকম্প : আমরা কতটা প্রস্তুত

অতি সম্প্রতি শক্তিশালী ভূমিকম্পে ভেনেজুয়েলা বড় ধরনের মানবিক সংকটে পড়েছে। মুহূর্তের মধ্যে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে বহু জনপদ, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সড়ক, হাসপাতাল, বিদ্যুৎ ও যোগাযোগ ব্যবস্থা। অসংখ্য মানুষ প্রাণ হারিয়েছে, হাজারো পরিবার গৃহহীন হয়েছে। প্রতিটি বড় ভূমিকম্পের মতো এই বিপর্যয়ও আমাদের একটি কঠিন সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে—প্রকৃতি কখনো আগাম সতর্ক করে না; কিন্তু প্রস্তুতির অভাবের মূল্য দিতে হয় মানুষের জীবন দিয়ে।   সভ্যতার দীর্ঘ ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, কয়েক সেকেন্ডের একটি ভূমিকম্প বহু বছরের উন্নয়ন, পরিশ্রম ও স্বপ্নকে ধূলিসাৎ করে দিতে পারে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি অভূতপূর্ব অগ্রগতি অর্জন করলেও ভূমিকম্পের নির্দিষ্ট সময়, স্থান ও তীব্রতা এখনো নির্ভুলভাবে পূর্বাভাস দেয়া সম্ভব হয়নি। তাই ভূমিকম্প মোকাবেলায় সবচেয়ে কার্যকর কৌশল হলো দুর্যোগ-পরবর্তী তৎপরতার চেয়ে দুর্যোগ-পূর্ব প্রস্তুতিকে অগ্রাধিকার দেয়া। ভেনেজুয়েলার অভিজ্ঞতা আবারও প্রমাণ করেছে, ভূমিকম্পে প্রাণহানির প্রধান কারণ কেবল ভূকম্পন নয়; বরং দুর্বল অবকাঠামো, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, নির্মাণে অনিয়ম এবং দুর্যোগ প্রস্তুতির ঘাটতি। একই মাত্রার ভূমিকম্প দুটি দেশে সম্পূর্ণ ভিন্ন পরিণতি ডেকে আনতে পারে। কোথাও হাজারো মানুষের মৃত্যু ঘটে, আবার কোথাও ক্ষয়ক্ষতি সীমিত থাকে। এই পার্থক্যের নাম প্রস্তুতি।   দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক সংকট ভেনেজুয়েলার অবকাঠামো উন্নয়ন ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনাকে দুর্বল করেছে। অনেক ভবন আধুনিক ভূমিকম্প-সহনশীল নকশায় নির্মিত নয়। কোথাও উদ্ধার সরঞ্জামের ঘাটতি, কোথাও চিকিৎসা সেবার সীমাবদ্ধতা, আবার কোথাও যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় উদ্ধারকাজ বিলম্বিত হয়েছে। ফলে ভূমিকম্পের প্রাথমিক আঘাতের পাশাপাশি দ্বিতীয় পর্যায়ের মানবিক সংকট আরও গভীর হয়েছে। এই বাস্তবতা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, দুর্যোগের পর যত দক্ষ উদ্ধার অভিযানই পরিচালিত হোক না কেন, দুর্যোগের আগে যথাযথ প্রস্তুতির বিকল্প নেই।   বিশ্বের কয়েকটি দেশ এই শিক্ষা অনেক আগেই গ্রহণ করেছে। জাপান তার অন্যতম উদাহরণ। ভূমিকম্প সেখানে নিত্যদিনের বাস্তবতা, তবু তুলনামূলকভাবে প্রাণহানি কম। কারণ দেশটি কঠোর ভবন নির্মাণবিধি, উন্নত প্রকৌশল প্রযুক্তি, দ্রুত সতর্কীকরণ ব্যবস্থা এবং নিয়মিত মহড়ার মাধ্যমে একটি দুর্যোগ-সহনশীল সংস্কৃতি গড়ে তুলেছে। শিশুরা স্কুলজীবন থেকেই ভূমিকম্পের সময় করণীয় শেখে, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়মিত মহড়া পরিচালনা করে এবং নাগরিকদের মধ্যে প্রস্তুতির সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। চিলিও কঠোর নির্মাণনীতি ও পরিকল্পিত নগর ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে একই ধরনের সাফল্য অর্জন করেছে। এসব উদাহরণ দেখায়, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ঠেকানো না গেলেও পরিকল্পিত প্রস্তুতির মাধ্যমে ক্ষয়ক্ষতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।   এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের বাস্তবতা বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। অনেকের ধারণা, বাংলাদেশ মূলত বন্যা ও ঘূর্ণিঝড়প্রবণ দেশ; তাই ভূমিকম্পের ঝুঁকি তুলনামূলক কম। বাস্তবে এই ধারণা বিভ্রান্তিকর। বাংলাদেশ ভারতীয়, ইউরেশীয় ও বার্মা টেকটোনিক প্লেটের প্রভাবাধীন অঞ্চলে অবস্থিত। দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চল, পূর্বাঞ্চল ও মধ্যাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা উল্লেখযোগ্য ভূমিকম্প ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। অতীতের একাধিক শক্তিশালী ভূমিকম্প সেই বাস্তবতারই সাক্ষ্য বহন করে। ঝুঁকির বিষয়টি জানা থাকলেও আমাদের প্রস্তুতি এখনো কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি। দ্রুত নগরায়ণ, অপরিকল্পিত ভবন নির্মাণ, ঘনবসতি, দুর্বল তদারকি এবং আইন বাস্তবায়নের সীমাবদ্ধতা সম্ভাব্য একটি ভূমিকম্পকে জাতীয় বিপর্যয়ে রূপ দিতে পারে।   রাজধানী ঢাকা এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ এই মহানগরে অনেক এলাকায় ভবনের মধ্যবর্তী দূরত্ব অত্যন্ত কম। একটি ভবন ধসে পড়লে পাশের ভবনও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। সংকীর্ণ সড়ক, তীব্র যানজট, উন্মুক্ত স্থানের অভাব এবং জটিল গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংযোগ উদ্ধারকাজকে আরও কঠিন করে তুলতে পারে। একই চিত্র কমবেশি চট্টগ্রাম, সিলেট, নারায়ণগঞ্জসহ অন্যান্য বড় শহরেও বিদ্যমান।   আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, জাতীয় ভবন নির্মাণ বিধিমালা থাকলেও বাস্তবে সব ক্ষেত্রে তা কঠোরভাবে অনুসরণ করা হয় না। কোথাও অনুমোদিত নকশা পরিবর্তন করা হয়, কোথাও নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার করা হয়, আবার কোথাও অনুমতির বাইরে অতিরিক্ত তলা নির্মাণ করা হয়। এসব অনিয়ম শুধু আইন ভঙ্গের ঘটনা নয়; এটি মানুষের জীবনের নিরাপত্তার সঙ্গে আপস। একটি বড় ভূমিকম্পে এসব ভবনই ব্যাপক প্রাণহানির কারণ হতে পারে।   অবকাঠামোর পাশাপাশি জনসচেতনতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের দেশে ঘূর্ণিঝড় ও বন্যা মোকাবেলায় সচেতনতা আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে। কিন্তু ভূমিকম্পের ক্ষেত্রে এখনো সেই সংস্কৃতি গড়ে ওঠেনি। অনেকেই আতঙ্কিত হয়ে লিফট ব্যবহার করেন, সিঁড়িতে হুড়োহুড়ি করেন কিংবা গুজবের কারণে ভুল সিদ্ধান্ত নেন। অথচ অল্প সময়ের প্রশিক্ষণ এবং নিয়মিত মহড়া অসংখ্য প্রাণ রক্ষা করতে পারে।   তাই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে বছরে অন্তত দুবার ভূমিকম্প মহড়া, নিরাপদ নির্গমনপথের অনুশীলন এবং প্রাথমিক চিকিৎসার প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করা উচিত। একইভাবে সরকারি ও বেসরকারি অফিস, হাসপাতাল, শিল্পকারখানা ও বিপণিবিতানেও নিয়মিত দুর্যোগ মহড়ার ব্যবস্থা থাকতে হবে। দুর্যোগ প্রস্তুতি কোনো আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি জীবন রক্ষার একটি কার্যকর উপায়। প্রযুক্তিও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। মোবাইলভিত্তিক জরুরি সতর্কবার্তা, ডিজিটাল মানচিত্র, ড্রোনের মাধ্যমে ক্ষয়ক্ষতি মূল্যায়ন, সমন্বিত যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব প্রতিরোধের ব্যবস্থা উদ্ধারকাজকে আরও দ্রুত ও কার্যকর করতে পারে। একই সঙ্গে অনুসন্ধান ও উদ্ধারকারী সংস্থাগুলোর জন্য আধুনিক সরঞ্জাম, পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ ও নিয়মিত যৌথ মহড়া নিশ্চিত করতে হবে। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা বলছে, ভূমিকম্পের পর প্রথম ২৪ থেকে ৭২ ঘণ্টা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এই সময়ের মধ্যে কার্যকর উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করা গেলে বহু মানুষের প্রাণ রক্ষা করা সম্ভব।   দুর্যোগ প্রস্তুতিতে নাগরিকদেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। প্রতিটি পরিবারের একটি জরুরি পরিকল্পনা থাকা উচিত। একটি ব্যাগে প্রাথমিক চিকিৎসাসামগ্রী, টর্চ, অতিরিক্ত ব্যাটারি, বিশুদ্ধ পানি, শুকনো খাবার, প্রয়োজনীয় ওষুধ এবং গুরুত্বপূর্ণ নথির অনুলিপি সংরক্ষণ করা যেতে পারে। পরিবারের সদস্যদের জন্য একটি নির্দিষ্ট মিলনস্থল নির্ধারণ এবং বিকল্প যোগাযোগ ব্যবস্থা তৈরি করাও জরুরি। এসব প্রস্তুতি ছোট মনে হলেও সংকটের সময় জীবন বাঁচাতে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। বাংলাদেশ ইতোমধ্যে ঘূর্ণিঝড় মোকাবেলায় বিশ্বের সামনে একটি সফল উদাহরণ স্থাপন করেছে। আগাম সতর্কবার্তা, আশ্রয়কেন্দ্র, স্বেচ্ছাসেবক নেটওয়ার্ক এবং জনসচেতনতার সমন্বয়ে হাজার হাজার প্রাণ রক্ষা করা সম্ভব হয়েছে। এই অভিজ্ঞতা আমাদের আত্মবিশ্বাস জোগায় যে রাজনৈতিক সদিচ্ছা, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এবং কঠোর বাস্তবায়ন থাকলে ভূমিকম্প প্রস্তুতিতেও একই ধরনের সাফল্য অর্জন করা সম্ভব।   তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কেবল সরকারের একার দায়িত্ব নয়। প্রকৌশলী যখন নিরাপদ নকশা প্রণয়ন করেন, ঠিকাদার যখন মানসম্পন্ন নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার করেন, স্থানীয় প্রশাসন যখন কঠোরভাবে আইন প্রয়োগ করে, শিক্ষক যখন শিক্ষার্থীদের সচেতন করেন, গণমাধ্যম যখন তথ্যভিত্তিক প্রতিবেদন প্রকাশ করে এবং সাধারণ মানুষ যখন নিজ নিজ পরিবারকে প্রস্তুত করে, তখনই একটি দুর্যোগ-সহনশীল সমাজ গড়ে ওঠে। ভেনেজুয়েলার সাম্প্রতিক ভূমিকম্প আমাদের সামনে একটি নির্মম সত্য তুলে ধরেছে—প্রকৃতিকে থামানো যায় না, কিন্তু প্রস্তুতির মাধ্যমে ক্ষয়ক্ষতি অনেকাংশে কমানো যায়। তাই এটি শুধু দূরদেশের একটি সংবাদ নয়; বাংলাদেশের জন্যও একটি স্পষ্ট সতর্কসংকেত। উন্নয়নের প্রতিটি পরিকল্পনায় নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। ভবন নির্মাণ আইন কঠোরভাবে বাস্তবায়ন, দুর্যোগ প্রস্তুতিকে শিক্ষাব্যবস্থার অংশ করা, উদ্ধার সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং নাগরিক সচেতনতা জোরদার করার এখনই উপযুক্ত সময়।   ভূমিকম্প কোনো পূর্বঘোষণা দিয়ে আসে না। কিন্তু প্রস্তুতি নেয়ার সুযোগ আমাদের হাতে আজই রয়েছে। আমরা যদি অন্য দেশের বিপর্যয় থেকে শিক্ষা গ্রহণ করি এবং এখনই কার্যকর উদ্যোগ নিই, তাহলে ভবিষ্যতের সম্ভাব্য দুর্যোগে অসংখ্য প্রাণ ও বিপুল সম্পদ রক্ষা করা সম্ভব হবে। ভেনেজুয়েলার ধ্বংসস্তূপ তাই কেবল একটি দেশের ট্র্যাজেডি নয়; এটি বাংলাদেশের জন্যও একটি জাগরণের আহ্বান। আজকের দূরদর্শী সিদ্ধান্তই আগামী দিনের নিরাপদ বাংলাদেশ গড়ার ভিত্তি হতে পারে।  

জুলাই ১৯, ২০২৬ 0
গণবিপ্লব দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতির নতুন অধ‍্যায়
গণবিপ্লব দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতির নতুন অধ‍্যায়

সম্প্রতি নেপাল, বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কার রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে একটা বিষয় স্পষ্ট যে, দক্ষিণ এশিয়ার এই ক্ষুদ্র দেশগুলোর জনতা বর্তমানে আর পুরোনো রাজনৈতিক বন্দোবস্তে সন্তুষ্ট নয়। দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতির উন্নয়ন, পরিবর্তন, স্বচ্ছতা, সাথে জনতার অংশগ্রহণের সুষম একটি রাজনৈতিক চর্চার জন‍্য উপাদানগুলোর যথাযথ সংমিশ্রণ ও ফলাফলে নিজেদের কাঙ্ক্ষিত আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন দেখতে তারা এখন আগ্রহী।   মানুষ এখন তথাকথিত গতানুগতিক রাজনৈতিক বলয় থেকে বেরিয়ে নতুন ধারার কাঠামো গড়ে তোলার পক্ষে। সেই সাথে নিজেদের অধিকার আদায়ের দাবির পাশাপাশি শিক্ষা, সচেতনতা, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যপাঠ ও চর্চার বিষয়টিকেও তারা সমান্তরালভাবে রাজনীতির চিন্তা-চেতনার সাথে গ্রথিত করে নিচ্ছে।   প্রচলিত যেকোনো ন্যারেটিভের বিপরীতে দাঁড়িয়ে পরাশক্তির নিকট বশ্যতা অস্বীকার করে নিজ রাষ্ট্রকে এক সমুন্নত মর্যাদায় উন্নীত করতে জনগণ এখন অনেক সোচ্চার। আর গণ-আন্দোলনের পরে পরিবর্তিত এই পরিস্থিতিগুলো আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক পর্যায়ে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণের জন্ম দিচ্ছে।   নেপালে যেখানে তরুণ প্রজন্মের উত্থান কেবল দেশীয় রাজনৈতিক পরিবর্তনে সন্তুষ্ট না থেকে একে আধুনিক ও উন্নয়নমুখী রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলার শপথ নেয়, অপরপক্ষে বাংলাদেশের অভ্যুত্থান-পরবর্তী পর্যায়ে স্বাধীন ও স্বতন্ত্র একটি দেশ হিসেবে নিজেদের সিদ্ধান্ত নিজেই গ্রহণ করার ব্যাপারে আগ্রহী হয়ে উঠছে৷ ইতোপূর্বে বিদেশি প্রভাব দেশীয় গণতন্ত্র ও জাতীয় স্বার্থকে প্রভাবিত করলেও বাংলাদেশে সেটি বর্তমানে রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে সীমাবদ্ধ না থেকে আঞ্চলিক সংস্কৃতি ও ধর্মীয় প্রথার ওপরও প্রভাব ফেলছে। অন্যদিকে শ্রীলঙ্কার আন্দোলন প্রমাণ করেছে, জনগণের মৌলিক চাহিদা পূরণে ব্যর্থ কোনো সরকারের জনতার হাতে পরাস্ত হওয়াটাই নিয়তি। একটি দেশের অর্থনীতি ধসে পড়লে প্রকৃতপক্ষে রাজনৈতিক ক্ষমতাটাও গুঁড়িয়ে যায়। এদিকে আফগানিস্তানে আলোকপাত করলে দেখা যায়, তালেবান পুনরায় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ায় সেখানকার নিপীড়িত, নিমজ্জিত জাতির মাঝেও অসন্তোষ ও দাবিদাওয়া বিদ্যমান, যদিও প্রকাশের সুযোগ সীমিত৷ ক্ষুদ্র এসব রাষ্ট্রকে কেন্দ্র করে আঞ্চলিক রাজনীতির সাথে বৈশ্বিক রাজনীতির এক নতুন মেরুকরণ রচিত হচ্ছে। পরিবর্তিত রাজনৈতিক সব পটভূমিকে কেন্দ্র করে ভারত, পাকিস্তান, চীন, রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র তাদের কৌশলগত রাজনীতির প্রতিযোগিতাকে প্রখর করে তুলছে৷ ভারতের সাথে নেপালের ঐতিহাসিক একটি ঘনিষ্ঠ সংযোগ থাকলেও এখন চীনের সঙ্গে এর অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক দেশটির পরিবর্তিত রাজনীতিকে এক নতুন মোড়ে এনে দাঁড় করিয়েছে৷   পক্ষান্তরে বাংলাদেশের চব্বিশের অভ্যুত্থান একটি জাতীয় সার্বভৌমত্ব, সাংস্কৃতিক মর্যাদা ও ধর্মীয় ঐতিহ্যের প্রতি জনগণের একটি সংরক্ষক মনোভাবের জন্ম দিচ্ছে, যাতে করে নিজ কূটনৈতিক স্বার্থে এতিহাসিক দ্বন্দ্ব ভুলে পাকিস্তান বাংলাদেশের সাথে তার সম্পর্ককে বেগবান করতে চাইছে। (সম্প্রতি পাকিস্তানে ভিসামুক্ত সুবিধা, সরাসরি সমুদ্র ও বিমান যোগাযোগ সুবিধাসহ দেশটির উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ঢাকা সফর, পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নকভি এবং বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মাঝে অনুষ্ঠিত পররাষ্ট্রসচিব পর্যায়ের বৈঠক এমন ইঙ্গিতই বহন করে) শ্রীলঙ্কায় ধসে পড়া পলিটিক্যাল দৃশ্য বদলাতে ভারত এগিয়ে আসা সত্ত্বেও সেখানে চীন তার শক্তিশালী প্রভাব বিস্তার করছে৷ চীনের এই কৌশলগত ও বিনিয়োগনীতি একইভাবে প্রভাবিত করছে পাকিস্তান, নেপালসহ বাংলাদেশেও। তবে আফগানিস্তানে সৃষ্ট পরিবর্তনকে পাকিস্তান অনেকটাই অস্বস্তির চোখে দেখে। যেহেতু এশিয়ার একটি শক্তিধর দেশ হিসেবে ভারতের ঐতিহাসিক ও কূটনৈতিক প্রভাব সেখানে বিদ্যমান। সে কারণে পাকিস্তান এটিকে নিজেদের জন্য হুমকি হিসেবেই দেখে আসছে।   ফলে আফগানিস্তানের যেকোনো পরিবর্তন স্পষ্টতই দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে একটি আলোড়ন তোলে৷ সংগঠিত সব রাজনৈতিক পরিবর্তন ও আন্দোলন এটাই সব সময় প্রমাণ করে নতুন সমাজব্যবস্থা গড়ে তোলার নিমিত্তে। যুগে যুগে সংগঠিত বিপ্লবগুলো প্রমাণ করেছে, ইতিহাস পরিবর্তনের লাগামটা মূলত জনতার হাতেই থাকে। আর বিক্ষোভ বিপ্লবে কেবল অভ্যন্তরীণ রাজনীতির রূপটাই বদলায় না, বরং আঞ্চলিক ও বিশ্বের বড় বড় শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলোকে বাধ্য করে নিজ রাজনীতির কৌশলকে নতুন করে সাজিয়ে নিতে। কৌতূহলে জেগেই ওঠে এসব পরিবর্তন মূলত দক্ষিণ এশিয়ার ভবিষ্যৎ রাজনীতিকে কোন খাতে প্রভাবিত করবে? এটা তো স্পষ্ট, সব দেশের জনগণ এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি সচেতন ও সোচ্চার। কোনো প্রকার ন্যারেটিভ চাপানো কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহার তারা মানতে নারাজ৷ উদাহরণ স্বরূপ, বর্তমানে ভারতের দিল্লিতে শিক্ষামন্ত্রীর পদত‍্যাগসহ আরও কিছু দাবি আদায়ে উত্তাল তরুণদের নতুন শক্তির উত্থান ও ক্রমবিকাশ এর আরও একটি প্রমাণ। সুতরাং, প্রমাণিত জনগণের কণ্ঠস্বরকে উপেক্ষা করার কোনো সুযোগ কোনো দেশের সরকারেরই নেই৷ আবার এই আন্দোলনগুলো বড় শক্তির রাষ্ট্রের ভূমিকাগুলোকে ক্রমেই জটিল করে তুলবে।   ভারত যেখানে ঐতিহ্যের প্রভাব বলয় ধরে রাখতে নিরাপদ সীমান্তের নিশ্চয়তা নিতে চাইবে নিজের আঞ্চলিক বাণিজ্য সম্প্রসারণের লক্ষ্যে, সেখানে পাকিস্তান চাইবে মিত্র দেশগুলোর সাথে ইতিবাচক সম্পর্ককে আরও দৃঢ় করতে। এদিকে চীন, যুক্তরাষ্ট্র, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো এই শূন্যতায় প্রভাব বিস্তারে তৎপর থাকবে। চীন যেখানে অর্থনৈতিক বিনিয়োগ এবং বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ প্রকল্পে মনোযোগী হবে, সেখানে গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের দোহাই দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারে সক্রিয় হবে এবং ইসলামি ঐক্যের সমর্থন জড়ো করতে পরিশ্রম করবে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো। এই বহুমাত্রিক ভূরাজনীতিতে এসব ক্ষুদ্র রাষ্ট্র গুরুত্বপূর্ণ হওয়ার পাশাপাশি এশিয়া ক্রমশ বৈশ্বিক শক্তির অদৃশ্য প্রতিযোগিতার সেন্টার পয়েন্ট হিসেবে দাঁড়াবে৷ জলবায়ুর পরিবর্তন তথা সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং পরিবেশগত অভিবাসনও আগামীর সময়ে দক্ষিণ এশিয়ায় নতুন সহযোগিতা ও বিরোধের জন্ম দিতে পারে, বিশেষ করে আন্তঃসীমান্ত নদীসমূহের পানি বণ্টন প্রশ্নে আঞ্চলিক উত্তেজনা তৈরির প্রবল সম্ভাবনা বিদ্যমান৷ নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও নতুন বাস্তবতা আসন্ন। সাইবার নিরাপত্তা, এআইভিত্তিক সামরিক প্রযুক্তি, সমুদ্র নিরাপত্তা আগামী দিনের প্রধান ইস্যু হয়ে উঠতে পারে।   ভারত মহাসাগরে কৌশলগত গুরুত্বের উত্থানে বিভিন্ন দেশের সামরিক উপস্থিতির সম্ভাবনাও কম নয়, যা একদিকে নিরাপত্তার আশ্বাস দিলেও অন্যদিকে প্রতিযোগিতা ও উত্তেজনার ঝুঁকি তৈরি করবে৷ অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে দক্ষিণ এশিয়ার সামনে বিশাল সম্ভাবনা থাকলেও রাজনৈতিক অবিশ্বাস, সীমান্ত বিরোধ তথা নিরাপত্তাহীনতা এমন সম্ভাবনার সম্মুখে প্রতিবন্ধক স্বরূপ৷ সব বিবেচনায় দক্ষিণ এশিয়ার বর্তমান পরিবর্তিত ভূরাজনীতি ভবিষ্যতে নতুন অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সুযোগ তৈরির সঙ্গে নতুন প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জও গড়ে তুলবে৷ এই অবস্থায় আঞ্চলিক রাষ্ট্রগুলোর জন্য দরকার সুস্থিতিশীল ও ভারসাম্যপূর্ণ একটি পররাষ্ট্রনীতির সঙ্গে পারস্পরিক সহযোগিতা এবং দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত পরিকল্পনা ও তার বাস্তবায়নের ওপর৷   মনে রাখা জরুরি, এই বৃহৎ অঞ্চলের জনগণ এখন কেবল দর্শক নয়, বরং তারা রাজনীতির মোড় ঘুরিয়ে দেয়ার দক্ষ সৈন্যবহর৷ তাই প্রয়োজন রাজনৈতিক স্বচ্ছতা ও ন্যায়বিচার কায়েম করা৷ নচেৎ যেকোনো বৃহৎ পরিবর্তন ঘটানো কেবলই সময়ের ব্যাপার৷ অতএব, দক্ষিণ এশিয়ার ভবিষ্যৎ তাই জনগণের প্রত্যাশা পূরণের ওপরও নির্ভরশীল৷ দক্ষিণ এশিয়ার আগামীর রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক স্থিতিশীলতা ও সমৃদ্ধ আজকের ভূরাজনৈতিক সিদ্ধান্তগুলোর ওপরই গড়ে উঠবে৷ অতএব, ছক সাজাতে হবে ভেবেচিন্তে; বিরোধ নয়, বরং পারস্পরিক রাষ্ট্রের সম্মান ও সম্প্রীতির বার্তার ওপর ভর করে৷

জুলাই ১৯, ২০২৬ 0
পরাশক্তিগুলোর দৌরাত্ম্যে বিশ্ব কি বিপর্যয়ের পথে
পরাশক্তিগুলোর দৌরাত্ম্যে বিশ্ব কি বিপর্যয়ের পথে

বিশ্ব রাজনীতির মানচিত্র যেন আবারও এক অস্থির সময়ের দিকে এগোচ্ছে। একদিকে সামরিক শক্তির প্রদর্শন, অন্যদিকে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, প্রযুক্তিগত আধিপত্য, সাইবার প্রতিযোগিতা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সামরিক ব্যবহার এবং পারমাণবিক অস্ত্রের আধুনিকায়ন - সব মিলিয়ে পৃথিবী এমন এক বাস্তবতার মুখোমুখি, যেখানে শান্তি আর যুদ্ধের মধ্যবর্তী সীমারেখা ক্রমেই অস্পষ্ট হয়ে উঠছে। এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন জাগে, পরাশক্তিগুলোর ক্রমবর্ধমান প্রতিদ্বন্দ্বিতা কি বিশ্বকে কেবল বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিচ্ছে, নাকি মানবসভ্যতা ইতোমধ্যেই এক মহাসংকটের মধ্যে প্রবেশ করেছে?    এ প্রশ্নের উত্তর আবেগ নিয়ে নয়, বাস্তবতার আলোকে খুঁজতে হবে। কারণ, বিশ্ব ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে এমন ঘোষণা যেমন অতিরঞ্জিত, তেমনি সবকিছু স্বাভাবিক আছে এমন ধারণাও বাস্তবতার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। বর্তমান বিশ্ব এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে প্রতিটি বড় শক্তির কৌশলগত সিদ্ধান্তের প্রভাব সীমান্ত পেরিয়ে কোটি কোটি মানুষের জীবনে পৌঁছে যায়।    বিশ্ব রাজনীতিতে পরাশক্তির প্রতিযোগিতা নতুন নয়। ইতিহাসে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য, ফরাসি প্রভাব, সোভিয়েত ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে বিভিন্ন সময়ে ক্ষমতার ভারসাম্য পরিবর্তিত হয়েছে। কিন্তু বর্তমান সময়ের প্রতিযোগিতা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি জটিল। কারণ, এখন যুদ্ধ কেবল ট্যাংক, যুদ্ধবিমান বা নৌবহরের মাধ্যমে পরিচালিত হয় না; যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়েছে অর্থনীতি, প্রযুক্তি, মহাকাশ, সাইবার অবকাঠামো ও তথ্যপ্রবাহের জগতে।   বিশ্বের বড় শক্তিগুলো নিজেদের নিরাপত্তা ও জাতীয় স্বার্থের কথা বললেও বাস্তবে তাদের প্রতিযোগিতার অভিঘাত সবচেয়ে বেশি পড়ে সাধারণ মানুষের ওপর। একটি আঞ্চলিক সংঘাতও আজ বৈশ্বিক খাদ্যবাজার, জ্বালানি সরবরাহ, পরিবহন ব্যয় এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে। ফলে হাজার মাইল দূরের যুদ্ধও অন্য দেশের মানুষের রান্নাঘর, কর্মসংস্থান ও জীবনযাত্রাকে প্রভাবিত করে।   বর্তমান সময়ে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো পারমাণবিক অস্ত্র। পৃথিবীতে এমন পরিমাণ পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে, যার একটি ক্ষুদ্র অংশ ব্যবহৃত হলেও মানবসভ্যতা অকল্পনীয় বিপর্যয়ের মুখে পড়তে পারে। যদিও পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্রগুলো পারস্পরিক প্রতিরোধের নীতিকে যুদ্ধ ঠেকানোর একটি উপায় হিসেবে তুলে ধরে, তবুও ভুল হিসাব, প্রযুক্তিগত ত্রুটি বা রাজনৈতিক উত্তেজনা থেকে বড় ধরনের সংঘাতের ঝুঁকি কখনো পুরোপুরি উড়িয়ে দেয়া যায় না। ইতিহাস বহুবার দেখিয়েছে, যুদ্ধ অনেক সময় পরিকল্পনার চেয়ে ভুল সিদ্ধান্তের ফলেই শুরু হয়েছে।   অন্যদিকে প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতি নতুন ধরনের নিরাপত্তা সংকট তৈরি করেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র, ড্রোন, স্যাটেলাইটভিত্তিক নজরদারি ও সাইবার সক্ষমতা যুদ্ধের চরিত্র বদলে দিয়েছে। আজ একটি সফল সাইবার হামলা কোনো দেশের বিদ্যুৎব্যবস্থা, ব্যংকিং খাত, হাসপাতাল কিংবা যোগাযোগ নেটওয়ার্ককে অচল করে দিতে পারে। ফলে যুদ্ধের ময়দান আর সীমান্তে সীমাবদ্ধ নেই, তা মানুষের দৈনন্দিন জীবনেও প্রবেশ করেছে।    অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতাও এখন শক্তির অন্যতম প্রধান হাতিয়ার। বাণিজ্যযুদ্ধ, প্রযুক্তি রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা, সরবরাহ শৃঙ্খলের ওপর নিয়ন্ত্রণ এবং গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদের দখল নিয়ে প্রতিযোগিতা আন্তর্জাতিক সম্পর্ককে আরও জটিল করে তুলেছে। এর ফলে উন্নয়নশীল দেশগুলোকে প্রায়ই বড় শক্তিগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে তাদের উন্নয়ন পরিকল্পনা, বিনিয়োগ ও কূটনৈতিক অবস্থানও এই প্রতিযোগিতার দ্বারা প্রভাবিত হয়।   তবে এই বাস্তবতার আরেকটি দিকও রয়েছে। বিশ্ব অর্থনীতি আজ এতটাই আন্তঃনির্ভরশীল যে বড় আকারের যুদ্ধ পরাশক্তিদের নিজেদের জন্যও মারাত্মক ক্ষতির কারণ হতে পারে। আধুনিক শিল্প, প্রযুক্তি, জ্বালানি, আর্থিক ব্যবস্থা ও বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খল একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে সংযুক্ত। ফলে পূর্ণমাত্রার সংঘাত কোনো এক দেশের নয়, সবার জন্যই দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির কারণ হতে পারে। এই পারস্পরিক নির্ভরশীলতাই অনেক ক্ষেত্রে বড় শক্তিগুলোকে সংযত থাকতে বাধ্য করে।    পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে বড় সংকট সামরিক নয়; এটি আস্থার সংকট। রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে পারস্পরিক অবিশ্বাস যত বাড়ছে, ততই অস্ত্র প্রতিযোগিতা তীব্র হচ্ছে। এক পক্ষ নিজের নিরাপত্তা বাড়ানোর জন্য যে পদক্ষেপ নিচ্ছে, অন্য পক্ষ সেটিকে হুমকি হিসেবে দেখছে। এই নিরাপত্তা-দ্বন্দ্বই আন্তর্জাতিক সম্পর্ককে আরও অস্থিতিশীল করে তুলছে।   আরও একটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। পৃথিবীর জলবায়ু পরিবর্তন, খাদ্যনিরাপত্তা, মহামারি, জ্বালানি রূপান্তর, পানির সংকট এবং বৈশ্বিক বৈষম্যের মতো বহু বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এসব সমস্যা কোনো একক রাষ্ট্রের পক্ষে সমাধান করা সম্ভব নয়। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে পরাশক্তিগুলোর রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা অনেক সময় এসব যৌথ বৈশ্বিক সমস্যা সমাধানের প্রচেষ্টাকেও দুর্বল করে দেয়।   ছোট ও মাঝারি শক্তির দেশগুলোর জন্য এমন পরিস্থিতি আরও সংবেদনশীল। তাদের জন্য প্রয়োজন ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি, বহুমুখী অর্থনৈতিক সম্পর্ক, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক আইন ও কূটনীতির প্রতি অঙ্গীকার। কোনো একটি শক্তির সঙ্গে অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকি সৃষ্টি করতে পারে।    সবশেষে বলা যায় যে, বর্তমান বিশ্বকে কেবল বিপর্যয়ের পথে বা মহাসংকটে - এ দুইয়ের যেকোনো একটি শব্দে সীমাবদ্ধ করা যথেষ্ট নয়। বাস্তবতা হলো, বিশ্ব একটি গভীর ও বহুমাত্রিক মহাসংকটের ঝুঁকিপূর্ণ পর্যায়ে রয়েছে। এ সংকট এখনো নিয়ন্ত্রণের বাইরে যায়নি, কিন্তু ভুল সিদ্ধান্ত, অনিয়ন্ত্রিত সংঘাত বা সহযোগিতার অভাব এটিকে বড় বিপর্যয়ে রূপ দিতে পারে।   তবে সবকিছুর পরও হতাশার কারণ নেই। ইতিহাস দেখায় যে, তীব্র প্রতিযোগিতার সময়ও কূটনীতি, সংলাপ এবং পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে সমঝোতা সম্ভব হয়েছে। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক কখনোই স্থির নয়; সংঘাতের পাশাপাশি সহযোগিতাও এর অবিচ্ছেদ্য অংশ। অর্থনীতি, জলবায়ু, জনস্বাস্থ্য ও বৈশ্বিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে  বড় শক্তিগুলোর সহযোগিতা এখনো বিশ্ব স্থিতিশীলতার জন্য অপরিহার্য।   পরাশক্তিগুলোর প্রতিযোগিতা মানবসভ্যতার জন্য একটি বাস্তব ও গুরুতর চ্যালেঞ্জ। তবে এটি এমন নয় যে, বিশ্ব অবধারিতভাবে ধ্বংসের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে শক্তির প্রদর্শনের চেয়ে সংলাপকে, সংঘাতের চেয়ে কূটনীতিকে এবং সংকীর্ণ জাতীয় স্বার্থের চেয়ে বৈশ্বিক দায়বদ্ধতাকে কতটা গুরুত্ব দেয়া হয় তার ওপর। ক্ষমতার রাজনীতি যদি সহযোগিতার রাজনীতিকে পুরোপুরি ছাপিয়ে যায়, তাহলে বর্তমান মহাসংকট একসময় বৈশ্বিক বিপর্যয়ে পরিণত হতে পারে। আর যদি আন্তর্জাতিক নেতৃত্ব দূরদর্শিতা, সংযম ও পারস্পরিক আস্থাকে অগ্রাধিকার দেয়, তবে এ সংকটই ভবিষ্যতে আরও ভারসাম্যপূর্ণ ও স্থিতিশীল বিশ্বব্যবস্থা গঠনের সুযোগ হয়ে উঠতে পারে।  

জুলাই ১৯, ২০২৬ 0
বিদেশি ভাষাশিক্ষা, পঞ্চম শিল্পবিপ্লব ও মানবিক বুদ্ধিমত্তার বিকাশ
বিদেশি ভাষাশিক্ষা, পঞ্চম শিল্পবিপ্লব ও মানবিক বুদ্ধিমত্তার বিকাশ

একসময় বিদেশি ভাষা শেখাকে শখ হিসেবে দেখা হতো। কেউ সাহিত্য পড়তেন। কেউ ভ্রমণের জন্য শিখতেন। কেউ আবার ব্যক্তিগত আগ্রহে নতুন ভাষা আয়ত্ত করতেন। এখন সেই বাস্তবতা বদলে গেছে। আজ বিদেশি ভাষাশিক্ষা একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক দক্ষতা। এটি উচ্চশিক্ষা, চাকরি, গবেষণা, ব্যবসা, অভিবাসন ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগের সঙ্গে যুক্ত। বিশেষ করে, পঞ্চম শিল্পবিপ্লবের যুগে ভাষাজ্ঞান মানুষের পেশাগত ও মানবিক সক্ষমতাকে নতুন মাত্রা দিচ্ছে।   বর্তমান বিশ্বে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবট, অটোমেশন ও তথ্য বিশ্লেষণ দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। প্রযুক্তি আমাদের কাজের ধরন বদলে দিচ্ছে। কিন্তু ভবিষ্যতের সমাজ শুধু যন্ত্রনির্ভর হবে না। সেখানে মানুষের সৃজনশীলতা, নৈতিকতা, সহমর্মিতা ও যোগাযোগ ক্ষমতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ হবে। এ প্রযুক্তি ও মানবিকতার সমন্বয়ই পঞ্চম শিল্পবিপ্লব বা ইন্ডাস্ট্রি ৫.০-এর মূল কথা।   চতুর্থ শিল্পবিপ্লব প্রযুক্তি, উৎপাদনশীলতা ও অটোমেশনের ওপর বেশি গুরুত্ব দিয়েছিল। পঞ্চম শিল্পবিপ্লব সেই প্রযুক্তিকে মানুষের আরও কাছে নিয়ে আসে। এখানে শুধু প্রশ্ন করা হয় না, একটি যন্ত্র কত দ্রুত কাজ করতে পারে? প্রশ্ন করা হয়, সেই যন্ত্র মানুষের জীবন কতটা সহজ করছে? প্রযুক্তি কি নিরাপত্তা বাড়াচ্ছে? এটি কি পরিবেশ রক্ষা করছে? কর্মক্ষেত্রে মানুষের মর্যাদা কি বজায় থাকছে? সমাজের দুর্বল জনগোষ্ঠী কি প্রযুক্তির সুবিধা পাচ্ছে?   পঞ্চম শিল্পবিপ্লব মানুষকে উৎপাদনব্যবস্থার কেন্দ্রে রাখে। এটি প্রযুক্তিকে মানুষের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখে না। বরং সহযোগী হিসেবে দেখে। একটি রোবট ভারী কাজ করতে পারে। এটি পুনরাবৃত্তিমূলক কাজও করতে পারে। কিন্তু নেতৃত্ব, সহানুভূতি, পরিকল্পনা, নৈতিক সিদ্ধান্ত ও সংকট ব্যবস্থাপনা মানুষের দায়িত্ব। তাই ভবিষ্যতের কর্মক্ষেত্রে প্রযুক্তিগত জ্ঞানের পাশাপাশি ভাষা ও যোগাযোগ দক্ষতা প্রয়োজন। জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বা এসডিজির উদ্দেশ্য হলো ন্যায়সংগত, শান্তিপূর্ণ ও পরিবেশবান্ধব একটি বিশ্ব গড়ে তোলা।   এসডিজির ১৭টি লক্ষ্য শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, বৈষম্য, পরিবেশ, শিল্প, শান্তি ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার সঙ্গে সম্পর্কিত। শুধু প্রযুক্তি দিয়ে উন্নয়ন সম্ভব নয়। সহযোগিতা প্রয়োজন। বোঝাপড়া প্রয়োজন। বিভিন্ন ভাষা ও সংস্কৃতির মানুষের মধ্যে কার্যকর যোগাযোগ প্রয়োজন। এসডিজি কোনো এক দেশের একক দায়িত্ব নয়। জলবায়ু পরিবর্তন, দারিদ্র্য, খাদ্যনিরাপত্তা, জনস্বাস্থ্য ও শিক্ষা এখন বৈশ্বিক বিষয়। এসব সমস্যা মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক অংশীদারত্ব জরুরি। আর সেই অংশীদারত্বের ভিত্তি হলো ভাষা ও যোগাযোগ। বিশ্বের বহু দেশে বাংলা ভাষাভাষী মানুষ বসবাস করেন। ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা, মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা ও এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে বাঙালি জনগোষ্ঠী রয়েছে। এই বৈশ্বিক বাস্তবতায় ফরাসি ভাষা শেখা একটি ভবিষ্যৎমুখী সিদ্ধান্ত। ফরাসি শুধু ফ্রান্সের ভাষা নয়, এটি কানাডা, বেলজিয়াম, সুইজারল্যান্ড এবং আফ্রিকার বহু দেশে ব্যবহৃত হয়। অনেক আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে ফরাসি একটি গুরুত্বপূর্ণ ভাষা।   উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রেও ফরাসির গুরুত্ব রয়েছে। ফ্রান্স, কানাডা, বেলজিয়াম ও সুইজারল্যান্ডের অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি মাধ্যমে পড়াশোনার সুযোগ আছে। কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও ফরাসি গুরুত্বপূর্ণ। দূতাবাস, আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা, জাতিসংঘের প্রতিষ্ঠান, বহুজাতিক কোম্পানি, বিমান সংস্থা, পর্যটন, অনুবাদ, গণমাধ্যম এবং মানবিক সহায়তা কার্যক্রমে ফরাসি জানা প্রার্থীরা বাড়তি সুবিধা পান।   বাংলাদেশের তৈরি পোশাক, ওষুধ, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষিপণ্য, চামড়া ও সেবা খাতের আন্তর্জাতিক বাজার রয়েছে। ফরাসিভাষী দেশের ক্রেতা ও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ ব্যবসায়িক সম্পর্ককে শক্তিশালী করতে পারে। আফ্রিকার বহু দেশে ফরাসি প্রশাসন, শিক্ষা ও ব্যবসার ভাষা। সেখানে কৃষি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, পরিবেশ, জলবায়ু পরিবর্তন ও মানবিক সহায়তায় কাজ করতে ফরাসি দক্ষতা কার্যকর।   বিদেশি ভাষা শেখা শুধু শব্দ ও ব্যাকরণ শেখা নয়, এটি মানুষের আবেগ বোঝার ক্ষমতাও বাড়াতে পারে। আবেগিক বুদ্ধিমত্তা হলো নিজের এবং অন্যের আবেগ শনাক্ত করা, বোঝা, প্রকাশ করা ও নিয়ন্ত্রণ করার সক্ষমতা। এর মধ্যে আত্মসচেতনতা, আত্মনিয়ন্ত্রণ, সহমর্মিতা ও সম্পর্ক পরিচালনা অন্তর্ভুক্ত।   বাংলায় ‘অভিমান’, ‘মায়া’, ‘লজ্জা’ বা ‘সম্মান’ যেভাবে প্রকাশ করা হয়, অন্য ভাষায় তা ভিন্ন হতে পারে। একই অনুভূতি বিভিন্ন সংস্কৃতিতে ভিন্ন শব্দ, ভিন্ন ভঙ্গি এবং ভিন্ন সামাজিক অর্থ বহন করে। বিদেশি ভাষা শেখার সময় শিক্ষার্থী বুঝতে পারেন যে অনুভূতি সর্বজনীন হলেও তার প্রকাশ সংস্কৃতিনির্ভর। এই উপলব্ধি আবেগ সম্পর্কে তার দৃষ্টিভঙ্গিকে আরও সূক্ষ্ম করে।   বিদেশি ভাষায় কথা বলার সময় একজন মানুষ শব্দ নির্বাচন, কণ্ঠস্বর ও শ্রোতার প্রতিক্রিয়ার দিকে বেশি মনোযোগ দেন। এই অনুশীলন আত্মনিয়ন্ত্রণ ও সহমর্মিতা বাড়াতে পারে। প্রকৃত আবেগিক বুদ্ধিমত্তা আবেগকে দমন করা নয়, বরং আবেগকে বুঝে যথাযথভাবে পরিচালনা করা এবং সাংস্কৃতিক বুদ্ধিমত্তা হলো ভিন্ন সংস্কৃতির মানুষের সঙ্গে সম্মানজনক ও কার্যকরভাবে কাজ করার সক্ষমতা। ভাষা ও সংস্কৃতিকে আলাদা করা যায় না। একটি ভাষার সম্ভাষণ, সম্বোধন, রসিকতা, নীরবতা, ভদ্রতা ও মতবিরোধ প্রকাশের ধরন সেই সমাজের মূল্যবোধ বহন করে।   কোনো সংস্কৃতিতে সরাসরি কথা বলা স্বাভাবিক। অন্য সংস্কৃতিতে পরোক্ষ ভাষা বেশি গ্রহণযোগ্য। কোথাও প্রথম নাম ধরে ডাকা স্বাভাবিক। কোথাও পদবি ও সম্মানসূচক শব্দ জরুরি। বিদেশি ভাষা শেখার সময় শিক্ষার্থী এসব পার্থক্য দেখতে পান। তিনি বুঝতে শেখেন যে নিজের সংস্কৃতির আচরণই একমাত্র স্বাভাবিক আচরণ নয়। এটি সাংস্কৃতিক আপেক্ষিকতার ধারণা তৈরি করে। এর অর্থ সব আচরণকে অন্ধভাবে গ্রহণ করা নয়। বরং কোনো আচরণ বিচার করার আগে তার সামাজিক ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বোঝা। এই দক্ষতা আন্তর্জাতিক শিক্ষা, কূটনীতি, ব্যবসা, উন্নয়নকর্ম, পর্যটন ও বহুজাতিক কর্মক্ষেত্রে খুবই গুরুত্বপূর্ণ।   সামাজিক বুদ্ধিমত্তা হলো সামাজিক সংকেত বোঝা, সম্পর্ক তৈরি করা, পরিস্থিতি অনুযায়ী আচরণ করা এবং বিরোধ সামলানোর সক্ষমতা। বিদেশি ভাষায় কথা বলার সময় সঠিক শব্দ সব সময় মনে পড়ে না। তখন শিক্ষার্থীকে সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা করতে হয়। অঙ্গভঙ্গি ব্যবহার করতে হয়। শ্রোতার মুখভঙ্গি লক্ষ করতে হয়। প্রয়োজনে নিজের বক্তব্য নতুনভাবে সাজাতে হয়। এই প্রক্রিয়া যোগাযোগের নমনীয়তা বাড়ায়। এটি ধৈর্য শেখায়। মনোযোগ দিয়ে শুনতে শেখায়। ভুল স্বীকার করতে শেখায়।   ফরাসিভাষী অঞ্চলে শুধু ইংরেজির ওপর নির্ভর করলে সামাজিক দূরত্ব তৈরি হতে পারে। স্থানীয় ভাষা জানলে বন্ধুত্ব গড়া সহজ হয়। প্রতিবেশীর সঙ্গে যোগাযোগ উন্নত হয়। কর্মক্ষেত্রে সম্পর্ক শক্তিশালী হয়। তাই ফরাসি শেখা শুধু পেশাগত দক্ষতা নয়, এটি সামাজিক অন্তর্ভুক্তিরও একটি কার্যকর মাধ্যম।   বিদেশি ভাষা শেখার সময় মস্তিষ্ককে একসঙ্গে অনেক কাজ করতে হয়। নতুন শব্দ মনে রাখতে হয়। ব্যাকরণ প্রয়োগ করতে হয়। উচ্চারণ শনাক্ত করতে হয়। মাতৃভাষার প্রভাব নিয়ন্ত্রণ করতে হয়। আবার প্রয়োজনের সময় সঠিক ভাষাটি দ্রুত নির্বাচন করতে হয়। এই অনুশীলন মনোযোগ, কার্যকর স্মৃতি, ভাষাগত সচেতনতা ও মানসিক নমনীয়তার সঙ্গে যুক্ত। দুটি ভাষার গঠন তুলনা করতে করতে একজন শিক্ষার্থী ভাষা কীভাবে কাজ করে, তা বুঝতে শেখেন। একে ভাষা-সম্পর্কিত উচ্চতর সচেতনতা বলা হয়।   মানুষের মস্তিষ্ক স্থির নয়। অভিজ্ঞতা ও অনুশীলনের মাধ্যমে মস্তিষ্কের কার্যকর সংযোগ বদলাতে পারে। এই সক্ষমতাকে Neuroplasticity বলা হয়। বিদেশি ভাষা শেখা শ্রবণ, স্মৃতি, মনোযোগ, উচ্চারণ ও অর্থ প্রক্রিয়াকরণের সঙ্গে যুক্ত স্নায়বিক ব্যবস্থাকে সক্রিয় করে। Neuro-Linguistic Programming বা NLP ভাষা, চিন্তার ধরন ও আচরণগত অভ্যাসের সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করে। এর প্রবক্তারা মনে করেন, ভাষা ও মানসিক কাঠামো পরিবর্তন করে যোগাযোগ ও আচরণে পরিবর্তন আনা সম্ভব। ভাষা শিক্ষায় এর কিছু ধারণার ব্যবহার দেখা যায়। যেমন ইতিবাচক আত্মকথন। ভুলের ভয়কে নতুনভাবে দেখা।   ফরাসি শেখার পথে বাংলা ভাষাভাষীদের কিছু বাস্তব সমস্যা রয়েছে। সবচেয়ে বড় বাধা হলো ভুল করার ভয়। এই ভয় আত্মবিশ্বাস কমিয়ে দেয়। ভাষা শেখার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো ছোট কিন্তু নিয়মিত অনুশীলন। প্রতিদিন ৩০ থেকে ৪০ মিনিট। বিচ্ছিন্ন শব্দ মুখস্থ না করে পুরো বাক্য শিখতে হবে। শুনতে হবে। বলতে হবে। পড়তে হবে। লিখতে হবে। উচ্চারণ উন্নত করতে অডিও শুনে বক্তার সঙ্গে সঙ্গে বলতে হবে। এই পদ্ধতিকে Shadowing বলা হয়। নিজের কণ্ঠ রেকর্ড করতে হবে। পুরোনো ও নতুন রেকর্ড তুলনা করতে হবে। এতে অগ্রগতি বোঝা যায়। মোবাইল অ্যাপ, অনলাইন ভিডিও, পডকাস্ট, ডিজিটাল অভিধান ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করা যায়। AI-এর সঙ্গে কথোপকথন করা যায়। ভুল বাক্য সংশোধন করা যায়। অনুশীলন করা যায়।   তবে প্রযুক্তি বাস্তব মানুষের বিকল্প নয়। শিক্ষক, বন্ধু বা ভাষাসঙ্গীর সঙ্গে কথা বলা জরুরি। কারণ আবেগ, নীরবতা, কণ্ঠস্বর ও সামাজিক আচরণ শুধু অ্যাপ দিয়ে পুরোপুরি শেখা যায় না। ভুলকে ব্যর্থতা নয়, শেখার অংশ হিসেবে দেখতে হবে। যত বেশি কথা বলা হবে, তত বেশি ভুল হবে। আবার তত দ্রুত উন্নতি হবে।   বিদেশি ভাষাশিক্ষা একটি মানসিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক যাত্রা। এটি নতুনভাবে কথা বলতে শেখায়। একই সঙ্গে নতুনভাবে শুনতে, ভাবতে, অনুভব করতে ও মানুষকে বুঝতে শেখায়। ফরাসি ভাষা বাংলা ভাষাভাষীদের জন্য উচ্চশিক্ষা, চাকরি, ব্যবসা, গবেষণা, অভিবাসন ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার নতুন দরজা খুলতে পারে। এটি আবেগিক বুদ্ধিমত্তা, সাংস্কৃতিক বুদ্ধিমত্তা, সামাজিক বুদ্ধিমত্তা ও জ্ঞানীয় বুদ্ধিমত্তার বিকাশেও সহায়ক হতে পারে। তবে এর জন্য প্রয়োজন নিয়মিত অনুশীলন। বাস্তব যোগাযোগ। সাংস্কৃতিক কৌতূহল ও ভুল করার সাহস।   পঞ্চম শিল্পবিপ্লবের যুগে শুধু প্রযুক্তি জানাই যথেষ্ট নয়। মানুষের প্রয়োজন যোগাযোগ ক্ষমতা, সৃজনশীলতা, নৈতিকতা ও সাংস্কৃতিক বোঝাপড়া। এ কারণে ফরাসি শেখা কোনো বিলাসিতা নয়। এটি একটি বাস্তব বিনিয়োগ। এটি নতুন মানুষ, নতুন সংস্কৃতি এবং নতুন সম্ভাবনার সঙ্গে সংযোগ তৈরির শক্তিশালী সেতু।  

জুলাই ১৯, ২০২৬ 0
শোষণের সংস্কৃতি ও সম্পদ পাচারের ইতিবৃত্ত
শোষণের সংস্কৃতি ও সম্পদ পাচারের ইতিবৃত্ত

  বাঙালি জাতিকে শোষণ করার দীর্ঘ একটি ইতিহাস আছে। অতীতে বিভিন্ন সময় বাঙালি জাতি শোষিত হয়েছে বহিরাগত শাসকগোষ্ঠীর মাধ্যমে। এখন বহিরাগত শাসক নেই, তবু শোষিত হচ্ছে। শোষিত হচ্ছে নিজেদের দ্বারাই। নিজেদের মধ্যেই এখন সৃষ্টি হয়েছে একটি শোষকগোষ্ঠী। শোষণ করছে নিজেদেরকেই। তাই বাঙালি এখন একই সাথে শোষক ও শোষিত।   স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে এই বিভাজন তৈরি হয়েছে এবং ক্রমশ বেড়েছে। ব্রিটিশ ও পাকিস্তান আমলে নিজেদের মধ্যে এই শোষক-শোষিত বিভাজন ছিল না। কারণ, তখন সবাই ছিল শোষিত। শোষিতদের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই একটি ঐক্য থাকে। শোষণের অবসান ঘটলে সেই ঐক্য আর থাকে না। তখন মানুষ ব্যক্তিকেন্দ্রিক হয়ে যায়। ব্যক্তিস্বাতন্ত্রবাদী চেতনা মানুষকে বিচ্ছিন্ন করে। বিচ্ছিন্ন মানুষ সব সময় নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত থাকে। নিজের স্বার্থে অন্যের স্বার্থ নষ্ট করে। নিজের সাথে অন্যের একটি বিভাজন সৃষ্টি করে। এভাবে সে হয় শোষক হয়ে ওঠে, নয়তো শোষিত হয়।   সাম্রাজ্যবাদী শোষণ কিংবা ঔপনিবেশিক শোষণের সাথে জাতির অভ্যন্তরীণ শ্রেণিশোষণের একটি পার্থক্য আছে। সাম্রাজ্যবাদী শোষণ হলো দখলদার কর্তৃক শোষণ। অন্যের দখলে থাকলে শোষিত হতে হয়। সেই শোষণ মেনে না নিয়ে উপায় থাকে না। তখন শোষিত জনগোষ্ঠী ঐক্যবদ্ধভাবে শোষিত হয়। ঔপনিবেশিক শোষণের চিত্রও অনেকটা একই। দখলকে দীর্ঘস্থায়ী করার জন্য দখলদাররাই উপনিবেশ তৈরি করে।   ঔপনিবেশিক শক্তি সব সময় শোষণের একটি রূপরেখা তৈরি করে নেয়। সেই রূপরেখায় শাসক ও শাসিতের মধ্যে একটি আইনগত বিষয় থাকে বটে; কিন্তু শোষণের পথও উন্মুক্ত থাকে। শাসকশক্তি উপনিবেশকে নানাভাবে শোষণ করে নিজেদের দেশকে সমৃদ্ধ করে। ভারতবর্ষ যখন ব্রিটিশ উপনিবেশ ছিল, তখন ব্রিটিশ শাসক ভারতবর্ষে কিছু উন্নয়নমূলক কাজ করেছে। অবকাঠামো উন্নয়ন ছাড়াও শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়ন, স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়ন এবং কিছু আচরণিক উন্নয়নের ফলে ভারতবাসীর  জীবনযাত্রায় পরিবর্তন এসেছিল বলে অনেকে ইংরেজ শাসকের প্রশংসা করেন।   ভারতবাসীকে আধুনিক বিশ্বের সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে ইংরেজ। আবার ভারতকে শোষণও করেছে সবচেয়ে বেশি। দেশভাগের সাথে বৃহৎ বাংলাও বিভক্ত হয়েছিল। বাংলার পূর্ব অংশ মুসলিমপ্রধান হওয়ায় পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল। পাকিস্তান সরকার ঔপনিবেশিক কায়দায় শোষণ করেছে দেশের এই পূর্ব অংশটি। ভৌগোলিকভাবে বিচ্ছিন্ন থাকার কারণে এই বৈষম্য ও শোষণ এতটাই উন্মুক্ত হয়েছিল যে তার সমাপ্তি ঘটেছিল মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশ নামক নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ফলে। বাঙালি জাতির এই ধারাবাহিক শোষণ ও সম্পদ নির্গমনের বিষয় তুলে ধরাই বর্তমান প্রবন্ধের লক্ষ্য।   পাল যুগ, সেন যুগ ও সুলতানি আমলে বাঙালি জাতির সমাজজীবনে খুব বেশি পরিবর্তন সাধিত হয়নি। সে সময় শাসকগোষ্ঠী ধর্ম, ভাষা ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে বিশেষ ভাষা ও ধর্মের পৃষ্ঠপোষকতা দিত বলে অন্যান্য ধর্ম, ভাষা ও সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল সমৃদ্ধ হতে পারত না। এটাকে সাংস্কৃতিক শোষণ বলা যেতে পারে।   মোগল আমল থেকে অর্থনৈতিক শোষণ প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেতে থাকে। এ সময় বাংলায় স্বাধীন নবাবি আমলের সূচনা হলেও দিল্লির সম্রাটকে মোটা অঙ্কের অর্থ দিয়েই নবাবি শাসন পরিচালনা করতে হতো। মোগল সম্রাট আকবর ১৫৮৬ খ্রিস্টাব্দে বাংলা অধিকার করে নতুন রাজস্বব্যবস্থা চালু করেন। তার আগে বারো ভূঁইয়ারা স্বাধীনভাবেই নিজ নিজ জমিদারি পরিচালনা করতেন।   বারো ভূঁইয়াদের হাত থেকে বাংলা অধিকার করে সম্রাট আকবর রাজা মানসিংহকে বাংলার সুবাদার নিযুক্ত করেন (১৫৯৪)। তখন থেকে সুবা বাংলার রাজস্ব দিয়ে বাংলার উন্নয়ন হোক বা না হোক, দিল্লির দরবারে নিয়মিত রাজস্ব দিতেই হয়েছে। সম্রাট আকবরের মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র জাহাঙ্গীর দিল্লির সিংহাসনে আরোহণ করেন।   সম্রাট জাহাঙ্গীর বাংলা থেকে বছরে ১০ লাখ টাকা নিতেন। সুবাদার শায়েস্তা খানের দৈনিক আয় ছিল দুই লাখ টাকা, যা তৎকালীন বিশ্বে ছিল বিরল ঘটনা। তাঁর সময় খাদ্যদ্রব্যের মূল্য কম ছিল। এই কম থাকার একটি মন্দ দিকও ছিল। টাকায় আট মণ চাল পাওয়া যেত বলে যে ইতিহাস পাওয়া যায়, সে ইতিহাসের উল্টোপিঠও বিবেচনায় আনা প্রয়োজন।   তখন বাংলার বেশির ভাগ লোক কৃষক ছিল। ফসল বিক্রি করেই তারা অন্যান্য প্রয়োজন মেটাত। তাই শস্যের দাম কম হওয়ায় তাদের খুব একটা লাভ হয়নি। বরং কম দামে শস্য বিক্রি করে খাজনা পরিশোধ করা তাদের জন্য কষ্টকর হয়েছে। মোগল সম্রাটদের মাত্রাতিরিক্ত বিলাসিতা আর ব্যয়বহুল স্থাপত্যের পেছনে ব্যয়িত বিপুল পরিমাণ অর্থের একটি বড় অংশের জোগান দিতে হয়েছে বাংলার দরিদ্র কৃষকদের।   মোগল হেরেম আর দৃষ্টিনন্দন দিল্লি শহর নির্মাণের পেছনে যে বাংলার কত হতদরিদ্র কৃষকের চোখের জলও যুক্ত আছে, সে খবর কে রেখেছে? কিছুটা পাওয়া যায় সাহিত্যে। এ বিষয়ে বহুল প্রচলিত লোকছড়াটি হলো-   খোকা ঘুমালো পাড়া জুড়ালো বর্গী এলো দেশে। বুলবুলিতে ধান খেয়েছে খাজনা দিব কিসে। ধান ফুরালো পান ফুরালো খাজনার উপায় কী। আর কটা দিন সবুর করো রসুন বুনেছি।   শান্তিপ্রিয় আর অসহায় কৃষকদের কষ্টার্জিত শস্য বর্গিরা লুট করে নিলে বুলবুলি পাখি বা অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগে ফসল খোয়া গেলে, এমনকি ধান ও পান ফুরিয়ে গেলেও সামনে যে শস্য ঘরে আসছে (রসুন) সেই শস্য বিক্রি করে খাজনা দেয়ার কথা চিন্তা করতে হতো কৃষকদের। বোঝাই যায়, শতকষ্টেও বাংলার কৃষকদের খাজনা দিতে হতো শাসকগোষ্ঠীর বিলাসিতার ব্যয় মেটানোর জন্য।   সুবাদার ইসলাম খাঁ সমগ্র বাংলায় মোগল শাসন সুদৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তিনি ঢাকায় অবস্থান করতেন এবং রাজমহল থেকে ঢাকায় রাজধানী স্থানান্তর করেছিলেন। মোগল সিম্রাট জাহাঙ্গীরের প্রতি গভীর আনুগত্য দেখিয়ে নতুন রাজধানী ঢাকার নামকরণ করেছিলেন জাহাঙ্গীরনগর (১৬১২)। মোগল আমলে বাংলার আরেকজন প্রভাবশালী সুবাদার ছিলেন শাহজাদা সুজা (সম্রাট শাহজাহানের পুত্র)। তিনি প্রায় ২১ বছর বাংলার শাসক ছিলেন। বাংলায় ইংরেজ বেনিয়াদের বাণিজ্যিক প্রভাব বিস্তারের সুযোগ সৃষ্টি করে দিয়েছিলেন তিনি। জেব্রাইল ব্রাউটন নামক এক ইংরেজ ডাক্তারের চিকিৎসায় সন্তুষ্ট হয়ে তিনি মাত্র তিন হাজার টাকা নজরানার বিনিময়ে সারা বাংলায় ইংরেজ বণিকদের বিনা শুল্কে বাণিজ্য করার অনুমতি দিয়েছিলেন। এতে বাংলার ব্যবসায়ীরা দারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল এবং বাংলার সম্পদ ইংল্যান্ডের ডান্ডি, ম্যানচেস্টারে পাচার হওয়ার পথ সৃষ্টি হয়েছিল।   পরবর্তী সময়ে বাংলায় ইংরেজ বণিকদের বাণিজ্য বহুগুণে বৃদ্ধি পেলেও তারা আগের মতোই তিন হাজার টাকাই নজরানা দিয়ে বিনা শুল্কে বাণিজ্য করত। সম্রাট আওরঙ্গজেবের আমলে সুবাদার শায়েস্তা খান ইংরেজ বণিকদের এই বিশেষ সুবিধা বাতিল করার চেষ্টা করলে ইংরেজদের সাথে সম্পর্কের অবনতি ঘটে। সম্রাট আওরঙ্গজেবের শাসনামলের শেষ দিকেই মোগল সাম্রাজ্যের পতন শুরু হয়। এ সময় মোগল রাজপরিবার প্রধানত বাংলার রাজস্ব দিয়েই চলত। ফলে তৎকালীন বাংলার সুবাদার মুর্শিদকুলী খানকে সম্রাট রাজস্ব ব্যাপারে সম্পূর্ণ স্বাধীনতা দিয়েছিলেন। এই স্বাধীনতার সুযোগে সুবাদার মুর্শিদকুলী খান নিজেকে নবাব হিসেবে ঘোষণা করে নবাবি আমলের সূত্রপাত করেন। কিন্তু তখনো বাংলা থেকে দিল্লির দরবারে রাজস্ব পাঠানো হতো। ‘নবাবি আমলে বাংলা থেকে দিল্লিতে (মোগল সম্রাটের দরবারে) এক কোটি পাঁচ লাখ টাকা থেকে এক কোটি পঁচিশ লাখ টাকা পর্যন্ত রাজস্ব নজরানাস্বরূপ পাঠানো হতো’ [ ড. এস এম হাসান, বাংলার ইতিহাস, পৃ.৩৩৭]।   মোগল সাম্রাজ্যের পতনের মাধ্যমে ভারতবর্ষে ইংরেজ শাসনের সূচনা হয়। বাংলায় নবাব আলীবর্দী খানের শাসনামলে ইংরেজ বণিকদের প্রভাব অনেক বেড়ে যায়। আলীবর্দী খান মারাঠা দস্যু বা বর্গীদের দমন করার জন্য প্রচুর অর্থ খরচ করেন এবং সময় সময় এই অর্থ ইংরেজদের নিকট থেকেও আদায় করতেন। নবাবকে সাহায্য করার সুযোগ নিয়ে ইংরেজরা আরও প্রভাবশালী হয়ে ওঠে। পরবর্তী সময়ে সিরাজউদ্দৌলার শাসনামলে পলাশীর যুদ্ধে (১৭৫৭) ষড়যন্ত্রমূলকভাবে বিজয়ী হয়ে শাসন ও শোষণ ক্ষমতা লাভের পথ নির্মাণ করে। বক্সারের যুদ্ধে (১৭৬৪) মীর কাসিমকে পরাজিত করে বাংলার আধিপত্য লাভ করে ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। ১৭৬৫ খ্রিস্টাব্দে সম্রাট দ্বিতীয় শাহ আলমের এক ফরমান বলে কোম্পানি বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার দেওয়ানি লাভ করে এবং একই সাথে বাংলায় নবাবের রাজত্ব শেষ হয় এবং কোম্পানির শাসন শুরু হয়। শুরুতেই কোম্পানি দিল্লির সম্রাটের বৃত্তি বন্ধ করে দেয় এবং বাংলার নবাবের বৃত্তি ৫৩ লাখ টাকা থেকে কমিয়ে প্রথমে ৪১ লাখ এবং পরে তা ৩২ লাখ নির্ধারণ করে। অন্যদিকে রাজস্ব আদায় মাত্রাতিরিক্ত হারে বৃদ্ধি করে। এ সম্পর্কে রেজা খান অভিযোগ করেন যে, নবাব আলীবর্দী খানের আমলে পূর্ণিয়া জেলায় বাৎসরিক রাজস্ব যেখানে মাত্র ৪ লাখ টাকা ছিল, সেখানে ১৭৬৯ খ্রিস্টাব্দে তা বৃদ্ধি করে ২৫ লাখ টাকায় উন্নীত করা হয়। অন্যান্য জেলাতেও একইভাবে রাজস্ব বৃদ্ধি পায়। রাজস্ব বৃদ্ধি পেলেও তা দিয়ে বাংলার উন্নয়ন হয়নি। বেশির ভাগ অর্থই চলে গেছে ইংল্যান্ডে। এর ফলেই বাংলায় দেখা দিয়েছিল ‘ছিয়াত্তরের মন্বন্তর’ (১১৭৬ বঙ্গাব্দ) নামক ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ। সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর ‘আনন্দমঠ’ উপন্যাসে এই ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের বর্ণনা দিয়েছেন।  কোম্পানির শাসনামলে বাংলাকে যেভাবে শোষণ করা হয়েছিল, তা শোষণের ইতিহাসের এক বড় অধ্যায়। ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দে সিপাহি বিপ্লবের মাধ্যমে এক শ বছরের কোম্পানি শাসনের অবসান হলে যে প্রকৃত ব্রিটিশ শাসন শুরু হয়, সেই শাসনেও বাংলার সম্পদ নির্গমনের ধারাবাহিকতা বজায় ছিল।   ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দে ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটে। বাংলা দুইভাবে বিভক্ত হয়ে পাকিস্তান অংশে পড়ে মুসলিম প্রধান পূর্ব বাংলা। শুরু হয় শোষণের আরেক ইতিহাস। এবার শুধু অর্থনৈতিক শোষণ নয়, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক শোষণের কবলে পড়ে বাঙালি জাতি। বাঙালি জাতির আত্মপরিচয় বিলুপ্ত করার ষড়যন্ত্র শুরু করে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী। প্রথমে বাংলা ভাষার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে ব্যর্থ হয়। তারপর বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের বাতিঘর রবীন্দ্রনাথকে বর্জন করে। মূলত সেখানেও ব্যর্থ হয়। কিন্তু অর্থনৈতিক শোষণ চালায় খুব সফলভাবে। পূর্ব পাকিস্তানের জনসংখ্যা বেশি হলেও রাজধানী স্থাপন করে পশ্চিম পাকিস্তানে। রাজনৈতিক তাৎপর্যমণ্ডিত শহর লাহোরকে বাদ দিয়ে করাচিতে রাজধানী স্থাপন করা হয় এবং রাজধানী উন্নয়নের নামে ২০০ কোটি টাকা খরচ করা হয়। পরবর্তী সময়ে আইয়ুব খান ইসলামাবাদে রাজধানী স্থানান্তর করে এর উন্নয়নের জন্য ব্যয় করেন ২০ কোটি টাকা। এ সময় ঢাকার উন্নয়নের জন্য ব্যয় করা হয় মাত্র ২ কোটি টাকা। সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনীর সদর দপ্তর এবং সমস্ত অস্ত্র কারখানা স্থাপিত হয় পশ্চিম পাকিস্তানে। সামরিক বাহিনীর চাকরিগুলো ছিল পশ্চিম পাকিস্তানের প্রায় একচেটিয়া। ফলে সামরিক খাতে ব্যয়িত অর্থের (বার্ষিক আয়ের ৭৫% এবং পরে ৬০%) সুবিধাভোগী ছিল সম্পূর্ণ পশ্চিম পাকিস্তানের জনগণ। ১৯৫৯-৬০ খ্রিস্টাব্দে পশ্চিম পাকিস্তানের জনগণের মাথাপিছু আয় ছিল পূর্ব পাকিস্তানের তুলনায় ৩২% বেশি। দশ বছর পরে (১৯৬৯-৭০) পার্থক্যের পরিমাণ এসে দাঁড়ায় ৬১%। কেন্দ্রীয় সরকারের সব হেড অফিস ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের হেড অফিস পশ্চিম পাকিস্তানে থাকায় পূর্ব পাকিস্তান থেকে অবাধে অর্থ চলে যেত পশ্চিম পাকিস্তানে। এভাবে পূর্ব পাকিস্তানের অর্জিত অর্থ দিয়েই হতো পশ্চিম পাকিস্তানের উন্নয়ন। পাকিস্তানের মোট জনসংখ্যার ৫৬%  ছিল পূর্ব পাকিস্তানে। অথচ কেন্দ্রীয় সরকার পূর্ব পাকিস্তানের জন্য ব্যয় করত ২০% (পরে ৩০% করা হয়েছিল)। পাকিস্তান সৃষ্টির ১৫ বছরের মাথায় পূর্ব পাকিস্তানের রাজস্ব ঘাটতি দেখা দেয় ৬০ কোটি টাকা। অথচ পশ্চিম পাকিস্তানে উদ্বৃত্ত হয় ৩৮ কোটি টাকা। কেন্দ্রীয় সরকারের এই সীমাহীন শোষণের ফলেই বাঙালি জাতি মুক্তির সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং ১৯৭১- এর ১৬ ডিসেম্বর অর্জন করে হাজার বছরের কাঙিক্ষত স্বাধীনতা।   একাত্তর-পরবর্তী বাংলাদেশ কি শোষণমুক্ত হতে পেরেছে? মোগল আমলে দিল্লির অধীনস্ত হওয়ার আগে প্রায় চার শতাব্দী পর্যন্ত অধিকাংশ সময় বাংলা স্বাধীন ছিল। সে সময় বাংলার ধন-সম্পদ বাংলায়ই থাকত। ফলে মোগলপূর্ব বাংলা খুবই সমৃদ্ধ ছিল। বিশ্ববিখ্যাত পর্যটক ইবনে বতুতা বাংলায় এসেছিলেন ১৩৪৬ খ্রিস্টাব্দে। তাঁর বর্ণনা থেকেও বাংলার সেই সমৃদ্ধির প্রমাণ পাওয়া যায়। মূলত মোগল আমল থেকেই শুরু হয় শোষণের সংস্কৃতি। মোগল আমলে বাংলার অর্থ চলে গেছে দিল্লিতে, ইংরেজ আমলে বাংলার অর্থ চলে গেছে ইংল্যান্ডে আর পাকিস্তান আমলে বাংলার অর্থ চলে গেছে পশ্চিম পাকিস্তানে। একাত্তর-পরবর্তী স্বাধীন বাংলাদেশের অর্থ কোথাও যাবে না; বাংলাদেশেই ব্যয় হবে, বাংলাদেশ হবে সুখী-সমৃদ্ধ সোনার বাংলা; এই আকাঙ্ক্ষা থেকেই মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী বাংলাদেশ শোষণমুক্ত হয়নি। বাংলাদেশের অর্থ বিদেশে পাচার হওয়াও বন্ধ হয়নি। এখন মোগল নেই, ইংরেজ নেই, পাকিস্তানি শোষকরাও নেই। তাহলে কে শোষক? শোষক নিজেদের মধ্যেই।   এখন বাঙালি নিজেদের দ্বারাই নিজেরা শোষিত। বাংলাদেশের অর্থ এখন আমেরিকা, কানাডা, মালয়েশিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পাচার হয় দেশের একশ্রেণির নীতিহীন রাজনীতিক, দুর্নীতিবাজ আমলা ও অসাধু ব্যবসায়ী-শিল্পপতিদের দ্বারা। যে দেশপ্রেমের চেতনায় মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল, তা এখন বিলুপ্তির পথে। দেশপ্রেম আর মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এখন আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে গেছে। জাতির জনক শেখ মুজিবুর রহমান বড় দুঃখ করে বলেছিলেন, “সবাই পায় সোনার খনি আর আমি পেয়েছি চোরের খনি।” বঙ্গবন্ধুর স্বল্পকালীন শাসনামলে ওই চোরদের দমন করা সম্ভব হয়নি। এখন ওই চোরদেরই বংশবিস্তার ঘটেছে। এরা দেশের টাকা চুরি করে বিদেশে পালিয়ে যায়। পাকিস্তান আমলে সামারিক-বেসামরিক অনেক আমলা টাকার কুমির হয়েছিল। তাদের পরিবার-পরিজন বিলাসী জীবন যাপন করতে করতে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল। বিষয়টিকে উপজীব্য করে কবি ও সাংবাদিক আব্দুল গণি হাজারী লিখেছিলেন ‘আমরা কতিপয় আমলার স্ত্রী’ নামক একটি প্রতীকী কবিতা। কবিতাটি ১৯৬৪ খ্রিস্টাব্দে ইউনেস্কো পুরস্কার লাভ করেছিল। বর্তমানে বাংলাদেশেও সামরিক-বেসামরিক অনেক আমলা সীমাহীন সম্পদের মালিক হয়ে যাচ্ছে। অসাধু রাজনীতিক ও ব্যবসায়ীরাও সম্পদের পাহাড় গড়ছে। বিদেশেও পাচার করছে। কানাডায় বেগম পাড়া আর মালয়েশিয়ায় সেকেন্ড হোম এই বাংলাদেশের অর্থেই গড়ে উঠেছে।   প্রাচীন বাংলা ধন-সম্পদে পরিপূর্ণ ছিল। বাংলার কৃষকের ‘গোলাভরা ধান, গোয়ালভরা গরু আর পুকুরভরা মাছ’ ছিল - কথাটি শুধু কথার কথা নয়। ইবনে বতুতা বাংলাকে ‘দোজখপুর নিয়ামত’ বা ধন-সম্পদে পরিপূর্ণ নরক বলেছিলেন। কারণ, বাংলার ধন-সম্পদে আকৃষ্ট হয়ে বহিঃর্শক্তি বাংলা আক্রমণ করে ধন-সম্পদ লুট করে নিত। লুণ্ঠনের এই ধারাবাহিকতা বর্তমানেও চলছে। তবে এখন বাইরের শক্তি নয়; ভেতরের শক্তিই লুণ্ঠন করছে। তারাই সম্পদ পাচার করছে। সম্পদ পাচারের সাথে এখন যোগ হয়েছে মেধা পাচার। মেধাবীরা এখন দেশ ছেড়ে যাওয়ার জন্য ব্যস্ত। ধরে রাখার চেষ্টাও নেই খুব একটা। প্রবাসে গিয়ে প্রায় সবাই স্থায়ী হতে চায়। যারা পিছিয়ে পড়ে, তারাই ফিরে আসে। ভালো কিছু করতে পারলে স্থায়ী হয়ে যায় প্রবাসেই। এটা দেশের জন্য শুভ লক্ষণ নয়। দেশের অবকাঠামো উন্নয়ন হচ্ছে। তবে সুশাসন ব্যতিত শুধু অবকাঠামো উন্নয়নকে প্রকৃত উন্নয়ন বলা যায় না। দুর্নীতি ক্রমশ বাড়ছে। ফলে মানবিক সমাজ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হচ্ছে না। শোষণ ও দুর্নীতিমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠিত না হলে সম্পদ ও মেধা দুটোই পাচার হয়ে যাবে। যেখানে মানুষের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠিত নয়, মানুষ সেখান থেকে মাইগ্রেট হয়ে যাবেই। তবে বাঙালির মাইগ্রেশন ঘটেছে দুইভাবে। কেউ শোষিত হয়ে দেশ ছেড়েছে। আবার কেউ শোষণ করে দেশ ছেড়েছে। যারা শোষণ করে দেশ ছেড়েছে, তারা একা যায়নি, সম্পদ নিয়ে গেছে। এখনো যাচ্ছে।  

জুলাই ১৯, ২০২৬ 0
শিক্ষার মানোন্নয়নের রূপরেখা : অগ্রাধিকার ও বাস্তবায়ন
শিক্ষার মানোন্নয়নের রূপরেখা : অগ্রাধিকার ও বাস্তবায়ন

  শিক্ষা একটি জাতির উন্নয়নের প্রধান ভিত্তি। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, প্রযুক্তিগত অগ্রগতি, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের মূল চালিকাশক্তি হলো মানসম্মত শিক্ষা। বাংলাদেশ গত কয়েক দশকে শিক্ষায় প্রবেশাধিকারের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে—বিশেষত প্রাথমিক শিক্ষায় ভর্তি প্রায় সর্বজনীন হয়েছে। কিন্তু শিক্ষার গুণগত মান এখনো একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যায়, বিদ্যালয়ে উপস্থিতি বাড়লেও শিক্ষার্থীদের মৌলিক দক্ষতা—বিশেষত পড়া, লেখা ও গণিতের দক্ষতা—উদ্বেগজনকভাবে দুর্বল। এই বাস্তবতায় শিক্ষার মান উন্নয়নের জন্য বিচ্ছিন্ন উদ্যোগ নয় বরং একটি সমন্বিত কৌশল প্রয়োজন, যেখানে শিক্ষাব্যবস্থার বিভিন্ন ফ্যাক্টর বিবেচনায় নিয়ে অগ্রাধিকার নির্ধারণ ও কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা হবে। মানসম্মত শিক্ষক নিশ্চিতকরণে দিতে হবে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।বিশ্বব্যাপী গবেষণা বলছে, শিক্ষার মান নির্ধারণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো শিক্ষক। একজন যোগ্য, দক্ষ ও আন্তরিক শিক্ষক একটি দুর্বল অবকাঠামোর স্কুলেও ভালো শিক্ষার পরিবেশ তৈরি করতে পারেন। বাংলাদেশে শিক্ষকসংখ্যা অনেক হলেও শিক্ষকের গুণগত মান নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। মেধাভিত্তিক ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় শিক্ষক নিয়োগ,শিক্ষক পেশার সামাজিক মর্যাদা ও বেতন বৃদ্ধি, ধারাবাহিক in-service training, শিক্ষক মূল্যায়ন ও জবাবদিহিতা ব্যবস্থা চালু করা জরুরি।  ফিনল্যান্ড, সিঙ্গাপুর ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশগুলোতে শিক্ষকতা একটি উচ্চ মর্যাদার পেশা—যেখানে সবচেয়ে মেধাবীরা শিক্ষকতায় আসে। বাংলাদেশের জন্যও এটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। শক্তিশালী প্রাথমিক শিক্ষার মাধ্যমে  শিক্ষার ভিত্তি নির্মাণ হয়। শিক্ষাবিদদের মতে, একটি শিশুর শিক্ষাজীবনের ভিত্তি তৈরি হয় প্রাথমিক স্তরে। কিন্তু বাংলাদেশে প্রাথমিক পর্যায়ে অনেক শিক্ষার্থী শ্রেণি অনুযায়ী দক্ষতা অর্জন করতে পারে না। কিছু গবেষণায় দেখা যায়, মাত্র ২৫% শিক্ষার্থী প্রাথমিক স্তরে প্রত্যাশিত পাঠ ও গণিত দক্ষতা অর্জন করতে পারে। প্রাথমিক স্তরে ভাষা ও গণিত দক্ষতার ওপর বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীসংখ্যা কমানো, শিশু-কেন্দ্রিক ও আনন্দময় শিক্ষা পদ্ধতি, শিক্ষকদের উন্নত প্রশিক্ষণ প্রাথমিক শিক্ষায় অগ্রাধিকারযোগ্য। পাঠ্যক্রম ও মূল্যায়ন ব্যবস্থার সংস্কার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরে পরীক্ষাকেন্দ্রিক। এর ফলে শিক্ষার্থীরা সৃজনশীল চিন্তা ও সমস্যা সমাধানের দক্ষতার পরিবর্তে মুখস্থবিদ্যায় অভ্যস্ত হয়ে পড়ে।  মুখস্থনির্ভর পরীক্ষা থেকে বের হয়ে  দক্ষতা-ভিত্তিক মূল্যায়ন প্রয়োজন। সমালোচনামূলক চিন্তা ও সমস্যা সমাধান দক্ষতা উন্নয়ন জরুরি। পাঠ্যক্রমকে শ্রমবাজার ও বাস্তব জীবনের সাথে সংযুক্ত করা সময়ের দাবী। এক্ষেত্রে ফিনল্যান্ডের শিক্ষা মডেল একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ, যেখানে পরীক্ষার চেয়ে শেখার ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। শিক্ষায় প্রযুক্তির কার্যকর ব্যবহার,  ডিজিটাল প্রযুক্তি শিক্ষার মান উন্নয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। কিন্তু বাংলাদেশে প্রযুক্তি ব্যবহারে শহর ও গ্রামের মধ্যে বড় বৈষম্য রয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, গ্রামীণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৭৭% নিয়মিত ইন্টারনেট সংযোগ সমস্যার মুখোমুখি হয়, যা ডিজিটাল শিক্ষাকে সীমিত করে। প্রতিটি বিদ্যালয়ে নির্ভরযোগ্য ইন্টারনেট ও ডিজিটাল ল্যাব, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের ডিজিটাল দক্ষতা উন্নয়ন, অনলাইন ও হাইব্রিড শিক্ষা পদ্ধতির উন্নয়ন জরুরি। শিক্ষা ব্যবস্থাপনায়  জবাবদিহিতা শক্তিশালী করা প্রয়োজন।  শিক্ষা উন্নয়নের অনেক প্রকল্প থাকলেও কার্যকর বাস্তবায়নের অভাবে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায় না। গত এক দশকে প্রাথমিক শিক্ষায় বিপুল অর্থ ব্যয় হলেও শিক্ষার্থীদের দক্ষতায় উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। শিক্ষা প্রকল্পে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা, তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ,বিদ্যালয় পর্যায়ে শক্তিশালী পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা জরুরি। শিক্ষায় সমতা ও অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করা জরুরি। বাংলাদেশে দরিদ্র, গ্রামীণ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর শিশুদের জন্য শিক্ষার সুযোগ এখনো সীমিত। অনেক ক্ষেত্রে দারিদ্র্য, শিশুশ্রম ও অল্প বয়সে বিয়ে শিক্ষাজীবন বাধাগ্রস্ত করে। দরিদ্র শিক্ষার্থীদের জন্য আর্থিক সহায়তা, প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা, দুর্গম অঞ্চলে বিদ্যালয় ও শিক্ষক প্রাপ্যতা বৃদ্ধি এই ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।  এছাড়া শিক্ষার সাথে কর্মসংস্থানের সংযোগ থাকা প্রয়োজন। বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থা অনেক সময় শ্রমবাজারের চাহিদার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ফলে উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন অনেক তরুণও কর্মসংস্থানের সংকটে পড়ে। STEM শিক্ষা ও উদ্ভাবনী দক্ষতা বৃদ্ধি এবং কারিগরি ও দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষার সম্প্রসারণে শিল্পখাত ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সহযোগিতা বৃদ্ধি প্রয়োজন। বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। শুধু শিক্ষায় প্রবেশাধিকারের সাফল্য নয়, এখন প্রয়োজন শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করা। শিক্ষার মান উন্নয়নের জন্য শিক্ষক উন্নয়ন, শক্তিশালী প্রাথমিক শিক্ষা, আধুনিক পাঠ্যক্রম, প্রযুক্তি ব্যবহারের সম্প্রসারণ, কার্যকর ব্যবস্থাপনা এবং শিক্ষায় সমতা—এই ছয়টি ক্ষেত্রকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং সামাজিক অংশগ্রহণের মাধ্যমে যদি এসব পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করা যায়, তবে শিক্ষাই হবে বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়ন ও জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গঠনের সবচেয়ে শক্তিশালী ভিত্তি।  

জুলাই ১৯, ২০২৬ 0
সমন্বিত রেল বিপ্লব এখন সময়ের বড় দাবি
সমন্বিত রেল বিপ্লব এখন সময়ের বড় দাবি

  একটি দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, সুষম আঞ্চলিক উন্নয়ন ও টেকসই আধুনিকায়নের প্রধান চালিকাশক্তি হলো তার অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ অবকাঠামো। বিগত দেড় দশকে বাংলাদেশ সড়ক যোগাযোগ খাতে, বিশেষ করে মেগা সেতু, এক্সপ্রেসওয়ে ও ফোর-লেন মহাসড়ক নির্মাণে অভাবনীয় সাফল্য দেখিয়েছে। পদ্মা সেতু, কর্ণফুলী টানেল কিংবা ঢাকা-কক্সবাজার সংযোগ আমাদের প্রকৌশল সক্ষমতার অনন্য স্মারক। তবে জনসংখ্যা বিস্ফোরণ, দ্রুত নগরায়ণ, তীব্র যানজট, ক্রমবর্ধমান সড়ক দুর্ঘটনা এবং বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের এই যুগে কেবল সড়ককেন্দ্রিক যোগাযোগব্যবস্থা দিয়ে একটি রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত স্থিতিশীলতা রক্ষা করা অসম্ভব। বাংলাদেশের ভৌগোলিক বাস্তবতা, জনঘনত্ব ও অর্থনৈতিক লক্ষ্যমাত্রার নিরিখে বিচার করলে স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে, দেশের পরিবহনব্যবস্থায় যুগান্তকারী গতিশীলতা আনতে হলে সুপরিকল্পিত ও সমন্বিত একটি 'রেল বিপ্লব' এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।   প্রশ্ন হতে পারে, ​কেন সড়ক নয়, রেলই একমাত্র টেকসই বিকল্প? ​বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ বদ্বীপ। এখানে কৃষিজমি ও বনাঞ্চল রক্ষা করা খাদ্য নিরাপত্তার স্বার্থেই অপরিহার্য। এই বাস্তবতায় সড়ক সম্প্রসারণের চেয়ে রেলের উন্নয়ন অনেক বেশি যৌক্তিক ও কার্যকর।   ​ চার বা ছয় লেনের একটি মহাসড়ক নির্মাণে যে বিশাল পরিমাণ ভূমির অধিগ্রহণ করতে হয়, একটি ডাবল লাইনের রেলপথ তার এক-চতুর্থাংশেরও কম জায়গায় তার চেয়ে চার থেকে পাঁচ গুণ বেশি যাত্রী ও পণ্য পরিবহন করতে সক্ষম। ফলে ভূমির অপচয় যেমন রোধ হয়, তেমনি ভূমির সর্বোত্তম ব্যবহারও নিশ্চিত হয়। তা ছাড়া ​রেল বিপ্লবের মাধ্যমে জ্বালানি সাশ্রয় ও পরিবেশ সুরক্ষাও হতে পারে। কারণ, সড়ক পরিবহনের তুলনায় রেল পরিবহন বহুগুণ বেশি জ্বালানি-সাশ্রয়ী। জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচির তথ্যমতে, ট্রেন প্রত্যেক যাত্রী বা প্রতি টন পণ্য পরিবহনে সাশ্রয়ী হারে শক্তি খরচ করে এবং কার্বন নিঃসরণের পরিমাণ সড়কপথের তুলনায় প্রায় ৮০ শতাংশ পর্যন্ত কমায়। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা বাংলাদেশের জন্য পরিবেশবান্ধব এই যোগাযোগ মাধ্যম বেছে নেয়ার কোনো বিকল্প নেই। সেই সাথে রেল ভ্রমণ ও পণ্য পরিবহন সাধারণ মানুষের জন্য সাশ্রয়ী। সড়কের রক্ষণাবেক্ষণ খরচ যেখানে প্রতিবছর জ্যামিতিক হারে বাড়ে, সেখানে রেলপথের স্থায়িত্ব ও দীর্ঘমেয়াদি কার্যকারিতা অনেক বেশি লাভজনক।   ​বাংলাদেশের অর্থনীতির লাইফলাইন বলা হয় ঢাকা-চট্টগ্রাম করিডোরকে। দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের সিংহভাগই এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়।   ​পরিসংখ্যানের আলোকে দেখা যায়, বর্তমানে দেশের মোট কনটেইনার ও পণ্য পরিবহনের মাত্র ১০ থেকে ১২ শতাংশ রেলের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়; বাকিটা চলে যায় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ওপর। এর ফলে মহাসড়কে অন্তহীন যানজট, সময় অপচয় ও লজিস্টিকস খরচ বহুগুণ বেড়ে যায়, যা আন্তর্জাতিক বাজারে আমাদের প্রতিযোগিতার সক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে। ​যদি একটি সমন্বিত রেল নেটওয়ার্কের মাধ্যমে এই পণ্য পরিবহনের হার ৫০ শতাংশে উন্নীত করা যায়, তাহলে দেশের অভ্যন্তরীণ বাণিজ্য ও আমদানি-রপ্তানি খাতে এক যুগান্তকারী পরিবর্তন আসবে। চট্টগ্রাম, মোংলা ও পায়রা বন্দরের সাথে সরাসরি ব্রডগেজ বা ডুয়েলগেজ রেল সংযোগ এবং প্রস্তাবিত বে-টার্মিনাল ও বিভিন্ন অর্থনৈতিক অঞ্চলের সাথে রেলের লিংক লাইন স্থাপন করা গেলে ব্যবসার ক্ষেত্রে অপচয় নাটকীয়ভাবে হ্রাস পাবে।   ​বিগত কয়েক বছরে বাংলাদেশ রেলওয়ে বেশ কিছু মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে এবং করছে, যা দেশের রেল অবকাঠামোর চেহারা বদলে দিতে শুরু করেছে। এই যেমন ​পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্প। ঢাকা থেকে ভাঙ্গা হয়ে যশোর পর্যন্ত বিস্তৃত এই রেলপথ দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১টি জেলাকে রাজধানীর সাথে সরাসরি যুক্ত করেছে। এটি মোংলা বন্দর ও বেনাপোল স্থলবন্দরের পণ্য সরাসরি ঢাকায় আনার পথ সুগম করেছে, যা আঞ্চলিক জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে ১ থেকে ১.৫ শতাংশ অবদান রাখছে। প্রসঙ্গত দোহাজারী-কক্সবাজার রেলপথের কথাও বলা যায়। পর্যটন নগরী কক্সবাজারকে রেল নেটওয়ার্কের আওতায় আনা বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম সেরা কৌশলগত সিদ্ধান্ত। এর ফলে কেবল পর্যটন খাতেরই বিকাশ ঘটেনি, বরং সমুদ্র উপকূলবর্তী অঞ্চলের মৎস্য ও লবণ শিল্প পরিবহনে নতুন দিগন্তের সূচনা হয়েছে।   এখানেই শেষ নয়, ​নগর পরিবহনে এমআরটি উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখছে। বিশেষ করে, ঢাকার অভ্যন্তরে যানজট নিরসনে বৈদ্যুতিক মেট্রোরেল ইতোমধ্যেই তার ম্যাজিক দেখিয়েছে। এটি প্রমাণ করেছে যে, আধুনিক রেলব্যবস্থার মাধ্যমে কীভাবে প্রতিদিন লাখ লাখ মানুষের কর্মঘণ্টা বাঁচানো সম্ভব। আমি মনে করি, ​'রেল বিপ্লব' বাস্তবায়নে ৫ দফা কৌশলগত করণীয় বাস্তবায়ন করলে ​বিদ্যমান অর্জনগুলোকে একটি পূর্ণাঙ্গ রেল বিপ্লবে রূপ দেয়া সম্ভব। রেলকে দেশের ১ নম্বর গণপরিবহনে পরিণত করতে হলে সরকারকে একটি দীর্ঘমেয়াদি ও সুনির্দিষ্ট মাস্টারপ্ল্যান নিয়ে এগোতে হবে।   ​প্রথমত : শতভাগ রেললাইনকে ডাবল ট্র্যাকিং ও ডুয়েল গেজে রূপান্তর করতে হবে। ​বর্তমানে বাংলাদেশ রেলওয়ে মিটারগেজ ও ব্রডগেজের গোলকধাঁধায় আটকে আছে। দেশের সব প্রধান রুটকে, বিশেষ করে ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-সিলেট ও ঢাকা-খুলনা প্রভৃতিকে অনতিবিলম্বে ডুয়েল গেজ ডাবল ট্র্যাকিংয়ের আওতায় আনতে হবে। সিঙ্গেল লাইনের কারণে ক্রসিংয়ে যে সময় অপচয় হয়, তা দূর না করলে রেলের গতি ও শিডিউল বিপর্যয় ঠিক করা সম্ভব নয়।   ​দ্বিতীয়ত : হাই-স্পিড রেল বা বুলেট ট্রেন চালুর উদ্যোগ ​ঢাকা ও চট্টগ্রামের মধ্যে প্রস্তাবিত হাই-স্পিড বা দ্রুতগতির ট্রেনের প্রকল্পটি দ্রুত আলোর মুখ দেখতে হবে। এ দুই বাণিজ্যিক নগরীর দূরত্ব যদি ২ ঘণ্টায় নামিয়ে আনা যায়, তাহলে তা দেশের অর্থনীতিকে রকেটের গতিতে এগিয়ে নেবে। ​ তৃতীয়ত : সমসাময়িক অস্থির বিশ্বে এখন সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো জ্বালানি সংকট। তাই রেলের বৈদ্যুতিকীকরণ অত্যন্ত জরুরি। ​বিশ্বের আধুনিক দেশগুলো এখন জীবাশ্ম জ্বালানি পরিহার করছে। মেট্রোরেলের সফলতার পর আমাদের দূরপাল্লার প্রধান রুটগুলোতেও ওভারহেড ক্যাটেনারি লাইনের মাধ্যমে বৈদ্যুতিক ট্রেন চালুর উদ্যোগ নিতে হবে। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, এটি রেলের পরিচালন ব্যয় অর্ধেকে নামিয়ে আনবে।   চতুর্থত : আঞ্চলিক ও উপ-আঞ্চলিক সংযোগ বৃদ্ধি করতে হবে। বিশেষ করে, ​ট্রান্স-এশিয়ান রেলওয়ে নেটওয়ার্কের সাথে বাংলাদেশের সংযোগ আরও জোরালো করতে হবে। ভারত, নেপাল ও ভুটানের সাথে আঞ্চলিক রেল ট্রানজিট ও কার্গো পরিবহন সুবিধা পুরোপুরি চালু করতে পারলে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম প্রধান লজিস্টিকস হাবে পরিণত হবে।   পঞ্চমত : প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ও ডিজিটালাইজেশন ​রেলের ভৌত কাঠামোর উন্নয়নের পাশাপাশি এর প্রশাসনিক সংস্কার জরুরি। টিকেট কালোবাজারি সম্পূর্ণভাবে নির্মূল করা, স্টেশনগুলোর আধুনিকায়ন, আধুনিক সিগন্যালিং ব্যবস্থার প্রবর্তন এবং যাত্রী সেবার মানোন্নয়নে শতভাগ জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। প্রয়োজনে রেলের বাণিজ্যিক উইংকে দক্ষ পেশাদারদের দিয়ে স্বায়ত্তশাসিত মডেলে পরিচালনা করা যেতে পারে।   এ ছাড়া প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ও ডিজিটালাইজেশন ​রেলের ভৌত কাঠামোর উন্নয়নের পাশাপাশি এর প্রশাসনিক সংস্কার জরুরি। টিকেট কালোবাজারি সম্পূর্ণ নির্মূল করা, স্টেশনগুলোর আধুনিকায়ন, আধুনিক সিগন্যালিং ব্যবস্থার প্রবর্তন এবং যাত্রী সেবার মানোন্নয়নে শতভাগ জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। প্রয়োজনে রেলের বাণিজ্যিক উইংকে দক্ষ পেশাদারদের দিয়ে স্বায়ত্তশাসিত মডেলে পরিচালনা করা যেতে পারে। ​ পরিশেষে বলতে চাই, ​সড়কপথ হয়তো সাময়িকভাবে কোনো অঞ্চলের যোগাযোগকে সহজ করতে পারে, কিন্তু একটি দেশের অর্থনীতির স্থায়ী ও টেকসই মেরুদণ্ড গড়ে তোলে তার উন্নত রেলব্যবস্থা। শিল্প বিপ্লবের পর থেকে যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র কিংবা আধুনিক যুগে চীন, জাপান ও প্রতিবেশী ভারত তাদের অর্থনৈতিক পরাশক্তি হয়ে ওঠার পেছনে রেলওয়েকেই মূল হাতিয়ার করেছে। ​উন্নয়নশীল দেশের কাতার থেকে ২০৪১ সালের মধ্যে একটি উন্নত ও স্মার্ট বাংলাদেশে পৌঁছানোর যে স্বপ্ন আমরা দেখছি, তা পূরণে রেলের এই রূপান্তর কোনো বিলাসিতা নয়, বরং একটি অপরিহার্য ও কৌশলগত বাধ্যবাধকতা। তাই সড়ক-কেন্দ্রিক মানসিকতা থেকে বেরিয়ে এসে আগামী জাতীয় বাজেটে রেল খাতকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে বাস্তবমুখী একটি 'রেল বিপ্লব' ঘটানো গেলেই দেশের যোগাযোগব্যবস্থার টেকসই মুক্তি মিলবে।  

জুলাই ১৯, ২০২৬ 0
Popular post
শেষের অনুশোচনা

মোবারক হোসেন ছিলেন শহরের প্রান্তে ছোট একটি ব্যবসার মালিক। সারা জীবন হিসাবি, কিপ্টে ও আত্মকেন্দ্রিক মনোভাবের কারণে তাঁর সুনাম কখনো গড়ে ওঠেনি। ছেলেবেলায় তাঁর পরিবার অভাবী ছিল, কিন্তু মা-বাবা সব সময় চেষ্টা করতেন সন্তানদের প্রয়োজন পূরণ করতে। অথচ সেই মোবারক সামান্য টাকা জমাতে গিয়ে মা-বাবার ওষুধ কেনা থেকেও পিছপা হয়েছেন। আত্মীয়স্বজনের বিপদে কখনো একটি পয়সা দেননি, এমনকি বন্ধুবান্ধবের কাছ থেকে দূরে থেকেছেন কেউ ধার চেয়ে বসে এই ভয়ে। সময়ের সাথে সাথে মোবারকের ব্যবসা জমে উঠল। দোকান থেকে উপার্জিত টাকা তিনি ব্যাংকে জমাতেন, ফিক্সড ডিপোজিট করতেন, আর স্বর্ণ কিনে লুকিয়ে রাখতেন পুরোনো ট্রাংকে। কেউ জানত না তাঁর আসল সম্পদের পরিমাণ। অথচ নিজের বাড়িটাও পুরোনো, ফাটল ধরা দেয়ালে ভরা। সেখানেই থাকতেন একাকী, রান্নার কাজ করতেন নিজেই, যেন একটা ডিমও অপচয় না হয়। বয়স যখন ষাট পেরিয়েছে, তখন হঠাৎ একদিন সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি একটি বাগানবাড়ি বানাবেন শহরের বাইরে। শেষ বয়সে একটু খোলামেলা পরিবেশে থাকা যাবে, এই যুক্তি দেখিয়ে অনেক টাকা খরচ করলেন। বাড়িটি বানাতে গিয়ে বহু শ্রমিক, ইঞ্জিনিয়ার নিয়োগ দিলেন। মোবারক বাড়ির সব খরচ নিজ হাতে হিসাব রাখতেন। ঘরগুলো আধুনিক, দেয়ালে কাঠের কারুকাজ, বারান্দায় দোলনা — সবই পরিপাটি, নিখুঁত। কিন্তু তবুও কেউ ছিল না পাশে। তিন বছর পর ওই বাড়িতে গিয়ে থাকতে শুরু করলেন মোবারক। বড় গেট, ফুলে ভরা বাগান, হাঁটার পথ, বিশ্রামের ছায়া — সবই ছিল, কিন্তু সঙ্গী বলতে কেউ ছিল না। একদিন হঠাৎ অসুস্থ বোধ করলেন। গা কাঁপুনি, জ্বর, দুর্বলতা। স্থানীয় ডাক্তার প্রথমে পাত্তা দিলেন না। কিন্তু দিন পেরোতে না পেরোতেই বোঝা গেল সমস্যাটা গুরুতর। শহরে গিয়ে রক্ত পরীক্ষা করালেন। ধরা পড়ল প্যানক্রিয়াস ক্যান্সার, তৃতীয় স্টেজ। হাসপাতালে শুয়ে শুয়ে মোবারক প্রথমবারের মতো ভাবলেন, এই বিশাল বাড়ি, জমানো টাকা, ব্যাংক ব্যালেন্স — সবই কেমন অর্থহীন লাগছে! জীবন এতটাই ক্ষণস্থায়ী, অথচ তিনি সারা জীবন কাটালেন হিসেব কষে। বাবার জীবনের শেষ সময়ে একটা ইনহেলার কেনেননি, মায়ের চোখে ছানি অপারেশনের খরচ দিতে অস্বীকার করেছিলেন। ভাতিজার পড়াশোনার খরচ না দেয়ায় কলেজে ভর্তি হতে পারেনি ছেলেটি। আজ সেই মোবারকের পাশে কেউ নেই। এক সন্ধ্যায় হাসপাতালের জানালায় তাকিয়ে থাকতে থাকতে চোখ ভিজে উঠল তাঁর। ছোট একটি মেয়ে পাশের রোগীকে তার বাবাকে ফল খাওয়াচ্ছে। দৃশ্যটি তাঁকে মনে করিয়ে দিল, তাঁর একটাই দোষ, ‘ভয় আর অবিশ্বাসে ভরা এক হৃদয়’। তিনি ভালোবাসতে পারেননি, কাউকে বিশ্বাস করতে পারেননি, এমনকি কাছের লোকজনকেও সাহায্য করতে পারেননি। টাকা ছিল, হৃদয় ছিল না। মোবারক সেই রাতে একজন নার্সকে ডেকে বললেন, “একটা কাজ করে দেবে মা?” নার্স বলল, “বলুন কাকা।” তিনি বললেন, “এই চিঠিটা আমার এলাকার মসজিদের ইমাম সাহেবকে পৌঁছে দেবে। আর যদি আমি বেঁচে না থাকি, আমার ঘরের আলমারির ভেতর থেকে সব কাগজ ও টাকা আমার গ্রামের দরিদ্র লোকজনের জন্য ওয়াকফ করে দিয়ো।” চিঠিতে তিনি তাঁর কিপ্টামির স্বীকারোক্তি লিখেছিলেন। ক্ষমা চেয়েছিলেন মা-বাবার কাছেও। আর সব সম্পত্তি দিয়ে যেতে চেয়েছিলেন এতিমখানা, হাসপাতাল এবং গ্রামের দরিদ্রদের জন্য। দুদিন পর মোবারক হোসেন মারা গেলেন। কেউ খুব একটা কাঁদেনি, কিন্তু তাঁর চিঠি যখন প্রকাশিত হলো, তখন অনেকের চোখে পানি এসেছিল। এক কাপুরুষ, কিপ্টে মানুষ শেষ জীবনে বুঝেছিলেন, মানুষের জীবনের আসল সম্পদ টাকা নয়, বরং সম্পর্ক, সহানুভূতি আর উদারতা। তাঁর তৈরি বাগানবাড়িটি এখন এক বৃদ্ধাশ্রম, যেখানে অনাথ ও অসহায় বৃদ্ধরা বসবাস করেন। তাঁর কিপ্টে জীবনের শেষ অধ্যায়ে পাওয়া অনুশোচনাই হয়তো মানুষের জন্য বড় একটি প্রাপ্তি হয়ে রয়ে গেল — একটা নিঃশব্দ শিক্ষা।

আগস্টেই রূপপুর থেকে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ

  চলতি বছরের আগস্টের শেষ দিকে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে বলে জানিয়েছেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম। তিনি আশা প্রকাশ করেন, আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে কেন্দ্রটির প্রথম ইউনিট থেকে ১,০০০ মেগাওয়াটেরও বেশি বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা সম্ভব হবে। অন্যদিকে নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেডের (এনপিসিবিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. মো. জাহেদুল হাসান জানিয়েছেন, কেন্দ্রটির প্রথম ইউনিট ২০২৭ সালের শুরুতে এবং দ্বিতীয় ইউনিট ২০২৮ সালের শুরুতে পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্যিক উৎপাদনে যাবে। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের নিরাপত্তা, কমিশনিং, পরিচালনাগত প্রস্তুতি এবং সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত নানা প্রতিবেদনকে কেন্দ্র করে জনমনে বিভিন্ন প্রশ্ন ও কৌতূহল তৈরি হয়েছে। এসব বিষয়ে ড. জাহেদুল হাসানের সঙ্গে কথা হলে তিনি কেন্দ্রটির নিরাপত্তা, পরিচালনা, আন্তর্জাতিক তদারকি কাঠামোসহ গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সম্পর্কে ব্যাখ্যা দেন।  ড. জাহেদুল হাসান বলেন, একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র কোনো একক প্রতিষ্ঠানের সিদ্ধান্তে পরিচালিত হয় না। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে একাধিক স্বাধীন কারিগরি, নিয়ন্ত্রক ও নিরাপত্তা সংস্থার সমন্বিত তদারকির মাধ্যমে এর প্রতিটি ধাপ পরিচালিত হয়।  তিনি জানান, বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন (বিএইসি) প্রকল্পের মালিক হিসেবে নির্মাণ চুক্তি বাস্তবায়ন এবং স্থাপনা গ্রহণের দায়িত্ব পালন করছে। নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেড আইন অনুযায়ী কেন্দ্রটির অপারেটিং অর্গানাইজেশন। কমিশনিং, নিরাপদ পরিচালনা, রক্ষণাবেক্ষণ এবং ভবিষ্যতে ডিকমিশনিং পর্যন্ত সব অপারেশনাল দায়িত্ব এনপিসিবিএলের ওপর ন্যস্ত। অন্যদিকে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ একটি স্বাধীন নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে আন্তর্জাতিক ও জাতীয় নিরাপত্তা মানদণ্ড অনুযায়ী প্রকল্পের প্রতিটি ধাপ মূল্যায়ন করে প্রয়োজনীয় লাইসেন্স প্রদান করছে। কমিশনিং কার্যক্রমের স্বাধীন কারিগরি মূল্যায়নের জন্য বিএইবিএ আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ভিও সেফটিকে এক্সপার্ট অর্গানাইজেশন হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে। এ ছাড়া রাশিয়ার সিআরইএ কমিশনিং, অপারেশনাল প্রস্তুতি, অপারেটর প্রশিক্ষণ এবং জ্ঞান স্থানান্তরে এনপিসিবিএলকে সহায়তা করছে। রাশিয়ার স্বাধীন নিয়ন্ত্রক সংস্থা Rostechnadzor গুরুত্বপূর্ণ কমিশনিং পর্যায়ে বিএইআরএর সঙ্গে প্রযুক্তিগত অভিজ্ঞতা বিনিময় করছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা বিভিন্ন Peer Review Mission ও Technical Review পরিচালনার মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রস্তুতি আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মানদণ্ড অনুযায়ী মূল্যায়ন করছে এবং প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিচ্ছে। ড. জাহেদুল বলেন, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত একাধিক জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের স্বাধীন কারিগরি মূল্যায়ন, নিয়ন্ত্রক অনুমোদন এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মানদণ্ড অনুসরণ করেই গ্রহণ করা হয়। এনপিসিবিএল এখনো দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় সক্ষমতা অর্জন করতে পারেনি—এমন সমালোচনার বিষয়ে ড. জাহেদুল বলেন, পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনার মূল ভিত্তি হলো দক্ষ জনবল ও শক্তিশালী নিরাপত্তা সংস্কৃতি। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, গত এক দশকে সরকার এ খাতে ব্যাপক বিনিয়োগ করেছে। শত শত প্রকৌশলী, অপারেটর, রিঅ্যাক্টর বিশেষজ্ঞ, রসায়নবিদ, বিকিরণ সুরক্ষা কর্মকর্তা, রক্ষণাবেক্ষণ প্রকৌশলী রাশিয়াসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছেন। তারা Full Scope Simulator, On-the-Job Training এবং Classroom Training-সহ আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ সফলভাবে সম্পন্ন করেছেন। তিনি আরও বলেন, প্রতিটি অপারেটরকে বিএইআরএর কঠোর লাইসেন্সিং ও মূল্যায়ন প্রক্রিয়া অতিক্রম করতে হয়। একই সময়ে সিআরইএর বিশেষজ্ঞরা কমিশনিং পর্যায়ে এনপিসিবিএলের কর্মীদের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করে আন্তর্জাতিক সর্বোত্তম চর্চা অনুযায়ী জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা স্থানান্তর নিশ্চিত করছেন। ফলেএনপিসিবিএল বর্তমানে প্রযুক্তিগত, অপারেশনাল ও প্রাতিষ্ঠানিক—সব দিক থেকেই দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনার জন্য একটি সক্ষম Operating Organization হিসেবে গড়ে উঠেছে।  স্পেন্ট ফুয়েল (ব্যবহৃত পারমাণবিক জ্বালানি) ব্যবস্থাপনা এবং রাশিয়ার সঙ্গে এ বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত চুক্তি হয়নি—এমন আলোচনার প্রসঙ্গে ড. জাহেদুল বলেন, আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শিল্পের প্রচলিত পদ্ধতি সম্পর্কে সীমিত ধারণার কারণেই এ ধরনের বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছে। তিনি জানান, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক সংস্থা রোসাটমের মধ্যে চুক্তি ইতোমধ্যে স্বাক্ষরিত হয়েছে। এর পাশাপাশি বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন ও টিভিইলের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি পারমাণবিক জ্বালানি সরবরাহের ফ্রেমওয়ার্ক এগ্রিমেন্ট বিদ্যমান রয়েছে। তিনি আরও বলেন, আইএইএর নিরাপত্তা নির্দেশিকা অনুযায়ী ব্যবহৃত পারমাণবিক জ্বালানি রিঅ্যাক্টর থেকে অপসারণের পর তাৎক্ষণিকভাবে অন্য দেশে পাঠানো হয় না। প্রথমে কেন্দ্রের নকশার অংশ হিসেবে নির্মিত স্পেন্ট ফুয়েল পোলে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত নিরাপদে সংরক্ষণ ও শীতলীকরণ করা হয়, যা বিশ্বের সব আধুনিক পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রেই অনুসরণ করা হয়।   পরবর্তীতে বিদ্যমান আন্তঃরাষ্ট্রীয় চুক্তি, বাণিজ্যিক ব্যবস্থা এবং সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষের অনুমোদনের ভিত্তিতে পরবর্তী ব্যবস্থাপনা সম্পন্ন হয়। উল্লেখ্য, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পে রাশিয়ার ভিবিইআর-১২০০ মডেলের তৃতীয় প্রজন্মের দুটি রিয়্যাক্টর স্থাপন করা হচ্ছে। প্রতিটি ইউনিটের উৎপাদন ক্ষমতা ১,২০০ মেগাওয়াট। দুটি ইউনিট চালু হলে কেন্দ্রটির মোট উৎপাদন ক্ষমতা হবে ২,৪০০ মেগাওয়াট। সংশ্লিষ্টদের মতে, রিয়্যাক্টরগুলো আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মানদণ্ড পূরণে সক্ষম। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক সংস্থা রোসাটম।  

কামিনীর গন্ধে তুমি

আকাশের নীলে কীবা কবিতার মিলে না গোলাপের সুরভিতে ডানা মেলা চিলে না। গোধূলির রং এসে সন্ধ্যায় যায় মেশে কোথাও তো নেই তুমি গল্পের শুরু-শেষে।   চাদরের আদরে না না ভোরের রবিতে না শিমুল কোলে থাকা কোকিলের ছবিতে। রিমঝিম টুপটাপ বরষার ছন্দে তোমাকেই খুঁজে পাই কামিনীর গন্ধে।  

তোমাকেই প্রয়োজন

অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়েছে পৃথিবীর ভাগ্যাকাশ শুরু হয়েছে একের পর এক দুর্যোগ, দুর্ভিক্ষ; মহামারি চলছে পাল্লা দিয়ে। বর্ণাঢ্য আয়োজনে পশুত্ব গিলছে মনুষ্যত্ব অ-অনুমেয়— কতটা লম্বা মৃত্যুর মিছিল?   অশান্ত, ভীষণ প্রকৃতি এখন। ধৈর্য, সহনশীলতার হয়েছে অকালমৃত্যু দানবীয় শক্তিতে জ্বলে উঠেছে আগ্নেয়গিরি। বিষাক্ত বিষ উদগিরিত হচ্ছে গলগলিয়ে লাভার তাপে অঙ্গার হলো পাখির নীড়।   এমন দুর্যোগকালীন সময়ে তোমাকে ভীষণ প্রয়োজন, কবিতা। কেবল তুমিই জানো স্বার্থের বেড়া ভেঙে প্রেমের কুটির রচনার মন্ত্র। তুমিই পারো ধ্বংসস্তূপকে রূপ দিতে শৈল্পিক।   এমন ধবধবে ভূতুড়ে দিনে তোমাকে ভীষণ প্রয়োজন, কবিতা। তোমার জাদুকরি শব্দরাই পারবে মোহের ঝকমকি সরিয়ে জাগ্রত পতাকা ওড়াতে। তোমার আগুনঝরা কথা স্ফুলিঙ্গের মতো ঘুরবে কালের আকাশে।  

বাবারা এমনই

পিঠে পেট ঠেকেছে, তবু আনন্দ-বেসাতির কমতি নেই রোদে পুড়ে ঝড়-বৃষ্টিতে ভিজে  একটা মানুষ জীবন-যুদ্ধে লড়ে যায় অহর্নিশি প্রসন্নতার আলপথে খোঁজে কষ্টের সুখ চোখের দীপ্র জ্যোতিতে প্রিয় সন্তানের মুখ কষ্টের টানাপোড়েনেও বাবা যেন সাঁকো বাঁধা সেতু- জীবন-নদীর দুই তীর অপত্য স্নেহে আগলে বেঁধে রাখে। নদীর স্রোত কোথাও খরস্রোতা, কোথাও ধীর লয় রোদে পুড়ে, ঝড়-বৃষ্টিতে ভিজে পরিশ্রমী বাবারা এমনই বহমান নদী।

Top week

শেষের অনুশোচনা
সাহিত্য

শেষের অনুশোচনা

জুলাই ২০, ২০২৬ 0