আবৃত্তিতে যা-কিছু ঘটে, তা কখনো একা ঘটে না। একজন আবৃত্তিকার কবিতা বলেন, কিন্তু সেই কবিতার প্রকৃত জীবন শুরু হয় তখনই, যখন কেউ তা মন দিয়ে শোনে। শ্রোতা ও আবৃত্তিকার এ দুজনের মধ্যে একধরনের অদৃশ্য সংযোগ তৈরি হয়।
একজন আবৃত্তিকার যখন কবিতা বলেন, তিনি কেবল শব্দ উচ্চারণ করেন না; তিনি তাঁর অনুভূতি, তার কণ্ঠের উষ্ণতা এবং তার মনের অবস্থা শ্রোতার কাছে পৌঁছে দেন। অন্যদিকে একজন শ্রোতা যখন গভীর মনোযোগ দিয়ে সেই কবিতা শোনেন, তখন সেই অনুভূতি তাঁর ভেতরে প্রবেশ করে। আদান-প্রদানের মধ্যেই আবৃত্তির আসল সৌন্দর্য।
অনেক সময় দেখা যায়, একটি ভালো আবৃত্তির সময় পুরো ঘর নিঃশব্দ হয়ে যায়। কেউ কথা বলে না, কেউ নড়াচড়া করে না। সবাই যেন একধরনের শান্ত মনোযোগে ডুবে থাকে। এই অভিজ্ঞতা অনেকটা ধ্যানের মতো। ধ্যানের সময় যেমন মানুষ নিজের ভেতরে মনোযোগ দেয়, আবৃত্তির সময়ও তেমন একটি মনোযোগ তৈরি হয়। শুধু পার্থক্য হলো, এখানে সেই মনোযোগের কেন্দ্র হয় কবিতার শব্দ।
একজন আবৃত্তিকার যখন সত্যিই অনুভূতি নিয়ে কবিতা বলেন, তখন শ্রোতারাও ধীরে ধীরে সেই অনুভূতির ভেতরে প্রবেশ করেন। এ মুহূর্তে আবৃত্তি একটি সম্মিলিত অভিজ্ঞতা হয়ে ওঠে। যেন সবাই একই তরঙ্গে যুক্ত হয়ে গেছে।
যখন একজন আবৃত্তিকার মঞ্চে ওঠেন, তখন কয়েক মুহূর্তের জন্য একটি নিস্তব্ধতা তৈরি হয়। সবাই অপেক্ষা করে কবিতার প্রথম শব্দ শোনার জন্য। অপেক্ষার মুহূর্তটি খুব গুরুত্বপূর্ণ। একজন সচেতন আবৃত্তিকার এই মুহূর্তটিকে অনুভব করতে পারেন। তিনি যদি একটু চোখ বন্ধ করেন, অথবা কয়েক সেকেন্ড শান্তভাবে দাঁড়িয়ে থাকেন, তাহলে তিনি অনুভব করতে পারবেন পুরো ঘরের মনোযোগ তাঁর দিকে কেন্দ্রীভূত হয়েছে।
মুহূর্তটি ধ্যানের মতো। কারণ, এখানে সবাই একই মুহূর্তে উপস্থিত। কেউ অতীতের কথা ভাবছে না, কেউ ভবিষ্যতের কথা ভাবছে না। সবাই শুধু অপেক্ষা করছে পরবর্তী শব্দের জন্য। নীরবতার মধ্যেই কবিতার জন্ম হয়। যখন প্রথম শব্দটি উচ্চারিত হয়, তখন মনে হয় যেন সেই নীরবতার ভেতর থেকেই শব্দটি উঠে এসেছে এবং কবিতা শেষ হলে আবার সেই শব্দগুলো নীরবতার মধ্যেই ফিরে যায়। এই আসা-যাওয়ার মাঝেই আবৃত্তির সৌন্দর্য।
ভালো একটি আবৃত্তি শেষ হওয়ার পর প্রায়ই দেখা যায়, কিছুক্ষণ কেউ কথা বলে না। শ্রোতারা চুপচাপ থাকে। নীরবতার মুহূর্তটি অত্যন্ত মূল্যবান। কারণ, কবিতার শব্দগুলো তখনো বাতাসে ভাসছে। শ্রোতার মনে সেই শব্দের প্রতিধ্বনি কাজ করছে। এই প্রতিধ্বনি অনেক সময় শব্দের থেকেও বেশি শক্তিশালী হয়। কবিতা তখন আর কেবল কণ্ঠে থাকে না; এটি শ্রোতার অন্তরে স্থান করে নেয়। ধ্যানের ক্ষেত্রেও এমন অভিজ্ঞতা দেখা যায়। একটি গভীর ধ্যানের পরে মানুষ প্রায়ই কিছুক্ষণ নীরব থাকতে চায়, তখন মন খুব শান্ত থাকে। আবৃত্তির পরের নীরবতাও অনেকটা তেমন। নীরবতা আসলে কবিতার একটি অংশ। শব্দ যেখানে শেষ হয়, সেখানে অনুভূতি শুরু হয়।
অনেকেই মনে করেন, আবৃত্তি মানে কেবল সুন্দরভাবে কবিতা বলা। কিন্তু সত্যিকার অর্থে আবৃত্তি তার চেয়ে অনেক বেশি কিছু। আবৃত্তি হতে পারে একটি অন্তরযাত্রা। যখন একজন আবৃত্তিকার একটি কবিতা গভীরভাবে অনুভব করেন, তখন সেই কবিতার ভাবনা তাঁর নিজের ভেতরেও আলোড়ন সৃষ্টি করে। তিনি নিজেই নতুনভাবে অনুভব করতে শুরু করেন। একটি কবিতা কখনো কখনো মানুষের নিজের জীবনের অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিলে যায়। কখনো একটি লাইন আমাদের নিজের স্মৃতিকে স্পর্শ করে। কখনো একটি শব্দ আমাদের ভেতরের কোনো গোপন অনুভূতিকে জাগিয়ে তোলে। এই মুহূর্তে আবৃত্তি শুধু শিল্প নয়; এটি হয়ে ওঠে আত্ম-অনুসন্ধানের একটি পথ। আমরা শব্দের ভেতর দিয়ে নিজের হৃদয়ের সঙ্গে পরিচিত হতে শুরু করি।
শব্দ, শ্বাস ও নীরবতা কীভাবে একে অপরের সঙ্গে যুক্ত। আবৃত্তি এই তিনটি উপাদানকে একত্রে নিয়ে আসে। শব্দ আমাদের মনোযোগকে জাগিয়ে তোলে। শ্বাস আমাদের কণ্ঠকে ছন্দ দেয়। আর নীরবতা আমাদের অনুভূতিকে গভীর করে। এই তিনটি একত্রে একটি বিশেষ অভিজ্ঞতা তৈরি করতে পারে, যা অনেক সময় ধ্যানের কাছাকাছি। যদি আমরা সচেতনভাবে আবৃত্তি করি, যদি আমরা প্রতিটি শব্দকে অনুভব করি, এবং যদি আমরা নীরবতার মূল্য বুঝতে শিখি, তাহলে কবিতা আমাদের মনকে শান্ত করার একটি পথ হয়ে উঠতে পারে।
১. কীভাবে আবৃত্তির ভেতরে ধ্যানের অভিজ্ঞতা তৈরি হয়;
২. কীভাবে শ্বাস ও কণ্ঠকে প্রস্তুত করা যায়; এবং
৩. কীভাবে কবিতা আমাদের অন্তরের নীরবতার দিকে নিয়ে যেতে পারে।
কারণ, কখনো কখনো একটি কবিতার কয়েকটি শব্দই মানুষের মনকে গভীরভাবে স্পর্শ করতে পারে। আর সেই স্পর্শ থেকেই শুরু হতে পারে একটি নতুন যাত্রা — শব্দ থেকে নীরবতার দিকে, কণ্ঠ থেকে হৃদয়ের দিকে, এবং অনুভূতি থেকে ধ্যানের দিকে।
মানুষের জীবনে শব্দের উপস্থিতি চিরন্তন। জন্মের মুহূর্ত থেকে আমরা শব্দের মধ্যে বাঁচতে শুরু করি। প্রথম কান্না, প্রথম ডাক, প্রথম উচ্চারণ — সবকিছুই শব্দের মাধ্যমে আমাদের পৃথিবীর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়।
শব্দ আমাদের অনুভূতির বাহন। আমরা আনন্দ প্রকাশ করি শব্দে, দুঃখ প্রকাশ করি শব্দে, ভালোবাসা জানাই শব্দে। কিন্তু শব্দের আরেকটি গভীর দিক আছে, যা আমরা সব সময় লক্ষ করি না। শব্দ আমাদের অন্তরের দরজাও খুলে দিতে পারে। কবিতা সেই দরজার একটি বিশেষ চাবি। কবিতা যখন আমরা পড়ি বা শুনি, তখন অনেক সময় এমন অনুভূতি জন্ম নেয়, যা সাধারণ ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। একটি ছোট্ট পঙক্তি হঠাৎ আমাদের মনে অদ্ভুত শান্তি এনে দিতে পারে। আবার কোনো একটি শব্দ আমাদের ভেতরের গভীর স্মৃতিকে স্পর্শ করতে পারে।
এ কারণেই কবিতা শুধু সাহিত্য নয়; এটি মানুষের অন্তরের একটি অভিজ্ঞতা। যখন সেই কবিতা আবৃত্তির মাধ্যমে উচ্চারিত হয়, তখন সেই অভিজ্ঞতা আরও জীবন্ত হয়ে ওঠে। আবৃত্তি একটি বিশেষ শিল্প। এখানে শব্দ কেবল উচ্চারিত হয় না; শব্দ অনুভূত হয়, শ্বাসের সঙ্গে ছন্দ তৈরি করে, এবং নীরবতার সঙ্গে মিলেমিশে একটি সম্পূর্ণ অভিজ্ঞতা তৈরি করে।
একজন আবৃত্তিকার যখন কবিতা বলেন, তখন তিনি কেবল একটি লেখা পাঠ করেন না, তিনি সেই কবিতার অনুভূতিকে জীবন্ত করে তোলেন। এই জীবন্ত অভিজ্ঞতার ভেতরে আমরা কখনো কখনো এমন একধরনের শান্তি অনুভব করি, যা ধ্যানের অভিজ্ঞতার কাছাকাছি। ধ্যান বা মেডিটেশন সাধারণত আমরা ভাবি — চোখ বন্ধ করে বসে থাকা, মনকে শান্ত করার চেষ্টা করা, অথবা শ্বাসের দিকে মনোযোগ দেয়া। কিন্তু ধ্যানের মূল অর্থ আরও গভীর। ধ্যান হলো সচেতনতা। ধ্যান হলো বর্তমান মুহূর্তের সঙ্গে সম্পূর্ণভাবে যুক্ত হয়ে থাকা। এই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে আবৃত্তিও একটি ধ্যানের পথ হতে পারে।
যখন আমরা একটি কবিতা ধীরে ধীরে আবৃত্তি করি, যখন আমরা প্রতিটি শব্দকে অনুভব করি, যখন আমরা শব্দের মাঝখানের নীরবতাকেও গ্রহণ করি, তখন আমাদের মন ধীরে ধীরে শান্ত হয়ে আসে। শব্দ তখন কেবল শব্দ থাকে না; এটি হয়ে ওঠে একটি যাত্রা। যাঁরা কবিতা ভালোবাসেন, যাঁরা শব্দের ভেতরে শান্তি খুঁজে পান, অথবা যাঁরা ধ্যানের নতুন একটি পথ খুঁজছেন। কারণ, কখনো কখনো ধ্যান শুরু হয় কোনো জটিল সাধনার মাধ্যমে নয়, বরং একটি সহজ অভিজ্ঞতার মাধ্যমে। একটি কবিতা শোনার মাধ্যমে।
মোবারক হোসেন ছিলেন শহরের প্রান্তে ছোট একটি ব্যবসার মালিক। সারা জীবন হিসাবি, কিপ্টে ও আত্মকেন্দ্রিক মনোভাবের কারণে তাঁর সুনাম কখনো গড়ে ওঠেনি। ছেলেবেলায় তাঁর পরিবার অভাবী ছিল, কিন্তু মা-বাবা সব সময় চেষ্টা করতেন সন্তানদের প্রয়োজন পূরণ করতে। অথচ সেই মোবারক সামান্য টাকা জমাতে গিয়ে মা-বাবার ওষুধ কেনা থেকেও পিছপা হয়েছেন। আত্মীয়স্বজনের বিপদে কখনো একটি পয়সা দেননি, এমনকি বন্ধুবান্ধবের কাছ থেকে দূরে থেকেছেন কেউ ধার চেয়ে বসে এই ভয়ে। সময়ের সাথে সাথে মোবারকের ব্যবসা জমে উঠল। দোকান থেকে উপার্জিত টাকা তিনি ব্যাংকে জমাতেন, ফিক্সড ডিপোজিট করতেন, আর স্বর্ণ কিনে লুকিয়ে রাখতেন পুরোনো ট্রাংকে। কেউ জানত না তাঁর আসল সম্পদের পরিমাণ। অথচ নিজের বাড়িটাও পুরোনো, ফাটল ধরা দেয়ালে ভরা। সেখানেই থাকতেন একাকী, রান্নার কাজ করতেন নিজেই, যেন একটা ডিমও অপচয় না হয়। বয়স যখন ষাট পেরিয়েছে, তখন হঠাৎ একদিন সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি একটি বাগানবাড়ি বানাবেন শহরের বাইরে। শেষ বয়সে একটু খোলামেলা পরিবেশে থাকা যাবে, এই যুক্তি দেখিয়ে অনেক টাকা খরচ করলেন। বাড়িটি বানাতে গিয়ে বহু শ্রমিক, ইঞ্জিনিয়ার নিয়োগ দিলেন। মোবারক বাড়ির সব খরচ নিজ হাতে হিসাব রাখতেন। ঘরগুলো আধুনিক, দেয়ালে কাঠের কারুকাজ, বারান্দায় দোলনা — সবই পরিপাটি, নিখুঁত। কিন্তু তবুও কেউ ছিল না পাশে। তিন বছর পর ওই বাড়িতে গিয়ে থাকতে শুরু করলেন মোবারক। বড় গেট, ফুলে ভরা বাগান, হাঁটার পথ, বিশ্রামের ছায়া — সবই ছিল, কিন্তু সঙ্গী বলতে কেউ ছিল না। একদিন হঠাৎ অসুস্থ বোধ করলেন। গা কাঁপুনি, জ্বর, দুর্বলতা। স্থানীয় ডাক্তার প্রথমে পাত্তা দিলেন না। কিন্তু দিন পেরোতে না পেরোতেই বোঝা গেল সমস্যাটা গুরুতর। শহরে গিয়ে রক্ত পরীক্ষা করালেন। ধরা পড়ল প্যানক্রিয়াস ক্যান্সার, তৃতীয় স্টেজ। হাসপাতালে শুয়ে শুয়ে মোবারক প্রথমবারের মতো ভাবলেন, এই বিশাল বাড়ি, জমানো টাকা, ব্যাংক ব্যালেন্স — সবই কেমন অর্থহীন লাগছে! জীবন এতটাই ক্ষণস্থায়ী, অথচ তিনি সারা জীবন কাটালেন হিসেব কষে। বাবার জীবনের শেষ সময়ে একটা ইনহেলার কেনেননি, মায়ের চোখে ছানি অপারেশনের খরচ দিতে অস্বীকার করেছিলেন। ভাতিজার পড়াশোনার খরচ না দেয়ায় কলেজে ভর্তি হতে পারেনি ছেলেটি। আজ সেই মোবারকের পাশে কেউ নেই। এক সন্ধ্যায় হাসপাতালের জানালায় তাকিয়ে থাকতে থাকতে চোখ ভিজে উঠল তাঁর। ছোট একটি মেয়ে পাশের রোগীকে তার বাবাকে ফল খাওয়াচ্ছে। দৃশ্যটি তাঁকে মনে করিয়ে দিল, তাঁর একটাই দোষ, ‘ভয় আর অবিশ্বাসে ভরা এক হৃদয়’। তিনি ভালোবাসতে পারেননি, কাউকে বিশ্বাস করতে পারেননি, এমনকি কাছের লোকজনকেও সাহায্য করতে পারেননি। টাকা ছিল, হৃদয় ছিল না। মোবারক সেই রাতে একজন নার্সকে ডেকে বললেন, “একটা কাজ করে দেবে মা?” নার্স বলল, “বলুন কাকা।” তিনি বললেন, “এই চিঠিটা আমার এলাকার মসজিদের ইমাম সাহেবকে পৌঁছে দেবে। আর যদি আমি বেঁচে না থাকি, আমার ঘরের আলমারির ভেতর থেকে সব কাগজ ও টাকা আমার গ্রামের দরিদ্র লোকজনের জন্য ওয়াকফ করে দিয়ো।” চিঠিতে তিনি তাঁর কিপ্টামির স্বীকারোক্তি লিখেছিলেন। ক্ষমা চেয়েছিলেন মা-বাবার কাছেও। আর সব সম্পত্তি দিয়ে যেতে চেয়েছিলেন এতিমখানা, হাসপাতাল এবং গ্রামের দরিদ্রদের জন্য। দুদিন পর মোবারক হোসেন মারা গেলেন। কেউ খুব একটা কাঁদেনি, কিন্তু তাঁর চিঠি যখন প্রকাশিত হলো, তখন অনেকের চোখে পানি এসেছিল। এক কাপুরুষ, কিপ্টে মানুষ শেষ জীবনে বুঝেছিলেন, মানুষের জীবনের আসল সম্পদ টাকা নয়, বরং সম্পর্ক, সহানুভূতি আর উদারতা। তাঁর তৈরি বাগানবাড়িটি এখন এক বৃদ্ধাশ্রম, যেখানে অনাথ ও অসহায় বৃদ্ধরা বসবাস করেন। তাঁর কিপ্টে জীবনের শেষ অধ্যায়ে পাওয়া অনুশোচনাই হয়তো মানুষের জন্য বড় একটি প্রাপ্তি হয়ে রয়ে গেল — একটা নিঃশব্দ শিক্ষা।
চলতি বছরের আগস্টের শেষ দিকে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে বলে জানিয়েছেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম। তিনি আশা প্রকাশ করেন, আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে কেন্দ্রটির প্রথম ইউনিট থেকে ১,০০০ মেগাওয়াটেরও বেশি বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা সম্ভব হবে। অন্যদিকে নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেডের (এনপিসিবিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. মো. জাহেদুল হাসান জানিয়েছেন, কেন্দ্রটির প্রথম ইউনিট ২০২৭ সালের শুরুতে এবং দ্বিতীয় ইউনিট ২০২৮ সালের শুরুতে পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্যিক উৎপাদনে যাবে। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের নিরাপত্তা, কমিশনিং, পরিচালনাগত প্রস্তুতি এবং সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত নানা প্রতিবেদনকে কেন্দ্র করে জনমনে বিভিন্ন প্রশ্ন ও কৌতূহল তৈরি হয়েছে। এসব বিষয়ে ড. জাহেদুল হাসানের সঙ্গে কথা হলে তিনি কেন্দ্রটির নিরাপত্তা, পরিচালনা, আন্তর্জাতিক তদারকি কাঠামোসহ গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সম্পর্কে ব্যাখ্যা দেন। ড. জাহেদুল হাসান বলেন, একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র কোনো একক প্রতিষ্ঠানের সিদ্ধান্তে পরিচালিত হয় না। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে একাধিক স্বাধীন কারিগরি, নিয়ন্ত্রক ও নিরাপত্তা সংস্থার সমন্বিত তদারকির মাধ্যমে এর প্রতিটি ধাপ পরিচালিত হয়। তিনি জানান, বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন (বিএইসি) প্রকল্পের মালিক হিসেবে নির্মাণ চুক্তি বাস্তবায়ন এবং স্থাপনা গ্রহণের দায়িত্ব পালন করছে। নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেড আইন অনুযায়ী কেন্দ্রটির অপারেটিং অর্গানাইজেশন। কমিশনিং, নিরাপদ পরিচালনা, রক্ষণাবেক্ষণ এবং ভবিষ্যতে ডিকমিশনিং পর্যন্ত সব অপারেশনাল দায়িত্ব এনপিসিবিএলের ওপর ন্যস্ত। অন্যদিকে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ একটি স্বাধীন নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে আন্তর্জাতিক ও জাতীয় নিরাপত্তা মানদণ্ড অনুযায়ী প্রকল্পের প্রতিটি ধাপ মূল্যায়ন করে প্রয়োজনীয় লাইসেন্স প্রদান করছে। কমিশনিং কার্যক্রমের স্বাধীন কারিগরি মূল্যায়নের জন্য বিএইবিএ আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ভিও সেফটিকে এক্সপার্ট অর্গানাইজেশন হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে। এ ছাড়া রাশিয়ার সিআরইএ কমিশনিং, অপারেশনাল প্রস্তুতি, অপারেটর প্রশিক্ষণ এবং জ্ঞান স্থানান্তরে এনপিসিবিএলকে সহায়তা করছে। রাশিয়ার স্বাধীন নিয়ন্ত্রক সংস্থা Rostechnadzor গুরুত্বপূর্ণ কমিশনিং পর্যায়ে বিএইআরএর সঙ্গে প্রযুক্তিগত অভিজ্ঞতা বিনিময় করছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা বিভিন্ন Peer Review Mission ও Technical Review পরিচালনার মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রস্তুতি আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মানদণ্ড অনুযায়ী মূল্যায়ন করছে এবং প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিচ্ছে। ড. জাহেদুল বলেন, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত একাধিক জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের স্বাধীন কারিগরি মূল্যায়ন, নিয়ন্ত্রক অনুমোদন এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মানদণ্ড অনুসরণ করেই গ্রহণ করা হয়। এনপিসিবিএল এখনো দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় সক্ষমতা অর্জন করতে পারেনি—এমন সমালোচনার বিষয়ে ড. জাহেদুল বলেন, পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনার মূল ভিত্তি হলো দক্ষ জনবল ও শক্তিশালী নিরাপত্তা সংস্কৃতি। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, গত এক দশকে সরকার এ খাতে ব্যাপক বিনিয়োগ করেছে। শত শত প্রকৌশলী, অপারেটর, রিঅ্যাক্টর বিশেষজ্ঞ, রসায়নবিদ, বিকিরণ সুরক্ষা কর্মকর্তা, রক্ষণাবেক্ষণ প্রকৌশলী রাশিয়াসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছেন। তারা Full Scope Simulator, On-the-Job Training এবং Classroom Training-সহ আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ সফলভাবে সম্পন্ন করেছেন। তিনি আরও বলেন, প্রতিটি অপারেটরকে বিএইআরএর কঠোর লাইসেন্সিং ও মূল্যায়ন প্রক্রিয়া অতিক্রম করতে হয়। একই সময়ে সিআরইএর বিশেষজ্ঞরা কমিশনিং পর্যায়ে এনপিসিবিএলের কর্মীদের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করে আন্তর্জাতিক সর্বোত্তম চর্চা অনুযায়ী জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা স্থানান্তর নিশ্চিত করছেন। ফলেএনপিসিবিএল বর্তমানে প্রযুক্তিগত, অপারেশনাল ও প্রাতিষ্ঠানিক—সব দিক থেকেই দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনার জন্য একটি সক্ষম Operating Organization হিসেবে গড়ে উঠেছে। স্পেন্ট ফুয়েল (ব্যবহৃত পারমাণবিক জ্বালানি) ব্যবস্থাপনা এবং রাশিয়ার সঙ্গে এ বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত চুক্তি হয়নি—এমন আলোচনার প্রসঙ্গে ড. জাহেদুল বলেন, আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শিল্পের প্রচলিত পদ্ধতি সম্পর্কে সীমিত ধারণার কারণেই এ ধরনের বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছে। তিনি জানান, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক সংস্থা রোসাটমের মধ্যে চুক্তি ইতোমধ্যে স্বাক্ষরিত হয়েছে। এর পাশাপাশি বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন ও টিভিইলের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি পারমাণবিক জ্বালানি সরবরাহের ফ্রেমওয়ার্ক এগ্রিমেন্ট বিদ্যমান রয়েছে। তিনি আরও বলেন, আইএইএর নিরাপত্তা নির্দেশিকা অনুযায়ী ব্যবহৃত পারমাণবিক জ্বালানি রিঅ্যাক্টর থেকে অপসারণের পর তাৎক্ষণিকভাবে অন্য দেশে পাঠানো হয় না। প্রথমে কেন্দ্রের নকশার অংশ হিসেবে নির্মিত স্পেন্ট ফুয়েল পোলে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত নিরাপদে সংরক্ষণ ও শীতলীকরণ করা হয়, যা বিশ্বের সব আধুনিক পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রেই অনুসরণ করা হয়। পরবর্তীতে বিদ্যমান আন্তঃরাষ্ট্রীয় চুক্তি, বাণিজ্যিক ব্যবস্থা এবং সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষের অনুমোদনের ভিত্তিতে পরবর্তী ব্যবস্থাপনা সম্পন্ন হয়। উল্লেখ্য, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পে রাশিয়ার ভিবিইআর-১২০০ মডেলের তৃতীয় প্রজন্মের দুটি রিয়্যাক্টর স্থাপন করা হচ্ছে। প্রতিটি ইউনিটের উৎপাদন ক্ষমতা ১,২০০ মেগাওয়াট। দুটি ইউনিট চালু হলে কেন্দ্রটির মোট উৎপাদন ক্ষমতা হবে ২,৪০০ মেগাওয়াট। সংশ্লিষ্টদের মতে, রিয়্যাক্টরগুলো আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মানদণ্ড পূরণে সক্ষম। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক সংস্থা রোসাটম।
আকাশের নীলে কীবা কবিতার মিলে না গোলাপের সুরভিতে ডানা মেলা চিলে না। গোধূলির রং এসে সন্ধ্যায় যায় মেশে কোথাও তো নেই তুমি গল্পের শুরু-শেষে। চাদরের আদরে না না ভোরের রবিতে না শিমুল কোলে থাকা কোকিলের ছবিতে। রিমঝিম টুপটাপ বরষার ছন্দে তোমাকেই খুঁজে পাই কামিনীর গন্ধে।
অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়েছে পৃথিবীর ভাগ্যাকাশ শুরু হয়েছে একের পর এক দুর্যোগ, দুর্ভিক্ষ; মহামারি চলছে পাল্লা দিয়ে। বর্ণাঢ্য আয়োজনে পশুত্ব গিলছে মনুষ্যত্ব অ-অনুমেয়— কতটা লম্বা মৃত্যুর মিছিল? অশান্ত, ভীষণ প্রকৃতি এখন। ধৈর্য, সহনশীলতার হয়েছে অকালমৃত্যু দানবীয় শক্তিতে জ্বলে উঠেছে আগ্নেয়গিরি। বিষাক্ত বিষ উদগিরিত হচ্ছে গলগলিয়ে লাভার তাপে অঙ্গার হলো পাখির নীড়। এমন দুর্যোগকালীন সময়ে তোমাকে ভীষণ প্রয়োজন, কবিতা। কেবল তুমিই জানো স্বার্থের বেড়া ভেঙে প্রেমের কুটির রচনার মন্ত্র। তুমিই পারো ধ্বংসস্তূপকে রূপ দিতে শৈল্পিক। এমন ধবধবে ভূতুড়ে দিনে তোমাকে ভীষণ প্রয়োজন, কবিতা। তোমার জাদুকরি শব্দরাই পারবে মোহের ঝকমকি সরিয়ে জাগ্রত পতাকা ওড়াতে। তোমার আগুনঝরা কথা স্ফুলিঙ্গের মতো ঘুরবে কালের আকাশে।
পিঠে পেট ঠেকেছে, তবু আনন্দ-বেসাতির কমতি নেই রোদে পুড়ে ঝড়-বৃষ্টিতে ভিজে একটা মানুষ জীবন-যুদ্ধে লড়ে যায় অহর্নিশি প্রসন্নতার আলপথে খোঁজে কষ্টের সুখ চোখের দীপ্র জ্যোতিতে প্রিয় সন্তানের মুখ কষ্টের টানাপোড়েনেও বাবা যেন সাঁকো বাঁধা সেতু- জীবন-নদীর দুই তীর অপত্য স্নেহে আগলে বেঁধে রাখে। নদীর স্রোত কোথাও খরস্রোতা, কোথাও ধীর লয় রোদে পুড়ে, ঝড়-বৃষ্টিতে ভিজে পরিশ্রমী বাবারা এমনই বহমান নদী।
অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়েছে পৃথিবীর ভাগ্যাকাশ শুরু হয়েছে একের পর এক দুর্যোগ, দুর্ভিক্ষ; মহামারি চলছে পাল্লা দিয়ে। বর্ণাঢ্য আয়োজনে পশুত্ব গিলছে মনুষ্যত্ব অ-অনুমেয়— কতটা লম্বা মৃত্যুর মিছিল? অশান্ত, ভীষণ প্রকৃতি এখন। ধৈর্য, সহনশীলতার হয়েছে অকালমৃত্যু দানবীয় শক্তিতে জ্বলে উঠেছে আগ্নেয়গিরি। বিষাক্ত বিষ উদগিরিত হচ্ছে গলগলিয়ে লাভার তাপে অঙ্গার হলো পাখির নীড়। এমন দুর্যোগকালীন সময়ে তোমাকে ভীষণ প্রয়োজন, কবিতা। কেবল তুমিই জানো স্বার্থের বেড়া ভেঙে প্রেমের কুটির রচনার মন্ত্র। তুমিই পারো ধ্বংসস্তূপকে রূপ দিতে শৈল্পিক। এমন ধবধবে ভূতুড়ে দিনে তোমাকে ভীষণ প্রয়োজন, কবিতা। তোমার জাদুকরি শব্দরাই পারবে মোহের ঝকমকি সরিয়ে জাগ্রত পতাকা ওড়াতে। তোমার আগুনঝরা কথা স্ফুলিঙ্গের মতো ঘুরবে কালের আকাশে।
ভরা গাঙে নৌকা চলে মাঝি তোলে পাল ঘন মেঘের খেয়া চলে জেলে টানে জাল। খালে-বিলে ব্যাঙের নাচন সূর্য মামার আড়ি কালো মেঘের ছায়া ভাসে ময়ূর নাচে ভারি। হাসনাহেনা কদম কেয়া গন্ধরাজ ও জুঁই হেসে হেসে গন্ধ ছড়ায় বৃষ্টি কণা ছুঁই।
খরা যখন উদোম নাচে ওষ্ঠাগত প্রাণ বৃষ্টি তখন শীতল ঢেলে গাইতে আসে গান। টলমলে জল কচুর পাতায় স্নান সেরে নেয় ঘাস দিঘির পাড়ে এক পায়ে বেশ ঘুমায় বসে হাঁস। ছুটতে থাকে জলের ধারা ভরে পুকুর বিল ছুটিতে যায় সুর্যি মামা হাসে না খিলখিল! টিনের চালে ঝুমুর তালে বৃষ্টি বাজায় বিণ আকাশ ঢাকে কালো মেঘে আঁধার কাটে দিন। উল্লাসে ব্যাঙ মাছের দলে উজান পানে ধায় বর্ষা আনে ভরসা মনে প্রাণ খুলে গান গায়।