যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চশিক্ষার জন্য যাওয়ার আগে প্রয়োজনীয় টিকা গ্রহণ কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে সুস্থ পরিবেশ বজায় রাখার জন্য এটি কঠোর স্বাস্থ্যবিধি। ভিসা ও অ্যাডমিশনের মতো স্বাস্থ্য সুরক্ষাকেও সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন, কারণ সঠিক টিকাদান কর্মসূচির প্রমাণ ছাড়া ভর্তি প্রক্রিয়া ও কোর্স রেজিস্ট্রেশনে জটিলতা তৈরি হতে পারে। এই টিকাগুলোর মূল লক্ষ্য হলো ক্যাম্পাসে ‘হার্ড ইমিউনিটি’ গড়ে তোলা এবং সংক্রামক রোগের ঝুঁকি কমানো। যুক্তরাষ্ট্রের বেশিরভাগ বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য কিছু নির্দিষ্ট টিকা নেওয়া বাধ্যতামূলক। এর মধ্যে হাম, মাম্পস ও রুবেলার জন্য ‘এমএমআর’ টিকা, টিটেনাস ও ডিফথেরিয়ার জন্য ‘টিড্যাপ’ বুস্টার এবং চিকেনপক্স ও মেনিনগোকক্কাল টিকা অন্যতম। বিশেষ করে ঘনবসতিপূর্ণ ডরমিটরিতে বসবাসের ক্ষেত্রে মেনিনগোকক্কাল টিকা অপরিহার্য। এছাড়া শীতকালে ফ্লুর প্রকোপ এড়াতে অনেক বিশ্ববিদ্যালয় ফ্লু ভ্যাকসিন নেওয়ার পরামর্শ দেয়। টিকা নেওয়া শেষ হলেই দায়িত্ব শেষ হয় না; এর নির্ভরযোগ্য ডকুমেন্টেশন সংরক্ষণ করা অত্যন্ত জরুরি। যেসব শিক্ষার্থীর আগের টিকাদান কার্ড বা স্বাস্থ্য রেকর্ড হারিয়ে গেছে, তাদের নতুন করে টিকা নেওয়া বা অ্যান্টিবডি টেস্টের পরামর্শ দেওয়া হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের হেলথ সেন্টার বা হোস্টেল কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দেওয়ার জন্য টিকার নাম, ডোজের সংখ্যা ও তারিখ উল্লেখ করে ডিজিটাল কপি বা পিডিএফ ফাইল তৈরি করে রাখা বুদ্ধিমানের কাজ। ভিসার প্রস্তুতির মতোই স্বাস্থ্য সুরক্ষার নথিপত্র আগেভাগে গুছিয়ে রাখলে পরবর্তী সময়ে অনাকাঙ্ক্ষিত ভোগান্তি থেকে বাঁচা সম্ভব।
বন্যা-পরবর্তী সম্ভাব্য রোগের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় পুরোপুরি প্রস্তুত রয়েছে বলে জানিয়েছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। শুক্রবার (১৭ জুলাই) চট্টগ্রামের লোহাগাড়ায় ঢলু খালের ভাঙন এলাকা পরিদর্শন ও ত্রাণ বিতরণ শেষে তিনি এ কথা জানান। তাৎক্ষণিক ত্রাণ সহায়তার পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সম্পূর্ণ পুনর্বাসন না হওয়া পর্যন্ত সরকারের এই সহায়তা অব্যাহত থাকবে বলেও তিনি নিশ্চিত করেন। অর্থমন্ত্রী জানান, দুর্গত এলাকায় রোগ প্রতিরোধে পর্যাপ্ত ওষুধ, স্যালাইন ও চিকিৎসাসামগ্রী মজুত রাখা হয়েছে। এবারের বন্যায় চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত বিস্তীর্ণ এলাকার বসতবাড়ি, সড়ক যোগাযোগ ও ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। চলমান এই সংকট কাটাতে ইতোমধ্যে সরকারের পক্ষ থেকে এক লাখ ৫৫ হাজার পরিবারকে চালসহ বিভিন্ন খাদ্য সহায়তা প্রদান করা হয়েছে।
দেশে হাম ও এর উপসর্গ নিয়ে এ পর্যন্ত ৭৮০ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় উপসর্গ নিয়ে আরও একজনের প্রাণহানি এবং নতুন করে ১৪০ জনের রোগটি শনাক্ত হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত দেশে ১৪ হাজার ২৪৪ জন নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত হয়েছেন। অধিদপ্তর জানায়, মৃতদের মধ্যে ৯৫ জন নিশ্চিতভাবে হামে এবং বাকি ৬৮৫ জন উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে। এছাড়া আলোচিত সময়ে এক লাখেরও বেশি শিশুর শরীরে হামের উপসর্গ দেখা দিলেও, হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়া রোগীদের বড় অংশই ইতোমধ্যে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন।
স্মার্টওয়াচ দিয়ে হৃদস্পন্দন, রক্তে অক্সিজেনের মাত্রা বা ঘুমের হিসাব রাখার প্রবণতা দিন দিন বাড়ছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব যন্ত্র স্বাস্থ্যের প্রাথমিক ধারণা দিলেও তা কোনোভাবেই নির্ভরযোগ্য ডাক্তারি পরীক্ষার বিকল্প নয়। বিশেষ করে দেশের বাজারে বিক্রি হওয়া স্বল্পমূল্যের স্মার্টওয়াচের তথ্যের ওপর নির্ভর না করে যেকোনো শারীরিক সমস্যায় সরাসরি চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। অ্যাপল, স্যামসাং বা গারমিনের মতো স্বনামধন্য ব্র্যান্ডের স্মার্টওয়াচগুলো বিশ্রামের সময় হৃদস্পন্দন বা রক্তে অক্সিজেনের (SpO₂) কাছাকাছি সঠিক মাত্রা জানাতে পারে। তবে দ্রুত হাঁটা, হাতের অতিরিক্ত নড়াচড়া, ত্বকের রং কিংবা ঘড়ি ঢিলাভাবে পরার কারণে এই রিডিংয়ে ত্রুটি দেখা দিতে পারে। এছাড়া ইসিজি, ঘুমের ধরন, স্টেপ কাউন্ট বা ক্যালরি খরচের মতো সূচকগুলো সেন্সরের তথ্যের ওপর ভিত্তি করে অ্যালগরিদমের মাধ্যমে অনুমান করা হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, স্মার্টওয়াচের ক্যালরি খরচের হিসাবে ২০ থেকে ৯০ শতাংশ পর্যন্ত গরমিল হতে পারে। এগুলো হার্ট অ্যাটাক বা স্লিপ অ্যাপনিয়ার মতো জটিল রোগ নির্ণয়েও সক্ষম নয়। সবচেয়ে বেশি উদ্বেগের বিষয় হলো, বাংলাদেশের বাজারে ২ থেকে ৫ হাজার টাকায় যেসব চীনা বা নকল স্মার্টওয়াচ পাওয়া যায়, সেগুলোর স্বাস্থ্যগত ফিচারের কোনো ক্লিনিক্যাল ভিত্তি নেই। এগুলো রক্তচাপ বা রক্তে শর্করার মতো ভুয়া ফিচার দিয়ে ক্রেতাদের বিভ্রান্ত করছে। তাই স্মার্টওয়াচকে কেবল ফিটনেসের প্রাথমিক সহায়ক হিসেবে ব্যবহার করে সুনির্দিষ্ট চিকিৎসার জন্য প্রচলিত মেডিকেল যন্ত্রপাতির ওপরই ভরসা রাখা উচিত।
ধূমপান, বায়ুদূষণ ও শারীরিক নিষ্ক্রিয়তার মতো স্বাস্থ্যঝুঁকিগুলো নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী ৪৫ শতাংশ ডিমেনশিয়া বা স্মৃতিভ্রংশ রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব। বুধবার (১৮ জুলাই) এ সংক্রান্ত একটি হালনাগাদ নির্দেশিকা ও প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)। সংস্থাটি জানিয়েছে, বর্তমানে বিশ্বজুড়ে ৫ কোটি ৭০ লাখের বেশি মানুষ এই রোগে আক্রান্ত এবং প্রতি বছর নতুন করে আরও এক কোটি মানুষ এতে আক্রান্ত হচ্ছেন। বিশ্বজুড়ে মৃত্যুর সপ্তম প্রধান কারণ হলো ডিমেনশিয়া। ৬৫ বছরের বেশি বয়সীদের মধ্যে এটি বেশি দেখা গেলেও ডব্লিউএইচও প্রধান তেদরোস আধানোম গেব্রেয়িসুস জানিয়েছেন, এটি বার্ধক্যের কোনো অনিবার্য অংশ নয়; বরং সচেতনতার মাধ্যমে এর ঝুঁকি এড়ানো সম্ভব। ডিমেনশিয়ার কারণে মানুষের স্মৃতিশক্তি, চিন্তাভাবনা ও দৈনন্দিন কাজ করার ক্ষমতা নষ্ট হয়ে যায়। এর সবচেয়ে সাধারণ রূপ হলো আলঝেইমার্স, যা মোট আক্রান্তের ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ। উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, তামাক ও অ্যালকোহল সেবনের মতো অসংক্রামক ঝুঁকিগুলো এড়িয়ে চললে এই মারাত্মক ব্যাধি থেকে নিজেকে ও পরিবারকে সুরক্ষিত রাখা যায় বলে নতুন নির্দেশিকায় জোর দেওয়া হয়েছে।
দেশের স্বাস্থ্য খাতে আমূল পরিবর্তন আনতে সরকার ‘ই-হেলথ কার্ড’ ও ডিজিটাল প্রেসক্রিপশন চালুর চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিচ্ছে। বৃহস্পতিবার ঢাকায় বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন (বিএমএ) আয়োজিত এক সেমিনারে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী এম এ মুহিত এই তথ্য জানান। তিনি জানান, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও ডিজিটাল রোডম্যাপ ব্যবহারের মাধ্যমে প্রাথমিক চিকিৎসাসেবা আরও শক্তিশালী করাই এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য। ই-হেলথ কার্ড হলো নাগরিকদের একটি ডিজিটাল স্বাস্থ্য পরিচয়পত্র। হাসপাতালে গেলে চিকিৎসকরা এই কার্ডের মাধ্যমে রোগীর পূর্বের সব রোগের ইতিহাস, পরীক্ষার রিপোর্ট ও ওষুধের বিবরণ মুহূর্তেই দেখতে পারবেন। প্রতিমন্ত্রী বলেন, দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞদের মতামতের ভিত্তিতে গত দুই বছর ধরে এই ডিজিটাল রূপরেখা তৈরি করা হয়েছে। অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিটের মহাপরিচালক মোহাম্মদ এনামুল হক এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ফোয়ারা তাসমীমসহ অন্যান্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
দেশের স্বাস্থ্যসেবায় চিকিৎসা অক্সিজেনের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ ও টেকসই ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে ‘বাংলাদেশ ন্যাশনাল মেডিকেল অক্সিজেন রোডম্যাপ (২০২৬–২০৩০)’ প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এই কর্মপরিকল্পনা তৈরির লক্ষ্যে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিতকে সভাপতি করে ২৭ সদস্যের একটি টেকনিক্যাল কমিটি পুনর্গঠন করা হয়েছে। গত মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য সেবা বিভাগ থেকে এ সংক্রান্ত একটি প্রজ্ঞাপন জারির মাধ্যমে বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়। কমিটিতে সদস্য সচিব হিসেবে রয়েছেন স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব শাহ ইমাম আলী রেজা। এতে স্বাস্থ্য ও ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর, বুয়েট এবং আইসিডিডিআর,বি-এর বিশেষজ্ঞদের পাশাপাশি বিশ্বব্যাংক, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ইউনিসেফসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিরা যুক্ত আছেন। এই কমিটির প্রধান কাজ হলো চিকিৎসা অক্সিজেনের মান নিয়ন্ত্রণ এবং একটি কার্যকর জাতীয় গাইডলাইন তৈরি করা। এর মাধ্যমে দেশের হাসপাতালগুলোতে অক্সিজেনের সহজলভ্যতা নিশ্চিতের পাশাপাশি যেকোনো জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় সক্ষমতা বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
মোবারক হোসেন ছিলেন শহরের প্রান্তে ছোট একটি ব্যবসার মালিক। সারা জীবন হিসাবি, কিপ্টে ও আত্মকেন্দ্রিক মনোভাবের কারণে তাঁর সুনাম কখনো গড়ে ওঠেনি। ছেলেবেলায় তাঁর পরিবার অভাবী ছিল, কিন্তু মা-বাবা সব সময় চেষ্টা করতেন সন্তানদের প্রয়োজন পূরণ করতে। অথচ সেই মোবারক সামান্য টাকা জমাতে গিয়ে মা-বাবার ওষুধ কেনা থেকেও পিছপা হয়েছেন। আত্মীয়স্বজনের বিপদে কখনো একটি পয়সা দেননি, এমনকি বন্ধুবান্ধবের কাছ থেকে দূরে থেকেছেন কেউ ধার চেয়ে বসে এই ভয়ে। সময়ের সাথে সাথে মোবারকের ব্যবসা জমে উঠল। দোকান থেকে উপার্জিত টাকা তিনি ব্যাংকে জমাতেন, ফিক্সড ডিপোজিট করতেন, আর স্বর্ণ কিনে লুকিয়ে রাখতেন পুরোনো ট্রাংকে। কেউ জানত না তাঁর আসল সম্পদের পরিমাণ। অথচ নিজের বাড়িটাও পুরোনো, ফাটল ধরা দেয়ালে ভরা। সেখানেই থাকতেন একাকী, রান্নার কাজ করতেন নিজেই, যেন একটা ডিমও অপচয় না হয়। বয়স যখন ষাট পেরিয়েছে, তখন হঠাৎ একদিন সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি একটি বাগানবাড়ি বানাবেন শহরের বাইরে। শেষ বয়সে একটু খোলামেলা পরিবেশে থাকা যাবে, এই যুক্তি দেখিয়ে অনেক টাকা খরচ করলেন। বাড়িটি বানাতে গিয়ে বহু শ্রমিক, ইঞ্জিনিয়ার নিয়োগ দিলেন। মোবারক বাড়ির সব খরচ নিজ হাতে হিসাব রাখতেন। ঘরগুলো আধুনিক, দেয়ালে কাঠের কারুকাজ, বারান্দায় দোলনা — সবই পরিপাটি, নিখুঁত। কিন্তু তবুও কেউ ছিল না পাশে। তিন বছর পর ওই বাড়িতে গিয়ে থাকতে শুরু করলেন মোবারক। বড় গেট, ফুলে ভরা বাগান, হাঁটার পথ, বিশ্রামের ছায়া — সবই ছিল, কিন্তু সঙ্গী বলতে কেউ ছিল না। একদিন হঠাৎ অসুস্থ বোধ করলেন। গা কাঁপুনি, জ্বর, দুর্বলতা। স্থানীয় ডাক্তার প্রথমে পাত্তা দিলেন না। কিন্তু দিন পেরোতে না পেরোতেই বোঝা গেল সমস্যাটা গুরুতর। শহরে গিয়ে রক্ত পরীক্ষা করালেন। ধরা পড়ল প্যানক্রিয়াস ক্যান্সার, তৃতীয় স্টেজ। হাসপাতালে শুয়ে শুয়ে মোবারক প্রথমবারের মতো ভাবলেন, এই বিশাল বাড়ি, জমানো টাকা, ব্যাংক ব্যালেন্স — সবই কেমন অর্থহীন লাগছে! জীবন এতটাই ক্ষণস্থায়ী, অথচ তিনি সারা জীবন কাটালেন হিসেব কষে। বাবার জীবনের শেষ সময়ে একটা ইনহেলার কেনেননি, মায়ের চোখে ছানি অপারেশনের খরচ দিতে অস্বীকার করেছিলেন। ভাতিজার পড়াশোনার খরচ না দেয়ায় কলেজে ভর্তি হতে পারেনি ছেলেটি। আজ সেই মোবারকের পাশে কেউ নেই। এক সন্ধ্যায় হাসপাতালের জানালায় তাকিয়ে থাকতে থাকতে চোখ ভিজে উঠল তাঁর। ছোট একটি মেয়ে পাশের রোগীকে তার বাবাকে ফল খাওয়াচ্ছে। দৃশ্যটি তাঁকে মনে করিয়ে দিল, তাঁর একটাই দোষ, ‘ভয় আর অবিশ্বাসে ভরা এক হৃদয়’। তিনি ভালোবাসতে পারেননি, কাউকে বিশ্বাস করতে পারেননি, এমনকি কাছের লোকজনকেও সাহায্য করতে পারেননি। টাকা ছিল, হৃদয় ছিল না। মোবারক সেই রাতে একজন নার্সকে ডেকে বললেন, “একটা কাজ করে দেবে মা?” নার্স বলল, “বলুন কাকা।” তিনি বললেন, “এই চিঠিটা আমার এলাকার মসজিদের ইমাম সাহেবকে পৌঁছে দেবে। আর যদি আমি বেঁচে না থাকি, আমার ঘরের আলমারির ভেতর থেকে সব কাগজ ও টাকা আমার গ্রামের দরিদ্র লোকজনের জন্য ওয়াকফ করে দিয়ো।” চিঠিতে তিনি তাঁর কিপ্টামির স্বীকারোক্তি লিখেছিলেন। ক্ষমা চেয়েছিলেন মা-বাবার কাছেও। আর সব সম্পত্তি দিয়ে যেতে চেয়েছিলেন এতিমখানা, হাসপাতাল এবং গ্রামের দরিদ্রদের জন্য। দুদিন পর মোবারক হোসেন মারা গেলেন। কেউ খুব একটা কাঁদেনি, কিন্তু তাঁর চিঠি যখন প্রকাশিত হলো, তখন অনেকের চোখে পানি এসেছিল। এক কাপুরুষ, কিপ্টে মানুষ শেষ জীবনে বুঝেছিলেন, মানুষের জীবনের আসল সম্পদ টাকা নয়, বরং সম্পর্ক, সহানুভূতি আর উদারতা। তাঁর তৈরি বাগানবাড়িটি এখন এক বৃদ্ধাশ্রম, যেখানে অনাথ ও অসহায় বৃদ্ধরা বসবাস করেন। তাঁর কিপ্টে জীবনের শেষ অধ্যায়ে পাওয়া অনুশোচনাই হয়তো মানুষের জন্য বড় একটি প্রাপ্তি হয়ে রয়ে গেল — একটা নিঃশব্দ শিক্ষা।
চলতি বছরের আগস্টের শেষ দিকে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে বলে জানিয়েছেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম। তিনি আশা প্রকাশ করেন, আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে কেন্দ্রটির প্রথম ইউনিট থেকে ১,০০০ মেগাওয়াটেরও বেশি বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা সম্ভব হবে। অন্যদিকে নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেডের (এনপিসিবিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. মো. জাহেদুল হাসান জানিয়েছেন, কেন্দ্রটির প্রথম ইউনিট ২০২৭ সালের শুরুতে এবং দ্বিতীয় ইউনিট ২০২৮ সালের শুরুতে পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্যিক উৎপাদনে যাবে। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের নিরাপত্তা, কমিশনিং, পরিচালনাগত প্রস্তুতি এবং সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত নানা প্রতিবেদনকে কেন্দ্র করে জনমনে বিভিন্ন প্রশ্ন ও কৌতূহল তৈরি হয়েছে। এসব বিষয়ে ড. জাহেদুল হাসানের সঙ্গে কথা হলে তিনি কেন্দ্রটির নিরাপত্তা, পরিচালনা, আন্তর্জাতিক তদারকি কাঠামোসহ গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সম্পর্কে ব্যাখ্যা দেন। ড. জাহেদুল হাসান বলেন, একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র কোনো একক প্রতিষ্ঠানের সিদ্ধান্তে পরিচালিত হয় না। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে একাধিক স্বাধীন কারিগরি, নিয়ন্ত্রক ও নিরাপত্তা সংস্থার সমন্বিত তদারকির মাধ্যমে এর প্রতিটি ধাপ পরিচালিত হয়। তিনি জানান, বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন (বিএইসি) প্রকল্পের মালিক হিসেবে নির্মাণ চুক্তি বাস্তবায়ন এবং স্থাপনা গ্রহণের দায়িত্ব পালন করছে। নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেড আইন অনুযায়ী কেন্দ্রটির অপারেটিং অর্গানাইজেশন। কমিশনিং, নিরাপদ পরিচালনা, রক্ষণাবেক্ষণ এবং ভবিষ্যতে ডিকমিশনিং পর্যন্ত সব অপারেশনাল দায়িত্ব এনপিসিবিএলের ওপর ন্যস্ত। অন্যদিকে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ একটি স্বাধীন নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে আন্তর্জাতিক ও জাতীয় নিরাপত্তা মানদণ্ড অনুযায়ী প্রকল্পের প্রতিটি ধাপ মূল্যায়ন করে প্রয়োজনীয় লাইসেন্স প্রদান করছে। কমিশনিং কার্যক্রমের স্বাধীন কারিগরি মূল্যায়নের জন্য বিএইবিএ আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ভিও সেফটিকে এক্সপার্ট অর্গানাইজেশন হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে। এ ছাড়া রাশিয়ার সিআরইএ কমিশনিং, অপারেশনাল প্রস্তুতি, অপারেটর প্রশিক্ষণ এবং জ্ঞান স্থানান্তরে এনপিসিবিএলকে সহায়তা করছে। রাশিয়ার স্বাধীন নিয়ন্ত্রক সংস্থা Rostechnadzor গুরুত্বপূর্ণ কমিশনিং পর্যায়ে বিএইআরএর সঙ্গে প্রযুক্তিগত অভিজ্ঞতা বিনিময় করছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা বিভিন্ন Peer Review Mission ও Technical Review পরিচালনার মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রস্তুতি আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মানদণ্ড অনুযায়ী মূল্যায়ন করছে এবং প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিচ্ছে। ড. জাহেদুল বলেন, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত একাধিক জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের স্বাধীন কারিগরি মূল্যায়ন, নিয়ন্ত্রক অনুমোদন এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মানদণ্ড অনুসরণ করেই গ্রহণ করা হয়। এনপিসিবিএল এখনো দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় সক্ষমতা অর্জন করতে পারেনি—এমন সমালোচনার বিষয়ে ড. জাহেদুল বলেন, পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনার মূল ভিত্তি হলো দক্ষ জনবল ও শক্তিশালী নিরাপত্তা সংস্কৃতি। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, গত এক দশকে সরকার এ খাতে ব্যাপক বিনিয়োগ করেছে। শত শত প্রকৌশলী, অপারেটর, রিঅ্যাক্টর বিশেষজ্ঞ, রসায়নবিদ, বিকিরণ সুরক্ষা কর্মকর্তা, রক্ষণাবেক্ষণ প্রকৌশলী রাশিয়াসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছেন। তারা Full Scope Simulator, On-the-Job Training এবং Classroom Training-সহ আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ সফলভাবে সম্পন্ন করেছেন। তিনি আরও বলেন, প্রতিটি অপারেটরকে বিএইআরএর কঠোর লাইসেন্সিং ও মূল্যায়ন প্রক্রিয়া অতিক্রম করতে হয়। একই সময়ে সিআরইএর বিশেষজ্ঞরা কমিশনিং পর্যায়ে এনপিসিবিএলের কর্মীদের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করে আন্তর্জাতিক সর্বোত্তম চর্চা অনুযায়ী জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা স্থানান্তর নিশ্চিত করছেন। ফলেএনপিসিবিএল বর্তমানে প্রযুক্তিগত, অপারেশনাল ও প্রাতিষ্ঠানিক—সব দিক থেকেই দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনার জন্য একটি সক্ষম Operating Organization হিসেবে গড়ে উঠেছে। স্পেন্ট ফুয়েল (ব্যবহৃত পারমাণবিক জ্বালানি) ব্যবস্থাপনা এবং রাশিয়ার সঙ্গে এ বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত চুক্তি হয়নি—এমন আলোচনার প্রসঙ্গে ড. জাহেদুল বলেন, আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শিল্পের প্রচলিত পদ্ধতি সম্পর্কে সীমিত ধারণার কারণেই এ ধরনের বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছে। তিনি জানান, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক সংস্থা রোসাটমের মধ্যে চুক্তি ইতোমধ্যে স্বাক্ষরিত হয়েছে। এর পাশাপাশি বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন ও টিভিইলের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি পারমাণবিক জ্বালানি সরবরাহের ফ্রেমওয়ার্ক এগ্রিমেন্ট বিদ্যমান রয়েছে। তিনি আরও বলেন, আইএইএর নিরাপত্তা নির্দেশিকা অনুযায়ী ব্যবহৃত পারমাণবিক জ্বালানি রিঅ্যাক্টর থেকে অপসারণের পর তাৎক্ষণিকভাবে অন্য দেশে পাঠানো হয় না। প্রথমে কেন্দ্রের নকশার অংশ হিসেবে নির্মিত স্পেন্ট ফুয়েল পোলে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত নিরাপদে সংরক্ষণ ও শীতলীকরণ করা হয়, যা বিশ্বের সব আধুনিক পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রেই অনুসরণ করা হয়। পরবর্তীতে বিদ্যমান আন্তঃরাষ্ট্রীয় চুক্তি, বাণিজ্যিক ব্যবস্থা এবং সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষের অনুমোদনের ভিত্তিতে পরবর্তী ব্যবস্থাপনা সম্পন্ন হয়। উল্লেখ্য, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পে রাশিয়ার ভিবিইআর-১২০০ মডেলের তৃতীয় প্রজন্মের দুটি রিয়্যাক্টর স্থাপন করা হচ্ছে। প্রতিটি ইউনিটের উৎপাদন ক্ষমতা ১,২০০ মেগাওয়াট। দুটি ইউনিট চালু হলে কেন্দ্রটির মোট উৎপাদন ক্ষমতা হবে ২,৪০০ মেগাওয়াট। সংশ্লিষ্টদের মতে, রিয়্যাক্টরগুলো আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মানদণ্ড পূরণে সক্ষম। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক সংস্থা রোসাটম।
আকাশের নীলে কীবা কবিতার মিলে না গোলাপের সুরভিতে ডানা মেলা চিলে না। গোধূলির রং এসে সন্ধ্যায় যায় মেশে কোথাও তো নেই তুমি গল্পের শুরু-শেষে। চাদরের আদরে না না ভোরের রবিতে না শিমুল কোলে থাকা কোকিলের ছবিতে। রিমঝিম টুপটাপ বরষার ছন্দে তোমাকেই খুঁজে পাই কামিনীর গন্ধে।
অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়েছে পৃথিবীর ভাগ্যাকাশ শুরু হয়েছে একের পর এক দুর্যোগ, দুর্ভিক্ষ; মহামারি চলছে পাল্লা দিয়ে। বর্ণাঢ্য আয়োজনে পশুত্ব গিলছে মনুষ্যত্ব অ-অনুমেয়— কতটা লম্বা মৃত্যুর মিছিল? অশান্ত, ভীষণ প্রকৃতি এখন। ধৈর্য, সহনশীলতার হয়েছে অকালমৃত্যু দানবীয় শক্তিতে জ্বলে উঠেছে আগ্নেয়গিরি। বিষাক্ত বিষ উদগিরিত হচ্ছে গলগলিয়ে লাভার তাপে অঙ্গার হলো পাখির নীড়। এমন দুর্যোগকালীন সময়ে তোমাকে ভীষণ প্রয়োজন, কবিতা। কেবল তুমিই জানো স্বার্থের বেড়া ভেঙে প্রেমের কুটির রচনার মন্ত্র। তুমিই পারো ধ্বংসস্তূপকে রূপ দিতে শৈল্পিক। এমন ধবধবে ভূতুড়ে দিনে তোমাকে ভীষণ প্রয়োজন, কবিতা। তোমার জাদুকরি শব্দরাই পারবে মোহের ঝকমকি সরিয়ে জাগ্রত পতাকা ওড়াতে। তোমার আগুনঝরা কথা স্ফুলিঙ্গের মতো ঘুরবে কালের আকাশে।
পিঠে পেট ঠেকেছে, তবু আনন্দ-বেসাতির কমতি নেই রোদে পুড়ে ঝড়-বৃষ্টিতে ভিজে একটা মানুষ জীবন-যুদ্ধে লড়ে যায় অহর্নিশি প্রসন্নতার আলপথে খোঁজে কষ্টের সুখ চোখের দীপ্র জ্যোতিতে প্রিয় সন্তানের মুখ কষ্টের টানাপোড়েনেও বাবা যেন সাঁকো বাঁধা সেতু- জীবন-নদীর দুই তীর অপত্য স্নেহে আগলে বেঁধে রাখে। নদীর স্রোত কোথাও খরস্রোতা, কোথাও ধীর লয় রোদে পুড়ে, ঝড়-বৃষ্টিতে ভিজে পরিশ্রমী বাবারা এমনই বহমান নদী।