কল্পনার আকাশ সীমাহীন। যেন এক মহাসমুদ্র। চিত্রকল্প এর ঐশ্বর্য। তীব্র অনুভূতির সৌন্দর্য। একটি নান্দনিক কবিতায় থাকে নানা রকম বৈচিত্র্যের সমাহার। থাকে গোধূলির মায়া। দিগন্তের হাতছানি। আকাশের নীল। সমুদ্রের গর্জন। শরতের মেঘ। বৃষ্টির শব্দ। হেমন্তের হাসি। বসন্তের প্রজাপতি। নিসর্গের মায়া। এসবই একজন কবির চিত্রকল্পের ক্যানভাস। চিত্রকল্প একেবারেই যে অনিবার্য তা হয়তো না। চিত্রকল্প ছাড়াও কবিতা জনপ্রিয় হতে পারে। কিন্তু আধুনিক কবিতার দাবি ভিন্ন। চিত্রকল্প ছাড়া আধুনিক কবিতা অনেকটা অসম্পূর্ণ। চিত্রকল্পকে মনে করা হয় কবিতার প্রাণ। এটা কল্পনার রঙিন ছবি। শব্দের অপূর্ব বিন্যাস। কবির উপলব্ধি যখন মূর্ত হয়ে ওঠে, তখনই সৃষ্টি হয় চিত্রকল্প। ইংরেজিতে বলে ইমেজ। বাংলায় শব্দের জাদু। চিত্রকল্প আত্মার সংকেত। একধরনের ইশারা। অলংকারের নিপুণ কারুকাজ। তুলনার ঊর্ধ্বে এর অবস্থান। উপমা শব্দের অংশ মাত্র। চিত্রকল্প বিষয়ের নির্যাস। এক চিত্র থেকে অন্য চিত্রে উত্তরণ ঘটে অনায়াসে। ভালো কবিতায় প্রেম-বিরহ, দুঃখ-বেদনা, হাসি-আনন্দ সবই চিত্রকল্পময় হয়ে ওঠে। এটি প্রত্যক্ষ ও পারোক্ষ হতে পারে। পরোক্ষ চিত্রকল্প পাঠক হৃদয় দিয়ে অনুভব করে। এটি সার্থক কবিতার শ্রেষ্ঠ গুণ। উপমার আড়ালে লুকানো ছবি। অব্যক্ত কথার আড়ালে গভীর কথা। মিথের অপূর্ব মেলবন্ধন। চিত্রকল্প যেন স্বপ্নের রাজ্য। সত্যের সাথে স্বপ্ন মিশে একাকার। কবি স্বপ্নদ্রষ্টা হয়ে ওঠেন। তিনি দেখেন অতীতের ধূসর ছায়া। দেখেন ভবিষ্যতের উজ্জ্বল আলো। তাঁর ভাবনায় উজ্জল হয়ে ওঠে অনাগত দিনের সুর। তিনি প্রচলিত ছক ভেঙে লেখেন। অজানার ডাকে ছুঁয়ে যান নতুন দিগন্ত। সত্যের জয়গান গাইতে হয় অমোঘ সুরে। আর তখনই কবিতার শক্তি হয় অমর, অজেয়। চিত্রকল্পের রূপান্তর ঘটে অবিরাম। সময় বদলে যায়। আঙ্গিক পাল্টে যায়। শব্দের ব্যবহার হয় আধুনিক। ছন্দের চলন হয় নতুন ছন্দে। এই বদল স্বাভাবিক। একে মেনে নিতে হয়। শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি চিরকাল সবার প্রিয়। সময়কে জয় করাই শিল্পের চূড়ান্ত সাফল্য। কবিতা সেই ধ্রুবতারা, যা অন্ধকারে পথ দেখায়। জীবনের বাতিঘর। কবিতা শুধু শব্দের কারুকাজ নয়, এটি জীবন দর্শন। অমরত্বের স্বপ্ন। চিরন্তন সত্যের আলো, আর চিত্রকল্প এর আত্মা। বিচিত্র ভাবনার জগতে বাস করেন একজন কবি। তিনি তাঁর সময়কে উপেক্ষা করতে পারেন না। চারপাশের যন্ত্রণার দহন। শোষিতের আর্তনাদ। বেদনার অশ্রু। স্বপ্নভঙ্গের বেদনা। শাসকের অহংকার। পাহাড়ের মায়া। রাতের নির্জনতা। অমানবিকতার অন্ধকার - সবই তিনি দেখেন। অনুভব করেন। কবিতায় ধারণ করেন। চিত্রকল্পের অসীম প্রান্তরে কবির বিচরণ। কল্পনার এই অলৌকিক শক্তি জন্ম দেয় কালজয়ী কবিতা। চিত্রকল্প ছাড়া কবিতা প্রায় প্রাণহীন। কল্পনাই কবিতার শক্তি। শুধু চিত্রকল্পই না, কবিতার ভাষা ও বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ। চিত্রকল্পা ভাষা ও বিষয়ের অনন্য সমন্বয়ে নির্মিত হয় এক নান্দনিক কবিতা। তা না হলে কবিতার সৌন্দর্য হারায়। ভালো কবিতার জন্য প্রয়োজন চিত্তের শুদ্ধতা। হৃদয়ের গভীরতা। অলংকারহীন কবিতা পাথরের মতো প্রাণহীন। আধুনিক পাঠক সচেতন। তাঁরা কবিতায় চিত্রকল্প দেখতে চান। চিত্রকল্প একটা কবিতাকে কাল থেকে কালান্তরে নিয়ে যায়। এর সঙ্গে প্রয়োজন ছন্দ ও শব্দের ব্যঞ্জনা। ছন্দ মানেই গতি। অসীমের পথ। রবীন্দ্রনাথ গদ্য ছন্দের অমর স্রষ্টা। তাঁকে বলা হয় গদ্য কবিতার আলোর মশাল। তিনি অন্তমিলের শেকল ভাঙেন। কবিতায় আনেন মুক্তক ছন্দ। ছন্দ থেকে কবিতাকে মুক্তি দিয়ে সৃষ্টি করেন গদ্যের নতুন জগৎ। মৃদু ঢেউয়ের মতো গদ্যের দোল থাকে। একেই বলে কবিতার প্রবহমানতা। এখানে অবাধ স্বাধীনতা। পাখির মতো উড়ে চলা। নীল আকাশের মতো আবেগের জোয়ার। ধ্বনি, পর্বের বন্ধন ও আলোর খেলা। কল্লোল যুগের কবিরা তো বরীন্দ্রনাথেরে বিরুদ্ধে ছিলেন। শেষ পর্যন্ত তাঁরাও রবীন্দ্রনাথের দেখানো পথে গদ্য কবিতা লেখেন। কবিরা হয়ে ওঠেন ভাষার সার্বভৌম রাজা। বাংলা কবিতা পেল ভিন্নমাত্রা। শুরু হলো গদ্য কবিতার জয়যাত্রা। কিন্তু গদ্য অথবা পদ্য, ছন্দ অথবা ছন্দহীন যে কবিতাই হোক না কেন, চিত্রকল্প এর এমন এক ঐশ্বর্য, যা কবিতাকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়। কবিতায় গুরুচণ্ডালী ভাব যেন না থাকে, সেদিকটায় সতর্ক থাকতে হয়। তবে কখনো কখনো সাধু-চলিতের মিশ্রণ হতে পারে, যদি তা ছন্দ ও কবিতার সৌন্দর্য রক্ষায় অপরিহার্য হয়। সাধারণত কবিতা হয় প্রতীকী। এখানে রূপকের গভীর ইশারা থেকে। গভীর অর্থের আড়ালে লুকিয়ে থাকে আরেক অর্থ। কবির গভীরতম অনুভব চিরকাল সুন্দর, যা পৃথিবীকে করে আরও সুন্দর। মানুষকে করে আরও মানুষ। কবিতার এই জয়যাত্রা চলুক অনন্তকাল। কবি হোক শব্দের জাদুকর। কবির চিত্রকল্পের জাদুতে মোহিত হোক পৃথিবী।
‘মেঘদূত’ আনুমানিক ৩৫০ খ্রিস্টাব্দে মহাকবি কালিদাস রচিত একটি কাব্য। এটি সংস্কৃত ভাষায় রচিত হওয়ার কারণে অনেকের কাছেই এর পাঠ কিছুটা দুর্বোধ্য। তাই অসাধারণ এ সাহিত্যকর্মের অর্থ বিশ্লেষণ নিয়ে বিভ্রাট এড়াতে বিভিন্ন সাহিত্যিক এই কাব্যের অনুবাদ করেন। তাঁদের মধ্যে বুদ্ধদেব বসু, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর, রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায়সহ বহু গুণী কবি-সাহিত্যিক বহুরূপে ‘মেঘদূত’ অনুবাদ করেছেন। এ কাব্যের প্রতিটি অনুবাদের রয়েছে নিজস্ব বৈচিত্র্যময় আবেদন। এটি যে ভাষাতেই লেখা হোক না কেন, প্রাচীন সাহিত্যের কালজয়ী এই লেখাটির ভাবগাম্ভীর্য ও তাৎপর্য ছিল অনিন্দ্যসুন্দর। ঋতুবৈচিত্র্যে বর্ষা ফিরে আসে বারবার। নবরূপে জেগে ওঠে প্রকৃতি। গাছে থোকায় থোকায় কদম ফুল ফোটে। ঝুম বৃষ্টি কিংবা মেঘলা দিনে হঠাৎ করেই আমাদের মন কেমন যেন উদাস হয়ে ওঠে। আষাঢ়ের মেঘ-বৃষ্টি, প্রিয় মানুষটির কথা মনে করিয়ে দেয় বারবার। প্রযুক্তিগত সুবিধার কারণে এখন আমরা আমাদের প্রিয় মানুষের সাথে মুহূর্তেই মনের আবেগগুলো শেয়ার করতে পারি। হৃদয়ের কথা মুহূর্তে পৌঁছে যায় প্রিয় মানুষটির কাছে। কিন্তু ধরুন মুঠোফোন বা ফেসবুক, ম্যাসেঞ্জার যদি না থাকত, তাহলে কী করতেন? কী করে জানাতেন তখন এই পাগল করা আষাঢ়ের রূপ দেখে প্রিয় মানুষটিকে আপনার মনের কথা? বর্ষার বৃষ্টিস্নাত দিনগুলো প্রকৃতির সাথে সাথে মানুষের মনেও যোগ করে নতুন মাত্রা। তাই বর্ষাকে ঘিরে যুগে যুগে কবি-সাহিত্যিকরা রচনা করেছেন দারুণ সব কবিতা, গান, গল্প ও উপন্যাস। বহু বছর আগে আষাঢ়ের এমনই এক দিনে প্রেয়সীর কাছে বার্তা পাঠানোর আকুলতাকে ঘিরে মহাকবি কালিদাস রচনা করেছেন বর্ষাকাব্য ‘মেঘদূত’, যা সংস্কৃত সাহিত্যের গণ্ডি পেরিয়ে বিশ্বের বহু ভাষা, সাহিত্য ও মানুষের হৃদয় গহিনে জায়গা করে নিয়েছে। আর ‘মেঘদূত’-এ অত্যন্ত চমৎকারভাবে ফুটে উঠেছে বর্ষায় মানব মনের গভীর আকুলতা। মূলত বিরহ, অপেক্ষা আর প্রেয়সীর কাছে মনের কথা বা বার্তা পাঠানোর আকাঙ্ক্ষাকে ভিত্তি করেই রচিত হয়েছে অসাধারণ এ কাব্য। 'মেঘদূত’ কাব্যের মূল চরিত্রে আছে যক্ষ এবং তার পত্নী। তাদের নিবাস অলকা নগরীতে। যক্ষ ছিল রাজা কুবেরের সেবায় নিয়োজিত এক সেবক। সে ধনপতি কুবেরের বাগান দেখাশোনা করত। কিন্তু একদিন যক্ষ বাগান অরক্ষিত রেখে তার স্ত্রীর কাছে গেলে হাতির পাল সেই বাগানে ঢুকে বাগান নষ্ট করে দেয়। আর এ কারণে যক্ষ তার প্রভু কুবেরের সাজাপ্রাপ্ত হয়ে এক বছরের জন্য নির্বাসিত হয় রামগিরিতে। প্রিয়ার বিরহে যক্ষের নির্বাসিত সময় কাটতে থাকে রামগিরিতে। ঋতু পাল্টে আসে আষাঢ় মাস। আষাঢ়ের প্রথম দিবসে মেঘের আগমনে প্রকৃতির নিয়মেই যক্ষের মন ব্যাকুল হয়ে ওঠে তার প্রিয়ার জন্য। বিরহী যক্ষ তখন মেঘের কাছে অনুনয় জানায়, তার মনের গভীরে থাকা কথা অলকা নগরীতে তার প্রিয়ার কাছে পৌঁছে দেয়ার জন্য। আর যক্ষ প্রিয়ার কাছে মেঘকে দূত করে বার্তা পাঠানোর কাহিনিকে উপজীব্য করেই রচিত হয়েছে মহাকবি কালিদাস রচিত সংস্কৃত সাহিত্যের বহুল সমাদৃত কাব্য ‘মেঘদূত’। বিশিষ্ট কবি কালিদাস ‘মেঘদূত’ কাব্য রচনা করেছেন ১১৮টি শ্লোকে এবং তা দুটি খণ্ডে ভাগ করেছেন; উত্তরমেঘ ও পূর্বমেঘ। পূর্বমেঘের প্রথম অংশে মেঘদূত কাব্যের ঘটনাপ্রবাহের শুরু, এই অংশেই দেখা মিলবে মেঘদূত কাব্যের নায়ক যক্ষের সাথে। এরপর পর্যায়ক্রমে এসেছে তার প্রেয়সী ও অলকা নগরীর কথা। সদ্য বিবাহিত যক্ষ আর তার পত্নীর নিবাস অলকা নগরীতে। এরপর কাহিনির মোড় নিতে আগমন হয়েছে যক্ষের প্রভু ধনদেবতা কুবেরের। ঘটনাপ্রবাহে যক্ষ নির্বাসিত হয় রামগিরিতে। আর এখান থেকেই গল্পের মূল অংশ। নির্বাসিত যক্ষ রামগিরি থেকে অলকা নগরীতে তার প্রিয়ার কাছে বার্তা পাঠানোর জন্য মেঘের কাছে জানায় আকুল আবেদন। এ ঘটনা প্রবাহের বিপরীতে পূর্বমেঘের মূল আকর্ষণ হচ্ছে রামগিরি থেকে অলকা নগরীর মেঘের যাত্রাপথের বর্ণনা। মেঘ যখন যক্ষের বার্তা নিয়ে অলকা নগরীর দিকে যাবে, সেই যাত্রাপথের সৌন্দর্য বর্ণিত হয়েছে কাব্যের শ্লোক ১৬ থেকে ৬৪ পর্যন্ত। পূর্বমেঘের এই অংশে অলকা নগরীর যাত্রাপথের সৌন্দর্য বর্ণনা দিতে কবি ব্যবহার করেছেন অনিন্দ্যসুন্দর সব উপমা আর ফুটিয়ে তুলেছেন রামগিরি থেকে অলকা নগরী পর্যন্ত অখণ্ড ভারতের অসাধারণ রূপ। পূর্বমেঘ পড়তে গিয়ে চোখের সামনে ভেসে উঠবে অলকা নগরীর যাত্রাপথে উজ্জয়নী, অবন্তি অথবা বিদিশা নগরীর দৃশ্য; কিংবা কানে বেজে উঠবে রেবা, শিপ্রা ও বেত্রবতী নদীর বহমান জলধারার কলকল ধ্বনি এবং ভেসে আসবে নদীতীরের ভুঁইচাপা ফুলের সুবাস। আবার ‘পূর্বমেঘ’ পড়তে পড়তে সন্ধ্যা নামতে পারে বিন্ধ্য, কৈলাস কিংবা দেবগিরি পাহাড় চূড়ায়। আবার কখনো হারিয়ে যাওয়ার সাধ জাগে মেঘের যাত্রাপথের কেতকী বনে। পথিমধ্যে দেখা মিলবে আনন্দিত চাতকের দলের সাথে। আর বইয়ের পরতে পরতে মুগ্ধতা ছড়াবে বর্ষার স্নিগ্ধ সতেজ কদমগুচ্ছ ফুলের সৌরভ। এরপর উত্তর মেঘের বর্ণনায় বহু নগর, পাহাড়, নদী আর বন পেরিয়ে মেঘ পৌঁছায় অলকা নগরীতে। পূর্বমেঘজুড়ে অলকা নগরীর যাত্রাপথের বর্ণনা শেষ হওয়ার পর দেখা মেলে যক্ষপ্রিয়ার বাড়ির। উত্তর মেঘের বর্ণনায় পাঠকের মানসপটেও সেই বাড়িটি ভেসে উঠবে অবিকলভাবে। মেঘ যখন কুবেরের বাড়ি পৌঁছবে, তখন দেখা মিলবে বাড়ির পাশের উঠোনে থাকা মন্দার গাছটির। আর কিছুদূর পাশেই আছে পান্নাশোভিত চমৎকার একটি হ্রদ, যেখানে তখন ভেসে বেড়াবে হাঁসের দল আর নীলকান্তমণি শোভিত পদ্মের কাণ্ডে ছেয়ে থাকবে সেই পুরো হ্রদ। এভাবেই অলকাপুরী আর যক্ষের বাসগৃহের বর্ণনার পর দেখা মিলবে যক্ষপ্রিয়ার। হালকা গড়নের ঈষৎ শ্যামলা বর্ণ; এমনভাবেই তার রূপের বর্ণনা শুরু হয়েছে। এরপর বহু উপমা আর রূপে রঞ্জিত হয়েছে যক্ষপ্রিয়া। শুধু সৌন্দর্যের বর্ণনাই নয়, যক্ষের বিরহে বিনিদ্র রজনী পার করে যক্ষপ্রিয়ার মলিন দশাও বর্ণিত হয়েছে এক দারুণ ভঙিমায়। এরপর মেঘ পৌঁছে যায় যক্ষপ্রিয়ার কাছে এবং তাকে পৌঁছে দেয় বহু প্রতীক্ষিত যক্ষের বার্তা। এভাবেই প্রেয়সীর কাছে যক্ষের বার্তা পৌঁছানোর মধ্য দিয়েই ‘মেঘদূত’ কাব্যটি তার নামের সার্থকতা পায়। প্রিয়তমার প্রতি ভালোবাসার এক উজ্জ্বল নিদর্শন অনবদ্য এক মনোমুগ্ধকর সৃষ্টি, মহাকবি কালিদাসের কালজয়ী এই মহাকাব্য ‘মেঘদূত’ যেমন সমাদৃত হয়েছে সাহিত্যাঙ্গনের সর্বক্ষেত্রে, তেমনি পাঠক হৃদয় জয় করেছে যুগে যুগে, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে।
বাংলা ভাষা ও সাহিত্য আজ আর প্রাচীনকাল বা মধ্যযুগের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। আধুনিক যুগ ছাড়িয়ে উত্তর-আধুনিক যুগে প্রবেশ করেছে বেশ আগে। অনেক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের অনেক পরিবর্তন ঘটেছে। সময়ের পরিক্রমায়, মন-মননের চিন্তাভাবনা ধ্যানধারণায় বৈশ্বিক মেরুকরণের আবর্তনে বা বিবর্তনে সগৌরবে মর্যাদার আসনে আসীন। যেখানে পরিবর্তনই সময়ের ধর্ম, বিপর্যয়ও সেখানে মহিমান্বিত। হোক গদ্য কিংবা পদ্যের ভাষা; ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাস সবিস্তর। শাসন-শোষণে ঔপনিবেশিক হিংস্রতার পরিমাণ অপরিমেয়। ধ্বংসযজ্ঞের করুণ পরিণতি সীমাহীন। বাঙালির রক্তে ভেজা মাটি সাত সমুদ্রের মতো। প্রবল বন্যায় সবকিছু যেমন ভাসিয়ে নেয় কিংবা ভূমিকম্পের তীব্রতায় অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং বস্তুগত-অবস্তুগত তথা প্রাণের বিপর্যয় ঘটে, অস্তিত্ব মুখথুবড়ে পড়ে, সেখানে শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি অক্ষত থাকার চিন্তা বাহুল্য। মূল কথা হলো, প্রাকৃতিক দুর্যোগ আর কৃত্রিম দুর্যোগ বিপর্যয়ের চরম ধ্বংসাত্মক শক্তির দুই ভাই। এক ভাইয়ের আক্রমণে কিছু থাকে তো আরেক ভাইয়ের আক্রমণে স্বাতন্ত্র্য ও স্বকীয়তার বারোটা বাজে। বাংলার সংস্কৃতি ও বাংলা গদ্যের বেলায়ও ঠিক তেমন। বিজাতি বা বিভাষী হলো দুর্যোগ, কিন্তু দুর্যোগেরও একটা উপকারী দিক থাকে। যেখানে উর্বরতা বাড়ে, সেখানে ফসল ফলানোও যায় ভালো। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম নয়। বিজাতীয় ভাষা বাংলাদেশের ভাষা ও সংস্কৃতিতে কী পরিমাণ অবদান রেখেছে, সেটা সাহিত্যের আদিমতম ইতিহাস বিচার-বিশ্লেষণ করলেই বোঝা যায়। তাই দুর্যোগের পরও কিছু নতুনত্ব থাকে। এই রূপান্তরের বিবর্তন পর্যায়ক্রমে জ্ঞাত হওয়া যায় ভাষা ও সাহিত্যের আদি গ্রন্থগুলোর পণ্ডিতদের মতামত ও বিভেদের আলোচনা-সমালোচনা থেকে। বাংলা ভাষার প্রধান বৈশিষ্ট্য বা গুণ সহজ-সরল, সাবলীল, প্রাঞ্জল, অসংযতহীন ও ধ্বনিমাধুর্য লক্ষ করা গেলেও পরবর্তী সময়ে বাংলা গদ্যে দুর্বোধ্যতা ও জটিলতা পরিলক্ষিত হয়; যার প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল পাশ্চাত্য প্রভাব আর বিজাতি ও বিভাষীয় ক্ষমতার প্রভাবে বাংলা ভাষার প্রাণস্পন্দন, শেকড় বা নাড়ির টানের ব্যবচ্ছেদ। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ইতিহাস চর্যাপদ থেকে ধরা হলেও শুভযাত্রা তারও অনেক পরে। মহেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায় ও রামগতি ন্যায়রত্নের ‘বঙ্গ ভাষার ইতিহাস’ ও ‘বাঙলা ভাষা ও সাহিত্য বিষয়ক প্রস্তাব’ গ্রন্থ দুটিকে পুস্তকাকারে প্রকাশ করলে কোনটি বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের প্রথম আলোচিত গ্রন্থ, তা নিয়ে মতভেদ লক্ষ করা যায়। তবে সপ্তম শতাব্দীতে বাংলা ভাষায় লেখার শিরোপা বা মুকুট চর্যাপদের লেখক মীননাথকেই দিতে হয়। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ইতিহাস সম্পর্কিত প্রথম উল্লেখযোগ্য কয়েকটি গ্রন্থ পদ্মনাভ ঘোষাল ও অবিনাশচন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের ‘গৌড়ীয় ভাষাতত্ত্ব’ (১৮৭৫), রাজনারায়ণ বসুর ‘বাঙ্গালা ভাষা ও সাহিত্য বিষয়ক বক্তৃতা’ (১৮৭৮), হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর ‘বর্তমান শতাব্দীর বাঙ্গালা সাহিত্য’ (১৮৮১) এবং দীনেশচন্দ্র সেনের ‘বঙ্গভাষা ও সাহিত্য’ (১৮৯৬) প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। এসব গ্রন্থের আলোচনা-সমালোচনার মাধ্যমে এবং নানা মতভেদের আলোকে বলা যায়, বাংলা গদ্য সাহিত্যের যাত্রা উনিশ শতক থেকে শুরু হয়েছিল। অনেকে বাংলা গদ্যের অস্তিত্ব খুঁজে পেয়েছেন ষোড়শ শতাব্দীতে ‘বাংলা সাহিত্য’ সূচনার মাধ্যমে। আবার কেউ কেউ বলেন বৈষ্ণব সাধনতত্ত্ব বিষয়ক গদ্যগ্রন্থকে। বিদ্যাপতি ও চণ্ডীদাসকে বাংলা গদ্যের আদি লেখক বলা হলেও মতভেদ রয়েছে। ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ প্রতিষ্ঠার পূর্ববর্তী কালকে সজনীবাবু অন্ধকার যুগ বলেছেন। রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে অন্ধকার যুগে হয়তো তেমন কোনো সাহিত্যকর্মের নিদর্শন পাওয়া যায়নি বটে, কিন্তু তার পরও এই সময়ে প্রাপ্ত ও রচিত প্রধান সাহিত্য ও নিদর্শনগুলোর মধ্যে রয়েছে ডাক ও খনার বচন, প্রাকৃতপৈঙ্গল, শূন্যপুরাণ ও সেকশুভোদয়া। সজনীবাবু নবম শতাব্দী সময়কাল বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে গদ্যের অভাববোধ করেছেন। যদিও পর্তুগালের লিসবনে প্রথম বাংলা গদ্যগ্রন্থ ‘কৃপার শাস্ত্রের অর্থভেদ’ (১৭৪৩) মুদ্রিত হয়। ষোড়শ শতাব্দী থেকে ধারাবাহিকভাবে বাংলা গদ্য সাহিত্য ভাব ও কাজের গদ্য নিদর্শন প্রতীয়মান। কারণ, এ সময় বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষক হিসেবে সুলতানি আমলের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে। ষোড়শ ও সতেরো শতকে সুলতানি আমলে নবাবদের মৌঠুহর অঙ্কিত বাংলা লেখায় জয়পুত্রের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। এ ছাড়া একই শতাব্দীতে আসাম, ত্রিপুরা ও কাছাড়ের মতো রাজ্য বা প্রদেশের সরকারি কাজকর্মের ভাষাও ছিল বাংলা, যা মহারাজ নারায়ণের পত্রেও দেখা গেছে। এ কথা বলতে কোনো দ্বিধা নেই যে, প্রাচীন বাংলা গদ্য সাহিত্য আধুনিক বাংলা গদ্য সাহিত্যকে বিকশিত করেছে। বাংলা গদ্যের এই বিকাশকে ত্বরান্বিত করেছে মধ্যবিত্ত সমাজের আত্মবিকাশে এবং জীবন জিজ্ঞাসার তাড়নায়। প্রাথমিক পর্যায়ে প্রাচ্য নয়, পাশ্চাত্য উচ্চশিক্ষিত তরুণদের যুক্তিনিষ্ঠ চিন্তাভাবনা, চেতনা, ভাবের গভীরতা ও ভাবের বাহনই ছিল গদ্য। গদ্য যুক্তি, তর্ক-বিতর্ক, তর্ক-বিবাদ, বিচার-বিশ্লেষণের ভাষা, আর পদ্য আবেগ, অনুভূতি, উচ্ছ্বাস ও কল্পনার ভাষা। বাংলা গদ্যের বিকাশে পয়ার ছন্দের একটা আধিপত্য ছিল। অন্যদিকে গদ্য-পদ্যরীতিতে সাম্যভাবমূলক মিলন দেখা যায়, যার মাধ্যমে আখ্যায়িকা বিবৃতি, প্রথাবদ্ধ দেবার্চনা বর্ণনা, বাদপ্রতিবাদ ও কথোপকথন প্রভৃতি কাব্যাঙ্গে নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে, যা কাব্যোৎকর্ষের মানদণ্ড হিসেবেই উল্লেখ করা হয়। এটা গুণগত দিক থেকে মানসম্মত না হলেও এর উপযোগিতা অসাধারণ ও অসামান্য।, যা কাব্যজগতের ত্রিশংকু কবিতার স্বর্গ এবং গদ্যের মর্ত্য বলেই বিবেচিত। রেনেসাঁসের আগে ইউরোপের কোথাও পুরোপুরি সাহিত্যিক গদ্যের বিকাশ ঘটেনি। ষোড়শ ও সপ্তদশ শতকের প্রথমার্ধের ইংরেজি সাহিত্যে সাহিত্যিক গদ্য ছিল না। ইংরেজি সাহিত্যে গদ্যের পূর্ণ বিকাশ ঘটে সপ্তদশ শতাব্দীতে ড্রাইডেনের হাতে, তা-ও পদ্য সাহিত্য মারফতে। এর আগে শেকসপিয়ার ও বেকনের গদ্যটাও ছিল কাব্যগদ্য। এরই ধারাবাহিকতায় ধীরে ধীরে প্রসার ঘটতে থাকে মুদ্রাযন্ত্রের ইংল্যান্ডের হাত ধরেই। ফলে গদ্যের পথ প্রসারিত হতে থাকে। উন্মুক্ত হতে থাকে। প্রসার ছড়িতে পড়তে থাকে ইন্টারনেটের মতো বিশ্বব্যাপী। স্বাধীন বাংলাদেশের গদ্যের বিকাশও স্বাভাবিকভাবে এর আওতাধীন হয়ে পড়ে। মুদ্রণ ও পুস্তক ব্যবসার যাত্রা শুরু হয়। আলতুস, মানুটিয়াস, প্রথম ফ্রান্সিস নাভাবের রানি, মার্ঘারেটের মতো ব্যক্তিরা তখন খ্যাতি অর্জন করেন। তাঁদের মধ্যে মার্গারেট ইতালির স্টাইলে রচনায় উদ্বুদ্ধ করতেন, যা পরে ফরাসিরা লুফে নেন। ফরাসি গদ্যের নবদিগন্তের দ্বার উন্মোচিত হয়। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও বাংলা সাহিত্যে গদ্যের প্রসার লাভ করতে থাকে।
মোবারক হোসেন ছিলেন শহরের প্রান্তে ছোট একটি ব্যবসার মালিক। সারা জীবন হিসাবি, কিপ্টে ও আত্মকেন্দ্রিক মনোভাবের কারণে তাঁর সুনাম কখনো গড়ে ওঠেনি। ছেলেবেলায় তাঁর পরিবার অভাবী ছিল, কিন্তু মা-বাবা সব সময় চেষ্টা করতেন সন্তানদের প্রয়োজন পূরণ করতে। অথচ সেই মোবারক সামান্য টাকা জমাতে গিয়ে মা-বাবার ওষুধ কেনা থেকেও পিছপা হয়েছেন। আত্মীয়স্বজনের বিপদে কখনো একটি পয়সা দেননি, এমনকি বন্ধুবান্ধবের কাছ থেকে দূরে থেকেছেন কেউ ধার চেয়ে বসে এই ভয়ে। সময়ের সাথে সাথে মোবারকের ব্যবসা জমে উঠল। দোকান থেকে উপার্জিত টাকা তিনি ব্যাংকে জমাতেন, ফিক্সড ডিপোজিট করতেন, আর স্বর্ণ কিনে লুকিয়ে রাখতেন পুরোনো ট্রাংকে। কেউ জানত না তাঁর আসল সম্পদের পরিমাণ। অথচ নিজের বাড়িটাও পুরোনো, ফাটল ধরা দেয়ালে ভরা। সেখানেই থাকতেন একাকী, রান্নার কাজ করতেন নিজেই, যেন একটা ডিমও অপচয় না হয়। বয়স যখন ষাট পেরিয়েছে, তখন হঠাৎ একদিন সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি একটি বাগানবাড়ি বানাবেন শহরের বাইরে। শেষ বয়সে একটু খোলামেলা পরিবেশে থাকা যাবে, এই যুক্তি দেখিয়ে অনেক টাকা খরচ করলেন। বাড়িটি বানাতে গিয়ে বহু শ্রমিক, ইঞ্জিনিয়ার নিয়োগ দিলেন। মোবারক বাড়ির সব খরচ নিজ হাতে হিসাব রাখতেন। ঘরগুলো আধুনিক, দেয়ালে কাঠের কারুকাজ, বারান্দায় দোলনা — সবই পরিপাটি, নিখুঁত। কিন্তু তবুও কেউ ছিল না পাশে। তিন বছর পর ওই বাড়িতে গিয়ে থাকতে শুরু করলেন মোবারক। বড় গেট, ফুলে ভরা বাগান, হাঁটার পথ, বিশ্রামের ছায়া — সবই ছিল, কিন্তু সঙ্গী বলতে কেউ ছিল না। একদিন হঠাৎ অসুস্থ বোধ করলেন। গা কাঁপুনি, জ্বর, দুর্বলতা। স্থানীয় ডাক্তার প্রথমে পাত্তা দিলেন না। কিন্তু দিন পেরোতে না পেরোতেই বোঝা গেল সমস্যাটা গুরুতর। শহরে গিয়ে রক্ত পরীক্ষা করালেন। ধরা পড়ল প্যানক্রিয়াস ক্যান্সার, তৃতীয় স্টেজ। হাসপাতালে শুয়ে শুয়ে মোবারক প্রথমবারের মতো ভাবলেন, এই বিশাল বাড়ি, জমানো টাকা, ব্যাংক ব্যালেন্স — সবই কেমন অর্থহীন লাগছে! জীবন এতটাই ক্ষণস্থায়ী, অথচ তিনি সারা জীবন কাটালেন হিসেব কষে। বাবার জীবনের শেষ সময়ে একটা ইনহেলার কেনেননি, মায়ের চোখে ছানি অপারেশনের খরচ দিতে অস্বীকার করেছিলেন। ভাতিজার পড়াশোনার খরচ না দেয়ায় কলেজে ভর্তি হতে পারেনি ছেলেটি। আজ সেই মোবারকের পাশে কেউ নেই। এক সন্ধ্যায় হাসপাতালের জানালায় তাকিয়ে থাকতে থাকতে চোখ ভিজে উঠল তাঁর। ছোট একটি মেয়ে পাশের রোগীকে তার বাবাকে ফল খাওয়াচ্ছে। দৃশ্যটি তাঁকে মনে করিয়ে দিল, তাঁর একটাই দোষ, ‘ভয় আর অবিশ্বাসে ভরা এক হৃদয়’। তিনি ভালোবাসতে পারেননি, কাউকে বিশ্বাস করতে পারেননি, এমনকি কাছের লোকজনকেও সাহায্য করতে পারেননি। টাকা ছিল, হৃদয় ছিল না। মোবারক সেই রাতে একজন নার্সকে ডেকে বললেন, “একটা কাজ করে দেবে মা?” নার্স বলল, “বলুন কাকা।” তিনি বললেন, “এই চিঠিটা আমার এলাকার মসজিদের ইমাম সাহেবকে পৌঁছে দেবে। আর যদি আমি বেঁচে না থাকি, আমার ঘরের আলমারির ভেতর থেকে সব কাগজ ও টাকা আমার গ্রামের দরিদ্র লোকজনের জন্য ওয়াকফ করে দিয়ো।” চিঠিতে তিনি তাঁর কিপ্টামির স্বীকারোক্তি লিখেছিলেন। ক্ষমা চেয়েছিলেন মা-বাবার কাছেও। আর সব সম্পত্তি দিয়ে যেতে চেয়েছিলেন এতিমখানা, হাসপাতাল এবং গ্রামের দরিদ্রদের জন্য। দুদিন পর মোবারক হোসেন মারা গেলেন। কেউ খুব একটা কাঁদেনি, কিন্তু তাঁর চিঠি যখন প্রকাশিত হলো, তখন অনেকের চোখে পানি এসেছিল। এক কাপুরুষ, কিপ্টে মানুষ শেষ জীবনে বুঝেছিলেন, মানুষের জীবনের আসল সম্পদ টাকা নয়, বরং সম্পর্ক, সহানুভূতি আর উদারতা। তাঁর তৈরি বাগানবাড়িটি এখন এক বৃদ্ধাশ্রম, যেখানে অনাথ ও অসহায় বৃদ্ধরা বসবাস করেন। তাঁর কিপ্টে জীবনের শেষ অধ্যায়ে পাওয়া অনুশোচনাই হয়তো মানুষের জন্য বড় একটি প্রাপ্তি হয়ে রয়ে গেল — একটা নিঃশব্দ শিক্ষা।
চলতি বছরের আগস্টের শেষ দিকে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে বলে জানিয়েছেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম। তিনি আশা প্রকাশ করেন, আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে কেন্দ্রটির প্রথম ইউনিট থেকে ১,০০০ মেগাওয়াটেরও বেশি বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা সম্ভব হবে। অন্যদিকে নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেডের (এনপিসিবিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. মো. জাহেদুল হাসান জানিয়েছেন, কেন্দ্রটির প্রথম ইউনিট ২০২৭ সালের শুরুতে এবং দ্বিতীয় ইউনিট ২০২৮ সালের শুরুতে পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্যিক উৎপাদনে যাবে। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের নিরাপত্তা, কমিশনিং, পরিচালনাগত প্রস্তুতি এবং সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত নানা প্রতিবেদনকে কেন্দ্র করে জনমনে বিভিন্ন প্রশ্ন ও কৌতূহল তৈরি হয়েছে। এসব বিষয়ে ড. জাহেদুল হাসানের সঙ্গে কথা হলে তিনি কেন্দ্রটির নিরাপত্তা, পরিচালনা, আন্তর্জাতিক তদারকি কাঠামোসহ গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সম্পর্কে ব্যাখ্যা দেন। ড. জাহেদুল হাসান বলেন, একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র কোনো একক প্রতিষ্ঠানের সিদ্ধান্তে পরিচালিত হয় না। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে একাধিক স্বাধীন কারিগরি, নিয়ন্ত্রক ও নিরাপত্তা সংস্থার সমন্বিত তদারকির মাধ্যমে এর প্রতিটি ধাপ পরিচালিত হয়। তিনি জানান, বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন (বিএইসি) প্রকল্পের মালিক হিসেবে নির্মাণ চুক্তি বাস্তবায়ন এবং স্থাপনা গ্রহণের দায়িত্ব পালন করছে। নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেড আইন অনুযায়ী কেন্দ্রটির অপারেটিং অর্গানাইজেশন। কমিশনিং, নিরাপদ পরিচালনা, রক্ষণাবেক্ষণ এবং ভবিষ্যতে ডিকমিশনিং পর্যন্ত সব অপারেশনাল দায়িত্ব এনপিসিবিএলের ওপর ন্যস্ত। অন্যদিকে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ একটি স্বাধীন নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে আন্তর্জাতিক ও জাতীয় নিরাপত্তা মানদণ্ড অনুযায়ী প্রকল্পের প্রতিটি ধাপ মূল্যায়ন করে প্রয়োজনীয় লাইসেন্স প্রদান করছে। কমিশনিং কার্যক্রমের স্বাধীন কারিগরি মূল্যায়নের জন্য বিএইবিএ আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ভিও সেফটিকে এক্সপার্ট অর্গানাইজেশন হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে। এ ছাড়া রাশিয়ার সিআরইএ কমিশনিং, অপারেশনাল প্রস্তুতি, অপারেটর প্রশিক্ষণ এবং জ্ঞান স্থানান্তরে এনপিসিবিএলকে সহায়তা করছে। রাশিয়ার স্বাধীন নিয়ন্ত্রক সংস্থা Rostechnadzor গুরুত্বপূর্ণ কমিশনিং পর্যায়ে বিএইআরএর সঙ্গে প্রযুক্তিগত অভিজ্ঞতা বিনিময় করছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা বিভিন্ন Peer Review Mission ও Technical Review পরিচালনার মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রস্তুতি আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মানদণ্ড অনুযায়ী মূল্যায়ন করছে এবং প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিচ্ছে। ড. জাহেদুল বলেন, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত একাধিক জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের স্বাধীন কারিগরি মূল্যায়ন, নিয়ন্ত্রক অনুমোদন এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মানদণ্ড অনুসরণ করেই গ্রহণ করা হয়। এনপিসিবিএল এখনো দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় সক্ষমতা অর্জন করতে পারেনি—এমন সমালোচনার বিষয়ে ড. জাহেদুল বলেন, পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনার মূল ভিত্তি হলো দক্ষ জনবল ও শক্তিশালী নিরাপত্তা সংস্কৃতি। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, গত এক দশকে সরকার এ খাতে ব্যাপক বিনিয়োগ করেছে। শত শত প্রকৌশলী, অপারেটর, রিঅ্যাক্টর বিশেষজ্ঞ, রসায়নবিদ, বিকিরণ সুরক্ষা কর্মকর্তা, রক্ষণাবেক্ষণ প্রকৌশলী রাশিয়াসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছেন। তারা Full Scope Simulator, On-the-Job Training এবং Classroom Training-সহ আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ সফলভাবে সম্পন্ন করেছেন। তিনি আরও বলেন, প্রতিটি অপারেটরকে বিএইআরএর কঠোর লাইসেন্সিং ও মূল্যায়ন প্রক্রিয়া অতিক্রম করতে হয়। একই সময়ে সিআরইএর বিশেষজ্ঞরা কমিশনিং পর্যায়ে এনপিসিবিএলের কর্মীদের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করে আন্তর্জাতিক সর্বোত্তম চর্চা অনুযায়ী জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা স্থানান্তর নিশ্চিত করছেন। ফলেএনপিসিবিএল বর্তমানে প্রযুক্তিগত, অপারেশনাল ও প্রাতিষ্ঠানিক—সব দিক থেকেই দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনার জন্য একটি সক্ষম Operating Organization হিসেবে গড়ে উঠেছে। স্পেন্ট ফুয়েল (ব্যবহৃত পারমাণবিক জ্বালানি) ব্যবস্থাপনা এবং রাশিয়ার সঙ্গে এ বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত চুক্তি হয়নি—এমন আলোচনার প্রসঙ্গে ড. জাহেদুল বলেন, আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শিল্পের প্রচলিত পদ্ধতি সম্পর্কে সীমিত ধারণার কারণেই এ ধরনের বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছে। তিনি জানান, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক সংস্থা রোসাটমের মধ্যে চুক্তি ইতোমধ্যে স্বাক্ষরিত হয়েছে। এর পাশাপাশি বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন ও টিভিইলের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি পারমাণবিক জ্বালানি সরবরাহের ফ্রেমওয়ার্ক এগ্রিমেন্ট বিদ্যমান রয়েছে। তিনি আরও বলেন, আইএইএর নিরাপত্তা নির্দেশিকা অনুযায়ী ব্যবহৃত পারমাণবিক জ্বালানি রিঅ্যাক্টর থেকে অপসারণের পর তাৎক্ষণিকভাবে অন্য দেশে পাঠানো হয় না। প্রথমে কেন্দ্রের নকশার অংশ হিসেবে নির্মিত স্পেন্ট ফুয়েল পোলে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত নিরাপদে সংরক্ষণ ও শীতলীকরণ করা হয়, যা বিশ্বের সব আধুনিক পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রেই অনুসরণ করা হয়। পরবর্তীতে বিদ্যমান আন্তঃরাষ্ট্রীয় চুক্তি, বাণিজ্যিক ব্যবস্থা এবং সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষের অনুমোদনের ভিত্তিতে পরবর্তী ব্যবস্থাপনা সম্পন্ন হয়। উল্লেখ্য, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পে রাশিয়ার ভিবিইআর-১২০০ মডেলের তৃতীয় প্রজন্মের দুটি রিয়্যাক্টর স্থাপন করা হচ্ছে। প্রতিটি ইউনিটের উৎপাদন ক্ষমতা ১,২০০ মেগাওয়াট। দুটি ইউনিট চালু হলে কেন্দ্রটির মোট উৎপাদন ক্ষমতা হবে ২,৪০০ মেগাওয়াট। সংশ্লিষ্টদের মতে, রিয়্যাক্টরগুলো আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মানদণ্ড পূরণে সক্ষম। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক সংস্থা রোসাটম।
আকাশের নীলে কীবা কবিতার মিলে না গোলাপের সুরভিতে ডানা মেলা চিলে না। গোধূলির রং এসে সন্ধ্যায় যায় মেশে কোথাও তো নেই তুমি গল্পের শুরু-শেষে। চাদরের আদরে না না ভোরের রবিতে না শিমুল কোলে থাকা কোকিলের ছবিতে। রিমঝিম টুপটাপ বরষার ছন্দে তোমাকেই খুঁজে পাই কামিনীর গন্ধে।
অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়েছে পৃথিবীর ভাগ্যাকাশ শুরু হয়েছে একের পর এক দুর্যোগ, দুর্ভিক্ষ; মহামারি চলছে পাল্লা দিয়ে। বর্ণাঢ্য আয়োজনে পশুত্ব গিলছে মনুষ্যত্ব অ-অনুমেয়— কতটা লম্বা মৃত্যুর মিছিল? অশান্ত, ভীষণ প্রকৃতি এখন। ধৈর্য, সহনশীলতার হয়েছে অকালমৃত্যু দানবীয় শক্তিতে জ্বলে উঠেছে আগ্নেয়গিরি। বিষাক্ত বিষ উদগিরিত হচ্ছে গলগলিয়ে লাভার তাপে অঙ্গার হলো পাখির নীড়। এমন দুর্যোগকালীন সময়ে তোমাকে ভীষণ প্রয়োজন, কবিতা। কেবল তুমিই জানো স্বার্থের বেড়া ভেঙে প্রেমের কুটির রচনার মন্ত্র। তুমিই পারো ধ্বংসস্তূপকে রূপ দিতে শৈল্পিক। এমন ধবধবে ভূতুড়ে দিনে তোমাকে ভীষণ প্রয়োজন, কবিতা। তোমার জাদুকরি শব্দরাই পারবে মোহের ঝকমকি সরিয়ে জাগ্রত পতাকা ওড়াতে। তোমার আগুনঝরা কথা স্ফুলিঙ্গের মতো ঘুরবে কালের আকাশে।
পিঠে পেট ঠেকেছে, তবু আনন্দ-বেসাতির কমতি নেই রোদে পুড়ে ঝড়-বৃষ্টিতে ভিজে একটা মানুষ জীবন-যুদ্ধে লড়ে যায় অহর্নিশি প্রসন্নতার আলপথে খোঁজে কষ্টের সুখ চোখের দীপ্র জ্যোতিতে প্রিয় সন্তানের মুখ কষ্টের টানাপোড়েনেও বাবা যেন সাঁকো বাঁধা সেতু- জীবন-নদীর দুই তীর অপত্য স্নেহে আগলে বেঁধে রাখে। নদীর স্রোত কোথাও খরস্রোতা, কোথাও ধীর লয় রোদে পুড়ে, ঝড়-বৃষ্টিতে ভিজে পরিশ্রমী বাবারা এমনই বহমান নদী।