সংযুক্ত আরব আমিরাতের আজমানে প্রবাসী বাংলাদেশীদের জন্য একটি বিশেষ মতবিনিময় ও সচেতনতামূলক সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। শনিবার কনস্যুলেট জেনারেল, দুবাই এবং বাংলাদেশ কমিউনিটি, আজমানের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এই সভায় আমিরাতের আইন-কানুন মেনে চলার আহ্বান জানানো হয়। অনুষ্ঠানে স্থানীয় প্রবাসীদের কনস্যুলার সেবা এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারে সতর্ক থাকার বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা দেওয়া হয়। দুবাই ও উত্তর আমিরাতে নিযুক্ত বাংলাদেশের কনসাল জেনারেল মো. রাশেদুজ্জামান সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। বক্তারা আমিরাতের প্রচলিত বিধি-বিধান এবং স্থানীয় রীতি-নীতি যথাযথভাবে অনুসরণের গুরুত্ব তুলে ধরেন। এছাড়া প্রবাসীরা তাদের ভিসা সংক্রান্ত জটিলতা ও বিভিন্ন সেবা নিয়ে সরাসরি প্রশ্ন করার সুযোগ পান এবং কনস্যুলেট প্রতিনিধিরা এসব সমস্যার সমাধানে প্রয়োজনীয় পরামর্শ প্রদান করেন। সভায় কমিউনিটি নেতৃবৃন্দ ও বিপুল সংখ্যক প্রবাসী বাংলাদেশী অংশ নেন।
অতি সম্প্রতি শক্তিশালী ভূমিকম্পে ভেনেজুয়েলা বড় ধরনের মানবিক সংকটে পড়েছে। মুহূর্তের মধ্যে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে বহু জনপদ, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সড়ক, হাসপাতাল, বিদ্যুৎ ও যোগাযোগ ব্যবস্থা। অসংখ্য মানুষ প্রাণ হারিয়েছে, হাজারো পরিবার গৃহহীন হয়েছে। প্রতিটি বড় ভূমিকম্পের মতো এই বিপর্যয়ও আমাদের একটি কঠিন সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে—প্রকৃতি কখনো আগাম সতর্ক করে না; কিন্তু প্রস্তুতির অভাবের মূল্য দিতে হয় মানুষের জীবন দিয়ে। সভ্যতার দীর্ঘ ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, কয়েক সেকেন্ডের একটি ভূমিকম্প বহু বছরের উন্নয়ন, পরিশ্রম ও স্বপ্নকে ধূলিসাৎ করে দিতে পারে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি অভূতপূর্ব অগ্রগতি অর্জন করলেও ভূমিকম্পের নির্দিষ্ট সময়, স্থান ও তীব্রতা এখনো নির্ভুলভাবে পূর্বাভাস দেয়া সম্ভব হয়নি। তাই ভূমিকম্প মোকাবেলায় সবচেয়ে কার্যকর কৌশল হলো দুর্যোগ-পরবর্তী তৎপরতার চেয়ে দুর্যোগ-পূর্ব প্রস্তুতিকে অগ্রাধিকার দেয়া। ভেনেজুয়েলার অভিজ্ঞতা আবারও প্রমাণ করেছে, ভূমিকম্পে প্রাণহানির প্রধান কারণ কেবল ভূকম্পন নয়; বরং দুর্বল অবকাঠামো, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, নির্মাণে অনিয়ম এবং দুর্যোগ প্রস্তুতির ঘাটতি। একই মাত্রার ভূমিকম্প দুটি দেশে সম্পূর্ণ ভিন্ন পরিণতি ডেকে আনতে পারে। কোথাও হাজারো মানুষের মৃত্যু ঘটে, আবার কোথাও ক্ষয়ক্ষতি সীমিত থাকে। এই পার্থক্যের নাম প্রস্তুতি। দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক সংকট ভেনেজুয়েলার অবকাঠামো উন্নয়ন ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনাকে দুর্বল করেছে। অনেক ভবন আধুনিক ভূমিকম্প-সহনশীল নকশায় নির্মিত নয়। কোথাও উদ্ধার সরঞ্জামের ঘাটতি, কোথাও চিকিৎসা সেবার সীমাবদ্ধতা, আবার কোথাও যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় উদ্ধারকাজ বিলম্বিত হয়েছে। ফলে ভূমিকম্পের প্রাথমিক আঘাতের পাশাপাশি দ্বিতীয় পর্যায়ের মানবিক সংকট আরও গভীর হয়েছে। এই বাস্তবতা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, দুর্যোগের পর যত দক্ষ উদ্ধার অভিযানই পরিচালিত হোক না কেন, দুর্যোগের আগে যথাযথ প্রস্তুতির বিকল্প নেই। বিশ্বের কয়েকটি দেশ এই শিক্ষা অনেক আগেই গ্রহণ করেছে। জাপান তার অন্যতম উদাহরণ। ভূমিকম্প সেখানে নিত্যদিনের বাস্তবতা, তবু তুলনামূলকভাবে প্রাণহানি কম। কারণ দেশটি কঠোর ভবন নির্মাণবিধি, উন্নত প্রকৌশল প্রযুক্তি, দ্রুত সতর্কীকরণ ব্যবস্থা এবং নিয়মিত মহড়ার মাধ্যমে একটি দুর্যোগ-সহনশীল সংস্কৃতি গড়ে তুলেছে। শিশুরা স্কুলজীবন থেকেই ভূমিকম্পের সময় করণীয় শেখে, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়মিত মহড়া পরিচালনা করে এবং নাগরিকদের মধ্যে প্রস্তুতির সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। চিলিও কঠোর নির্মাণনীতি ও পরিকল্পিত নগর ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে একই ধরনের সাফল্য অর্জন করেছে। এসব উদাহরণ দেখায়, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ঠেকানো না গেলেও পরিকল্পিত প্রস্তুতির মাধ্যমে ক্ষয়ক্ষতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের বাস্তবতা বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। অনেকের ধারণা, বাংলাদেশ মূলত বন্যা ও ঘূর্ণিঝড়প্রবণ দেশ; তাই ভূমিকম্পের ঝুঁকি তুলনামূলক কম। বাস্তবে এই ধারণা বিভ্রান্তিকর। বাংলাদেশ ভারতীয়, ইউরেশীয় ও বার্মা টেকটোনিক প্লেটের প্রভাবাধীন অঞ্চলে অবস্থিত। দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চল, পূর্বাঞ্চল ও মধ্যাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা উল্লেখযোগ্য ভূমিকম্প ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। অতীতের একাধিক শক্তিশালী ভূমিকম্প সেই বাস্তবতারই সাক্ষ্য বহন করে। ঝুঁকির বিষয়টি জানা থাকলেও আমাদের প্রস্তুতি এখনো কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি। দ্রুত নগরায়ণ, অপরিকল্পিত ভবন নির্মাণ, ঘনবসতি, দুর্বল তদারকি এবং আইন বাস্তবায়নের সীমাবদ্ধতা সম্ভাব্য একটি ভূমিকম্পকে জাতীয় বিপর্যয়ে রূপ দিতে পারে। রাজধানী ঢাকা এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ এই মহানগরে অনেক এলাকায় ভবনের মধ্যবর্তী দূরত্ব অত্যন্ত কম। একটি ভবন ধসে পড়লে পাশের ভবনও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। সংকীর্ণ সড়ক, তীব্র যানজট, উন্মুক্ত স্থানের অভাব এবং জটিল গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংযোগ উদ্ধারকাজকে আরও কঠিন করে তুলতে পারে। একই চিত্র কমবেশি চট্টগ্রাম, সিলেট, নারায়ণগঞ্জসহ অন্যান্য বড় শহরেও বিদ্যমান। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, জাতীয় ভবন নির্মাণ বিধিমালা থাকলেও বাস্তবে সব ক্ষেত্রে তা কঠোরভাবে অনুসরণ করা হয় না। কোথাও অনুমোদিত নকশা পরিবর্তন করা হয়, কোথাও নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার করা হয়, আবার কোথাও অনুমতির বাইরে অতিরিক্ত তলা নির্মাণ করা হয়। এসব অনিয়ম শুধু আইন ভঙ্গের ঘটনা নয়; এটি মানুষের জীবনের নিরাপত্তার সঙ্গে আপস। একটি বড় ভূমিকম্পে এসব ভবনই ব্যাপক প্রাণহানির কারণ হতে পারে। অবকাঠামোর পাশাপাশি জনসচেতনতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের দেশে ঘূর্ণিঝড় ও বন্যা মোকাবেলায় সচেতনতা আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে। কিন্তু ভূমিকম্পের ক্ষেত্রে এখনো সেই সংস্কৃতি গড়ে ওঠেনি। অনেকেই আতঙ্কিত হয়ে লিফট ব্যবহার করেন, সিঁড়িতে হুড়োহুড়ি করেন কিংবা গুজবের কারণে ভুল সিদ্ধান্ত নেন। অথচ অল্প সময়ের প্রশিক্ষণ এবং নিয়মিত মহড়া অসংখ্য প্রাণ রক্ষা করতে পারে। তাই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে বছরে অন্তত দুবার ভূমিকম্প মহড়া, নিরাপদ নির্গমনপথের অনুশীলন এবং প্রাথমিক চিকিৎসার প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করা উচিত। একইভাবে সরকারি ও বেসরকারি অফিস, হাসপাতাল, শিল্পকারখানা ও বিপণিবিতানেও নিয়মিত দুর্যোগ মহড়ার ব্যবস্থা থাকতে হবে। দুর্যোগ প্রস্তুতি কোনো আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি জীবন রক্ষার একটি কার্যকর উপায়। প্রযুক্তিও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। মোবাইলভিত্তিক জরুরি সতর্কবার্তা, ডিজিটাল মানচিত্র, ড্রোনের মাধ্যমে ক্ষয়ক্ষতি মূল্যায়ন, সমন্বিত যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব প্রতিরোধের ব্যবস্থা উদ্ধারকাজকে আরও দ্রুত ও কার্যকর করতে পারে। একই সঙ্গে অনুসন্ধান ও উদ্ধারকারী সংস্থাগুলোর জন্য আধুনিক সরঞ্জাম, পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ ও নিয়মিত যৌথ মহড়া নিশ্চিত করতে হবে। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা বলছে, ভূমিকম্পের পর প্রথম ২৪ থেকে ৭২ ঘণ্টা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এই সময়ের মধ্যে কার্যকর উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করা গেলে বহু মানুষের প্রাণ রক্ষা করা সম্ভব। দুর্যোগ প্রস্তুতিতে নাগরিকদেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। প্রতিটি পরিবারের একটি জরুরি পরিকল্পনা থাকা উচিত। একটি ব্যাগে প্রাথমিক চিকিৎসাসামগ্রী, টর্চ, অতিরিক্ত ব্যাটারি, বিশুদ্ধ পানি, শুকনো খাবার, প্রয়োজনীয় ওষুধ এবং গুরুত্বপূর্ণ নথির অনুলিপি সংরক্ষণ করা যেতে পারে। পরিবারের সদস্যদের জন্য একটি নির্দিষ্ট মিলনস্থল নির্ধারণ এবং বিকল্প যোগাযোগ ব্যবস্থা তৈরি করাও জরুরি। এসব প্রস্তুতি ছোট মনে হলেও সংকটের সময় জীবন বাঁচাতে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। বাংলাদেশ ইতোমধ্যে ঘূর্ণিঝড় মোকাবেলায় বিশ্বের সামনে একটি সফল উদাহরণ স্থাপন করেছে। আগাম সতর্কবার্তা, আশ্রয়কেন্দ্র, স্বেচ্ছাসেবক নেটওয়ার্ক এবং জনসচেতনতার সমন্বয়ে হাজার হাজার প্রাণ রক্ষা করা সম্ভব হয়েছে। এই অভিজ্ঞতা আমাদের আত্মবিশ্বাস জোগায় যে রাজনৈতিক সদিচ্ছা, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এবং কঠোর বাস্তবায়ন থাকলে ভূমিকম্প প্রস্তুতিতেও একই ধরনের সাফল্য অর্জন করা সম্ভব। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কেবল সরকারের একার দায়িত্ব নয়। প্রকৌশলী যখন নিরাপদ নকশা প্রণয়ন করেন, ঠিকাদার যখন মানসম্পন্ন নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার করেন, স্থানীয় প্রশাসন যখন কঠোরভাবে আইন প্রয়োগ করে, শিক্ষক যখন শিক্ষার্থীদের সচেতন করেন, গণমাধ্যম যখন তথ্যভিত্তিক প্রতিবেদন প্রকাশ করে এবং সাধারণ মানুষ যখন নিজ নিজ পরিবারকে প্রস্তুত করে, তখনই একটি দুর্যোগ-সহনশীল সমাজ গড়ে ওঠে। ভেনেজুয়েলার সাম্প্রতিক ভূমিকম্প আমাদের সামনে একটি নির্মম সত্য তুলে ধরেছে—প্রকৃতিকে থামানো যায় না, কিন্তু প্রস্তুতির মাধ্যমে ক্ষয়ক্ষতি অনেকাংশে কমানো যায়। তাই এটি শুধু দূরদেশের একটি সংবাদ নয়; বাংলাদেশের জন্যও একটি স্পষ্ট সতর্কসংকেত। উন্নয়নের প্রতিটি পরিকল্পনায় নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। ভবন নির্মাণ আইন কঠোরভাবে বাস্তবায়ন, দুর্যোগ প্রস্তুতিকে শিক্ষাব্যবস্থার অংশ করা, উদ্ধার সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং নাগরিক সচেতনতা জোরদার করার এখনই উপযুক্ত সময়। ভূমিকম্প কোনো পূর্বঘোষণা দিয়ে আসে না। কিন্তু প্রস্তুতি নেয়ার সুযোগ আমাদের হাতে আজই রয়েছে। আমরা যদি অন্য দেশের বিপর্যয় থেকে শিক্ষা গ্রহণ করি এবং এখনই কার্যকর উদ্যোগ নিই, তাহলে ভবিষ্যতের সম্ভাব্য দুর্যোগে অসংখ্য প্রাণ ও বিপুল সম্পদ রক্ষা করা সম্ভব হবে। ভেনেজুয়েলার ধ্বংসস্তূপ তাই কেবল একটি দেশের ট্র্যাজেডি নয়; এটি বাংলাদেশের জন্যও একটি জাগরণের আহ্বান। আজকের দূরদর্শী সিদ্ধান্তই আগামী দিনের নিরাপদ বাংলাদেশ গড়ার ভিত্তি হতে পারে।
সম্প্রতি নেপাল, বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কার রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে একটা বিষয় স্পষ্ট যে, দক্ষিণ এশিয়ার এই ক্ষুদ্র দেশগুলোর জনতা বর্তমানে আর পুরোনো রাজনৈতিক বন্দোবস্তে সন্তুষ্ট নয়। দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতির উন্নয়ন, পরিবর্তন, স্বচ্ছতা, সাথে জনতার অংশগ্রহণের সুষম একটি রাজনৈতিক চর্চার জন্য উপাদানগুলোর যথাযথ সংমিশ্রণ ও ফলাফলে নিজেদের কাঙ্ক্ষিত আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন দেখতে তারা এখন আগ্রহী। মানুষ এখন তথাকথিত গতানুগতিক রাজনৈতিক বলয় থেকে বেরিয়ে নতুন ধারার কাঠামো গড়ে তোলার পক্ষে। সেই সাথে নিজেদের অধিকার আদায়ের দাবির পাশাপাশি শিক্ষা, সচেতনতা, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যপাঠ ও চর্চার বিষয়টিকেও তারা সমান্তরালভাবে রাজনীতির চিন্তা-চেতনার সাথে গ্রথিত করে নিচ্ছে। প্রচলিত যেকোনো ন্যারেটিভের বিপরীতে দাঁড়িয়ে পরাশক্তির নিকট বশ্যতা অস্বীকার করে নিজ রাষ্ট্রকে এক সমুন্নত মর্যাদায় উন্নীত করতে জনগণ এখন অনেক সোচ্চার। আর গণ-আন্দোলনের পরে পরিবর্তিত এই পরিস্থিতিগুলো আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক পর্যায়ে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণের জন্ম দিচ্ছে। নেপালে যেখানে তরুণ প্রজন্মের উত্থান কেবল দেশীয় রাজনৈতিক পরিবর্তনে সন্তুষ্ট না থেকে একে আধুনিক ও উন্নয়নমুখী রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলার শপথ নেয়, অপরপক্ষে বাংলাদেশের অভ্যুত্থান-পরবর্তী পর্যায়ে স্বাধীন ও স্বতন্ত্র একটি দেশ হিসেবে নিজেদের সিদ্ধান্ত নিজেই গ্রহণ করার ব্যাপারে আগ্রহী হয়ে উঠছে৷ ইতোপূর্বে বিদেশি প্রভাব দেশীয় গণতন্ত্র ও জাতীয় স্বার্থকে প্রভাবিত করলেও বাংলাদেশে সেটি বর্তমানে রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে সীমাবদ্ধ না থেকে আঞ্চলিক সংস্কৃতি ও ধর্মীয় প্রথার ওপরও প্রভাব ফেলছে। অন্যদিকে শ্রীলঙ্কার আন্দোলন প্রমাণ করেছে, জনগণের মৌলিক চাহিদা পূরণে ব্যর্থ কোনো সরকারের জনতার হাতে পরাস্ত হওয়াটাই নিয়তি। একটি দেশের অর্থনীতি ধসে পড়লে প্রকৃতপক্ষে রাজনৈতিক ক্ষমতাটাও গুঁড়িয়ে যায়। এদিকে আফগানিস্তানে আলোকপাত করলে দেখা যায়, তালেবান পুনরায় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ায় সেখানকার নিপীড়িত, নিমজ্জিত জাতির মাঝেও অসন্তোষ ও দাবিদাওয়া বিদ্যমান, যদিও প্রকাশের সুযোগ সীমিত৷ ক্ষুদ্র এসব রাষ্ট্রকে কেন্দ্র করে আঞ্চলিক রাজনীতির সাথে বৈশ্বিক রাজনীতির এক নতুন মেরুকরণ রচিত হচ্ছে। পরিবর্তিত রাজনৈতিক সব পটভূমিকে কেন্দ্র করে ভারত, পাকিস্তান, চীন, রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র তাদের কৌশলগত রাজনীতির প্রতিযোগিতাকে প্রখর করে তুলছে৷ ভারতের সাথে নেপালের ঐতিহাসিক একটি ঘনিষ্ঠ সংযোগ থাকলেও এখন চীনের সঙ্গে এর অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক দেশটির পরিবর্তিত রাজনীতিকে এক নতুন মোড়ে এনে দাঁড় করিয়েছে৷ পক্ষান্তরে বাংলাদেশের চব্বিশের অভ্যুত্থান একটি জাতীয় সার্বভৌমত্ব, সাংস্কৃতিক মর্যাদা ও ধর্মীয় ঐতিহ্যের প্রতি জনগণের একটি সংরক্ষক মনোভাবের জন্ম দিচ্ছে, যাতে করে নিজ কূটনৈতিক স্বার্থে এতিহাসিক দ্বন্দ্ব ভুলে পাকিস্তান বাংলাদেশের সাথে তার সম্পর্ককে বেগবান করতে চাইছে। (সম্প্রতি পাকিস্তানে ভিসামুক্ত সুবিধা, সরাসরি সমুদ্র ও বিমান যোগাযোগ সুবিধাসহ দেশটির উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ঢাকা সফর, পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নকভি এবং বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মাঝে অনুষ্ঠিত পররাষ্ট্রসচিব পর্যায়ের বৈঠক এমন ইঙ্গিতই বহন করে) শ্রীলঙ্কায় ধসে পড়া পলিটিক্যাল দৃশ্য বদলাতে ভারত এগিয়ে আসা সত্ত্বেও সেখানে চীন তার শক্তিশালী প্রভাব বিস্তার করছে৷ চীনের এই কৌশলগত ও বিনিয়োগনীতি একইভাবে প্রভাবিত করছে পাকিস্তান, নেপালসহ বাংলাদেশেও। তবে আফগানিস্তানে সৃষ্ট পরিবর্তনকে পাকিস্তান অনেকটাই অস্বস্তির চোখে দেখে। যেহেতু এশিয়ার একটি শক্তিধর দেশ হিসেবে ভারতের ঐতিহাসিক ও কূটনৈতিক প্রভাব সেখানে বিদ্যমান। সে কারণে পাকিস্তান এটিকে নিজেদের জন্য হুমকি হিসেবেই দেখে আসছে। ফলে আফগানিস্তানের যেকোনো পরিবর্তন স্পষ্টতই দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে একটি আলোড়ন তোলে৷ সংগঠিত সব রাজনৈতিক পরিবর্তন ও আন্দোলন এটাই সব সময় প্রমাণ করে নতুন সমাজব্যবস্থা গড়ে তোলার নিমিত্তে। যুগে যুগে সংগঠিত বিপ্লবগুলো প্রমাণ করেছে, ইতিহাস পরিবর্তনের লাগামটা মূলত জনতার হাতেই থাকে। আর বিক্ষোভ বিপ্লবে কেবল অভ্যন্তরীণ রাজনীতির রূপটাই বদলায় না, বরং আঞ্চলিক ও বিশ্বের বড় বড় শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলোকে বাধ্য করে নিজ রাজনীতির কৌশলকে নতুন করে সাজিয়ে নিতে। কৌতূহলে জেগেই ওঠে এসব পরিবর্তন মূলত দক্ষিণ এশিয়ার ভবিষ্যৎ রাজনীতিকে কোন খাতে প্রভাবিত করবে? এটা তো স্পষ্ট, সব দেশের জনগণ এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি সচেতন ও সোচ্চার। কোনো প্রকার ন্যারেটিভ চাপানো কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহার তারা মানতে নারাজ৷ উদাহরণ স্বরূপ, বর্তমানে ভারতের দিল্লিতে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগসহ আরও কিছু দাবি আদায়ে উত্তাল তরুণদের নতুন শক্তির উত্থান ও ক্রমবিকাশ এর আরও একটি প্রমাণ। সুতরাং, প্রমাণিত জনগণের কণ্ঠস্বরকে উপেক্ষা করার কোনো সুযোগ কোনো দেশের সরকারেরই নেই৷ আবার এই আন্দোলনগুলো বড় শক্তির রাষ্ট্রের ভূমিকাগুলোকে ক্রমেই জটিল করে তুলবে। ভারত যেখানে ঐতিহ্যের প্রভাব বলয় ধরে রাখতে নিরাপদ সীমান্তের নিশ্চয়তা নিতে চাইবে নিজের আঞ্চলিক বাণিজ্য সম্প্রসারণের লক্ষ্যে, সেখানে পাকিস্তান চাইবে মিত্র দেশগুলোর সাথে ইতিবাচক সম্পর্ককে আরও দৃঢ় করতে। এদিকে চীন, যুক্তরাষ্ট্র, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো এই শূন্যতায় প্রভাব বিস্তারে তৎপর থাকবে। চীন যেখানে অর্থনৈতিক বিনিয়োগ এবং বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ প্রকল্পে মনোযোগী হবে, সেখানে গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের দোহাই দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারে সক্রিয় হবে এবং ইসলামি ঐক্যের সমর্থন জড়ো করতে পরিশ্রম করবে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো। এই বহুমাত্রিক ভূরাজনীতিতে এসব ক্ষুদ্র রাষ্ট্র গুরুত্বপূর্ণ হওয়ার পাশাপাশি এশিয়া ক্রমশ বৈশ্বিক শক্তির অদৃশ্য প্রতিযোগিতার সেন্টার পয়েন্ট হিসেবে দাঁড়াবে৷ জলবায়ুর পরিবর্তন তথা সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং পরিবেশগত অভিবাসনও আগামীর সময়ে দক্ষিণ এশিয়ায় নতুন সহযোগিতা ও বিরোধের জন্ম দিতে পারে, বিশেষ করে আন্তঃসীমান্ত নদীসমূহের পানি বণ্টন প্রশ্নে আঞ্চলিক উত্তেজনা তৈরির প্রবল সম্ভাবনা বিদ্যমান৷ নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও নতুন বাস্তবতা আসন্ন। সাইবার নিরাপত্তা, এআইভিত্তিক সামরিক প্রযুক্তি, সমুদ্র নিরাপত্তা আগামী দিনের প্রধান ইস্যু হয়ে উঠতে পারে। ভারত মহাসাগরে কৌশলগত গুরুত্বের উত্থানে বিভিন্ন দেশের সামরিক উপস্থিতির সম্ভাবনাও কম নয়, যা একদিকে নিরাপত্তার আশ্বাস দিলেও অন্যদিকে প্রতিযোগিতা ও উত্তেজনার ঝুঁকি তৈরি করবে৷ অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে দক্ষিণ এশিয়ার সামনে বিশাল সম্ভাবনা থাকলেও রাজনৈতিক অবিশ্বাস, সীমান্ত বিরোধ তথা নিরাপত্তাহীনতা এমন সম্ভাবনার সম্মুখে প্রতিবন্ধক স্বরূপ৷ সব বিবেচনায় দক্ষিণ এশিয়ার বর্তমান পরিবর্তিত ভূরাজনীতি ভবিষ্যতে নতুন অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সুযোগ তৈরির সঙ্গে নতুন প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জও গড়ে তুলবে৷ এই অবস্থায় আঞ্চলিক রাষ্ট্রগুলোর জন্য দরকার সুস্থিতিশীল ও ভারসাম্যপূর্ণ একটি পররাষ্ট্রনীতির সঙ্গে পারস্পরিক সহযোগিতা এবং দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত পরিকল্পনা ও তার বাস্তবায়নের ওপর৷ মনে রাখা জরুরি, এই বৃহৎ অঞ্চলের জনগণ এখন কেবল দর্শক নয়, বরং তারা রাজনীতির মোড় ঘুরিয়ে দেয়ার দক্ষ সৈন্যবহর৷ তাই প্রয়োজন রাজনৈতিক স্বচ্ছতা ও ন্যায়বিচার কায়েম করা৷ নচেৎ যেকোনো বৃহৎ পরিবর্তন ঘটানো কেবলই সময়ের ব্যাপার৷ অতএব, দক্ষিণ এশিয়ার ভবিষ্যৎ তাই জনগণের প্রত্যাশা পূরণের ওপরও নির্ভরশীল৷ দক্ষিণ এশিয়ার আগামীর রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক স্থিতিশীলতা ও সমৃদ্ধ আজকের ভূরাজনৈতিক সিদ্ধান্তগুলোর ওপরই গড়ে উঠবে৷ অতএব, ছক সাজাতে হবে ভেবেচিন্তে; বিরোধ নয়, বরং পারস্পরিক রাষ্ট্রের সম্মান ও সম্প্রীতির বার্তার ওপর ভর করে৷
মোবারক হোসেন ছিলেন শহরের প্রান্তে ছোট একটি ব্যবসার মালিক। সারা জীবন হিসাবি, কিপ্টে ও আত্মকেন্দ্রিক মনোভাবের কারণে তাঁর সুনাম কখনো গড়ে ওঠেনি। ছেলেবেলায় তাঁর পরিবার অভাবী ছিল, কিন্তু মা-বাবা সব সময় চেষ্টা করতেন সন্তানদের প্রয়োজন পূরণ করতে। অথচ সেই মোবারক সামান্য টাকা জমাতে গিয়ে মা-বাবার ওষুধ কেনা থেকেও পিছপা হয়েছেন। আত্মীয়স্বজনের বিপদে কখনো একটি পয়সা দেননি, এমনকি বন্ধুবান্ধবের কাছ থেকে দূরে থেকেছেন কেউ ধার চেয়ে বসে এই ভয়ে। সময়ের সাথে সাথে মোবারকের ব্যবসা জমে উঠল। দোকান থেকে উপার্জিত টাকা তিনি ব্যাংকে জমাতেন, ফিক্সড ডিপোজিট করতেন, আর স্বর্ণ কিনে লুকিয়ে রাখতেন পুরোনো ট্রাংকে। কেউ জানত না তাঁর আসল সম্পদের পরিমাণ। অথচ নিজের বাড়িটাও পুরোনো, ফাটল ধরা দেয়ালে ভরা। সেখানেই থাকতেন একাকী, রান্নার কাজ করতেন নিজেই, যেন একটা ডিমও অপচয় না হয়। বয়স যখন ষাট পেরিয়েছে, তখন হঠাৎ একদিন সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি একটি বাগানবাড়ি বানাবেন শহরের বাইরে। শেষ বয়সে একটু খোলামেলা পরিবেশে থাকা যাবে, এই যুক্তি দেখিয়ে অনেক টাকা খরচ করলেন। বাড়িটি বানাতে গিয়ে বহু শ্রমিক, ইঞ্জিনিয়ার নিয়োগ দিলেন। মোবারক বাড়ির সব খরচ নিজ হাতে হিসাব রাখতেন। ঘরগুলো আধুনিক, দেয়ালে কাঠের কারুকাজ, বারান্দায় দোলনা — সবই পরিপাটি, নিখুঁত। কিন্তু তবুও কেউ ছিল না পাশে। তিন বছর পর ওই বাড়িতে গিয়ে থাকতে শুরু করলেন মোবারক। বড় গেট, ফুলে ভরা বাগান, হাঁটার পথ, বিশ্রামের ছায়া — সবই ছিল, কিন্তু সঙ্গী বলতে কেউ ছিল না। একদিন হঠাৎ অসুস্থ বোধ করলেন। গা কাঁপুনি, জ্বর, দুর্বলতা। স্থানীয় ডাক্তার প্রথমে পাত্তা দিলেন না। কিন্তু দিন পেরোতে না পেরোতেই বোঝা গেল সমস্যাটা গুরুতর। শহরে গিয়ে রক্ত পরীক্ষা করালেন। ধরা পড়ল প্যানক্রিয়াস ক্যান্সার, তৃতীয় স্টেজ। হাসপাতালে শুয়ে শুয়ে মোবারক প্রথমবারের মতো ভাবলেন, এই বিশাল বাড়ি, জমানো টাকা, ব্যাংক ব্যালেন্স — সবই কেমন অর্থহীন লাগছে! জীবন এতটাই ক্ষণস্থায়ী, অথচ তিনি সারা জীবন কাটালেন হিসেব কষে। বাবার জীবনের শেষ সময়ে একটা ইনহেলার কেনেননি, মায়ের চোখে ছানি অপারেশনের খরচ দিতে অস্বীকার করেছিলেন। ভাতিজার পড়াশোনার খরচ না দেয়ায় কলেজে ভর্তি হতে পারেনি ছেলেটি। আজ সেই মোবারকের পাশে কেউ নেই। এক সন্ধ্যায় হাসপাতালের জানালায় তাকিয়ে থাকতে থাকতে চোখ ভিজে উঠল তাঁর। ছোট একটি মেয়ে পাশের রোগীকে তার বাবাকে ফল খাওয়াচ্ছে। দৃশ্যটি তাঁকে মনে করিয়ে দিল, তাঁর একটাই দোষ, ‘ভয় আর অবিশ্বাসে ভরা এক হৃদয়’। তিনি ভালোবাসতে পারেননি, কাউকে বিশ্বাস করতে পারেননি, এমনকি কাছের লোকজনকেও সাহায্য করতে পারেননি। টাকা ছিল, হৃদয় ছিল না। মোবারক সেই রাতে একজন নার্সকে ডেকে বললেন, “একটা কাজ করে দেবে মা?” নার্স বলল, “বলুন কাকা।” তিনি বললেন, “এই চিঠিটা আমার এলাকার মসজিদের ইমাম সাহেবকে পৌঁছে দেবে। আর যদি আমি বেঁচে না থাকি, আমার ঘরের আলমারির ভেতর থেকে সব কাগজ ও টাকা আমার গ্রামের দরিদ্র লোকজনের জন্য ওয়াকফ করে দিয়ো।” চিঠিতে তিনি তাঁর কিপ্টামির স্বীকারোক্তি লিখেছিলেন। ক্ষমা চেয়েছিলেন মা-বাবার কাছেও। আর সব সম্পত্তি দিয়ে যেতে চেয়েছিলেন এতিমখানা, হাসপাতাল এবং গ্রামের দরিদ্রদের জন্য। দুদিন পর মোবারক হোসেন মারা গেলেন। কেউ খুব একটা কাঁদেনি, কিন্তু তাঁর চিঠি যখন প্রকাশিত হলো, তখন অনেকের চোখে পানি এসেছিল। এক কাপুরুষ, কিপ্টে মানুষ শেষ জীবনে বুঝেছিলেন, মানুষের জীবনের আসল সম্পদ টাকা নয়, বরং সম্পর্ক, সহানুভূতি আর উদারতা। তাঁর তৈরি বাগানবাড়িটি এখন এক বৃদ্ধাশ্রম, যেখানে অনাথ ও অসহায় বৃদ্ধরা বসবাস করেন। তাঁর কিপ্টে জীবনের শেষ অধ্যায়ে পাওয়া অনুশোচনাই হয়তো মানুষের জন্য বড় একটি প্রাপ্তি হয়ে রয়ে গেল — একটা নিঃশব্দ শিক্ষা।
চলতি বছরের আগস্টের শেষ দিকে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে বলে জানিয়েছেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম। তিনি আশা প্রকাশ করেন, আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে কেন্দ্রটির প্রথম ইউনিট থেকে ১,০০০ মেগাওয়াটেরও বেশি বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা সম্ভব হবে। অন্যদিকে নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেডের (এনপিসিবিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. মো. জাহেদুল হাসান জানিয়েছেন, কেন্দ্রটির প্রথম ইউনিট ২০২৭ সালের শুরুতে এবং দ্বিতীয় ইউনিট ২০২৮ সালের শুরুতে পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্যিক উৎপাদনে যাবে। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের নিরাপত্তা, কমিশনিং, পরিচালনাগত প্রস্তুতি এবং সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত নানা প্রতিবেদনকে কেন্দ্র করে জনমনে বিভিন্ন প্রশ্ন ও কৌতূহল তৈরি হয়েছে। এসব বিষয়ে ড. জাহেদুল হাসানের সঙ্গে কথা হলে তিনি কেন্দ্রটির নিরাপত্তা, পরিচালনা, আন্তর্জাতিক তদারকি কাঠামোসহ গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সম্পর্কে ব্যাখ্যা দেন। ড. জাহেদুল হাসান বলেন, একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র কোনো একক প্রতিষ্ঠানের সিদ্ধান্তে পরিচালিত হয় না। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে একাধিক স্বাধীন কারিগরি, নিয়ন্ত্রক ও নিরাপত্তা সংস্থার সমন্বিত তদারকির মাধ্যমে এর প্রতিটি ধাপ পরিচালিত হয়। তিনি জানান, বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন (বিএইসি) প্রকল্পের মালিক হিসেবে নির্মাণ চুক্তি বাস্তবায়ন এবং স্থাপনা গ্রহণের দায়িত্ব পালন করছে। নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেড আইন অনুযায়ী কেন্দ্রটির অপারেটিং অর্গানাইজেশন। কমিশনিং, নিরাপদ পরিচালনা, রক্ষণাবেক্ষণ এবং ভবিষ্যতে ডিকমিশনিং পর্যন্ত সব অপারেশনাল দায়িত্ব এনপিসিবিএলের ওপর ন্যস্ত। অন্যদিকে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ একটি স্বাধীন নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে আন্তর্জাতিক ও জাতীয় নিরাপত্তা মানদণ্ড অনুযায়ী প্রকল্পের প্রতিটি ধাপ মূল্যায়ন করে প্রয়োজনীয় লাইসেন্স প্রদান করছে। কমিশনিং কার্যক্রমের স্বাধীন কারিগরি মূল্যায়নের জন্য বিএইবিএ আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ভিও সেফটিকে এক্সপার্ট অর্গানাইজেশন হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে। এ ছাড়া রাশিয়ার সিআরইএ কমিশনিং, অপারেশনাল প্রস্তুতি, অপারেটর প্রশিক্ষণ এবং জ্ঞান স্থানান্তরে এনপিসিবিএলকে সহায়তা করছে। রাশিয়ার স্বাধীন নিয়ন্ত্রক সংস্থা Rostechnadzor গুরুত্বপূর্ণ কমিশনিং পর্যায়ে বিএইআরএর সঙ্গে প্রযুক্তিগত অভিজ্ঞতা বিনিময় করছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা বিভিন্ন Peer Review Mission ও Technical Review পরিচালনার মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রস্তুতি আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মানদণ্ড অনুযায়ী মূল্যায়ন করছে এবং প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিচ্ছে। ড. জাহেদুল বলেন, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত একাধিক জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের স্বাধীন কারিগরি মূল্যায়ন, নিয়ন্ত্রক অনুমোদন এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মানদণ্ড অনুসরণ করেই গ্রহণ করা হয়। এনপিসিবিএল এখনো দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় সক্ষমতা অর্জন করতে পারেনি—এমন সমালোচনার বিষয়ে ড. জাহেদুল বলেন, পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনার মূল ভিত্তি হলো দক্ষ জনবল ও শক্তিশালী নিরাপত্তা সংস্কৃতি। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, গত এক দশকে সরকার এ খাতে ব্যাপক বিনিয়োগ করেছে। শত শত প্রকৌশলী, অপারেটর, রিঅ্যাক্টর বিশেষজ্ঞ, রসায়নবিদ, বিকিরণ সুরক্ষা কর্মকর্তা, রক্ষণাবেক্ষণ প্রকৌশলী রাশিয়াসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছেন। তারা Full Scope Simulator, On-the-Job Training এবং Classroom Training-সহ আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ সফলভাবে সম্পন্ন করেছেন। তিনি আরও বলেন, প্রতিটি অপারেটরকে বিএইআরএর কঠোর লাইসেন্সিং ও মূল্যায়ন প্রক্রিয়া অতিক্রম করতে হয়। একই সময়ে সিআরইএর বিশেষজ্ঞরা কমিশনিং পর্যায়ে এনপিসিবিএলের কর্মীদের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করে আন্তর্জাতিক সর্বোত্তম চর্চা অনুযায়ী জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা স্থানান্তর নিশ্চিত করছেন। ফলেএনপিসিবিএল বর্তমানে প্রযুক্তিগত, অপারেশনাল ও প্রাতিষ্ঠানিক—সব দিক থেকেই দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনার জন্য একটি সক্ষম Operating Organization হিসেবে গড়ে উঠেছে। স্পেন্ট ফুয়েল (ব্যবহৃত পারমাণবিক জ্বালানি) ব্যবস্থাপনা এবং রাশিয়ার সঙ্গে এ বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত চুক্তি হয়নি—এমন আলোচনার প্রসঙ্গে ড. জাহেদুল বলেন, আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শিল্পের প্রচলিত পদ্ধতি সম্পর্কে সীমিত ধারণার কারণেই এ ধরনের বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছে। তিনি জানান, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক সংস্থা রোসাটমের মধ্যে চুক্তি ইতোমধ্যে স্বাক্ষরিত হয়েছে। এর পাশাপাশি বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন ও টিভিইলের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি পারমাণবিক জ্বালানি সরবরাহের ফ্রেমওয়ার্ক এগ্রিমেন্ট বিদ্যমান রয়েছে। তিনি আরও বলেন, আইএইএর নিরাপত্তা নির্দেশিকা অনুযায়ী ব্যবহৃত পারমাণবিক জ্বালানি রিঅ্যাক্টর থেকে অপসারণের পর তাৎক্ষণিকভাবে অন্য দেশে পাঠানো হয় না। প্রথমে কেন্দ্রের নকশার অংশ হিসেবে নির্মিত স্পেন্ট ফুয়েল পোলে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত নিরাপদে সংরক্ষণ ও শীতলীকরণ করা হয়, যা বিশ্বের সব আধুনিক পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রেই অনুসরণ করা হয়। পরবর্তীতে বিদ্যমান আন্তঃরাষ্ট্রীয় চুক্তি, বাণিজ্যিক ব্যবস্থা এবং সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষের অনুমোদনের ভিত্তিতে পরবর্তী ব্যবস্থাপনা সম্পন্ন হয়। উল্লেখ্য, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পে রাশিয়ার ভিবিইআর-১২০০ মডেলের তৃতীয় প্রজন্মের দুটি রিয়্যাক্টর স্থাপন করা হচ্ছে। প্রতিটি ইউনিটের উৎপাদন ক্ষমতা ১,২০০ মেগাওয়াট। দুটি ইউনিট চালু হলে কেন্দ্রটির মোট উৎপাদন ক্ষমতা হবে ২,৪০০ মেগাওয়াট। সংশ্লিষ্টদের মতে, রিয়্যাক্টরগুলো আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মানদণ্ড পূরণে সক্ষম। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক সংস্থা রোসাটম।
আকাশের নীলে কীবা কবিতার মিলে না গোলাপের সুরভিতে ডানা মেলা চিলে না। গোধূলির রং এসে সন্ধ্যায় যায় মেশে কোথাও তো নেই তুমি গল্পের শুরু-শেষে। চাদরের আদরে না না ভোরের রবিতে না শিমুল কোলে থাকা কোকিলের ছবিতে। রিমঝিম টুপটাপ বরষার ছন্দে তোমাকেই খুঁজে পাই কামিনীর গন্ধে।
অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়েছে পৃথিবীর ভাগ্যাকাশ শুরু হয়েছে একের পর এক দুর্যোগ, দুর্ভিক্ষ; মহামারি চলছে পাল্লা দিয়ে। বর্ণাঢ্য আয়োজনে পশুত্ব গিলছে মনুষ্যত্ব অ-অনুমেয়— কতটা লম্বা মৃত্যুর মিছিল? অশান্ত, ভীষণ প্রকৃতি এখন। ধৈর্য, সহনশীলতার হয়েছে অকালমৃত্যু দানবীয় শক্তিতে জ্বলে উঠেছে আগ্নেয়গিরি। বিষাক্ত বিষ উদগিরিত হচ্ছে গলগলিয়ে লাভার তাপে অঙ্গার হলো পাখির নীড়। এমন দুর্যোগকালীন সময়ে তোমাকে ভীষণ প্রয়োজন, কবিতা। কেবল তুমিই জানো স্বার্থের বেড়া ভেঙে প্রেমের কুটির রচনার মন্ত্র। তুমিই পারো ধ্বংসস্তূপকে রূপ দিতে শৈল্পিক। এমন ধবধবে ভূতুড়ে দিনে তোমাকে ভীষণ প্রয়োজন, কবিতা। তোমার জাদুকরি শব্দরাই পারবে মোহের ঝকমকি সরিয়ে জাগ্রত পতাকা ওড়াতে। তোমার আগুনঝরা কথা স্ফুলিঙ্গের মতো ঘুরবে কালের আকাশে।
পিঠে পেট ঠেকেছে, তবু আনন্দ-বেসাতির কমতি নেই রোদে পুড়ে ঝড়-বৃষ্টিতে ভিজে একটা মানুষ জীবন-যুদ্ধে লড়ে যায় অহর্নিশি প্রসন্নতার আলপথে খোঁজে কষ্টের সুখ চোখের দীপ্র জ্যোতিতে প্রিয় সন্তানের মুখ কষ্টের টানাপোড়েনেও বাবা যেন সাঁকো বাঁধা সেতু- জীবন-নদীর দুই তীর অপত্য স্নেহে আগলে বেঁধে রাখে। নদীর স্রোত কোথাও খরস্রোতা, কোথাও ধীর লয় রোদে পুড়ে, ঝড়-বৃষ্টিতে ভিজে পরিশ্রমী বাবারা এমনই বহমান নদী।