Breaking news

সংসার

দোতারার জীবন
দোতারার জীবন

আকাশে রঙিন ভোরের আভা মেখে যখন গ্রাম জেগে ওঠে, তখনই মেঠোপথে দেখা মেলে বাউল` জয়নালের। কাঁধে ঝোলা, হাতে একতারা, চোখে যেন অন্য দুনিয়ার আলো। তার হাঁটা যেন গানের তালে বাঁধা, তার নিশ্বাসে লুকিয়ে থাকে শত শোক-সুখের সুর। সে গাইতে থাকে লালন ফকিরের বিখ্যাত গান- মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি। মানুষ ছাড়া ক্ষ্যাপা রে তুই মূল হারাবি।।   গান ধরলেই মনে হয়, বাতাসও যেন থমকে শোনে। লোকজন জয়নালকে ডাকে ‘ছন্নছাড়া’, কেউ বলে ‘পাগল’, কিন্তু তার গান শোনার পর বোঝা যায়—সে একজন বিরহের প্রেমিক, আবার মুক্তিরও ফেরিওয়ালা।   জয়নালের জীবনটা এমন ছিল না। একসময় তারও ছিল সংসার, ছিল প্রিয়তমা আসমা জান। আসমা জানের চোখে ভরপুর ছিল স্বপ্ন। ছিল ধানের একচিলতে উঠোন। সন্ধ্যায় আসমার হাতের রান্নার সুস্বাদু ম-ম ঘ্রাণে ঘর ভরে যেত। কিন্তু জয়নালের বুকে হঠাৎই জন্ম নিল অদ্ভুত তৃষ্ণা। গানের সুরে মানুষের মন খোঁজা, আত্মার দর্শন মিলা। সংসারের চার দেয়ালে বন্দী তার ভালো লাগল না। এমনকি আসমার ভালোবাসার আঁচলও তাকে বেঁধে রাখতে পারল না।   এক রাতে বৃষ্টি ঝরছিল। আসমা জান নাইওর এসেছিল বাপের বাড়ি। সাথে স্বমী জয়নালও। গভীর রাত। বাইরে ঝিঁঝি পোকা ডাকছে। আসমা জান ঘুমিয়ে ছিল। আর জয়নাল নিঃশব্দে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল দোতারা হাতে। ঝোড়ো হাওয়ার মাঝে আকাশের দিকে তাকিয়ে সে বলল, “হে অদৃশ্য সৃষ্টির মালিক, আমি কি তোমার কাছে পৌঁছাতে পারব?” বাতাসে যেন প্রতিধ্বনি ভেসে এলো, “পথে নামলেই পথ খুলে যায়।”   দিন যায়, বছর যায়। জয়নালের গান ভেসে ওঠে নদীর ঘাটে, গঞ্জের হাটে, মেলার মাঠে আর লঞ্চ-স্টিমারে। তার সুরে প্রেম আর বিরহ মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়।   একবার মেলার আখড়ায় গাইছিল সে। ভিড়ের মাঝে এক তরুণ এসে জিজ্ঞেস করল, “বাউল ভাই, এত ঘুরে বেড়ান কেন? ঘর-সংসার ছেড়ে মানুষকে ভালোবাসা যায় না? সংসার করতে ইচ্ছে হয় না৷ নাকি সংসার নাই? ঘোলে কি আর দুধের স্বাদ মিটে?   গান বাজনা মনের খোরাক। আর সংসার হলো বেঁচে থাকার খুঁটি। সেই খুঁটি ভেঙে গেলে জীবন পানসে হয়ে যায়।   তরুণের তাত্ত্বিক কথা শুনে জয়নাল হাসে। মনের কোণে একটা ব্যথা চিন চিন করতে থাকে। বছর পাঁচ হয় স্ত্রী আসমা জানকে ঘুমে রেখে ঘর ছেড়েছে। এর মাঝে আর কোনো খোঁজ নেয়া হয়নি। জয়নাল দোতারা বাজিয়ে বলল, “ভাই, সংসারের বাঁধন ভালোবাসাকে শেকল দেয়। আর পথের ধুলোয় মানুষকে পেলে, তার চোখে চোখ রাখলে বোঝা যায়, সব প্রেম আসলে একই প্রেম। ঘরের প্রেমও, দুনিয়ার প্রেমও, ঈশ্বরের প্রেমও। তরুণ আর কথা না বাড়িয়ে চুপ হয়ে গেল।   জয়নালের অন্তরে এক গভীর শূন্যতা ছায়া ফেলে। রাতে নদীর পাড়ে বসে সে আকাশ দেখে। চোখের পর্দায় আসমা জানের মুখ ভেসে উঠে।   সে ফিসফিস করে বলে, ‘আসমা জান, আমি তোমায় ছেড়ে এসেছি, কিন্তু গানে গানে আমি তোমারই প্রতিচ্ছবি খুঁজে ফিরি।’ এক বৃদ্ধ সাধক, যিনি পাশেই ধ্যানে বসেছিলেন, চোখ মেলে বললেন, “বাবা, প্রেম আর বিরহকে আলাদা ভেবো না। প্রেমের ভেতরেই বিরহ লুকানো, বিরহের ভেতরেই প্রেম। দোতারায় যখন টান দাও, দুটি তারে ভিন্ন সুর বাজে, কিন্তু শেষে মিলেমিশে এক হয়। জীবনও তাই। তবে দোতারার একটা তার ছিঁড়ে গেলে যেমন সুর ওঠে না, সংসারজীবনও ঠিক তাই। মন ভেঙে গেলে কাচ ভাঙার মতো আর জোড়া লাগে না।   বৃদ্ধ সাধকের কথায় বুকের ভেতর চিন চিন ব্যথাটা একটু বেড়ে গেল। জয়নাল একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে মাথা নোয়াল। জীবনের অংঙ্ক বড়ই জটিল।   পরদিন সে ফিরল নিজের গ্রামে। কাশফুলে ভরে গেছে মাঠ, আকাশনীলে সাদাকালো মেঘের মেলা বসেছে। জয়নাল এসে দাঁড়াল শ্বশুরবাড়ির পুরোনো উঠোনে। দরজায় নক করতেই আসমা জান বেরিয়ে এল। জয়নালের চোখে এক অদ্ভুত নীরবতা। কী বলে নিজের দোষ ভাঙাবে ঠিক করতে পারে না। জয়নালকে দেখে আসমা জানও অবাক। পাঁচ বছর যার কোনো খোঁজ ছিল না, সে হঠাৎ কোথা থেকে উদয় হলো? জয়নাল মাথা নিচু করে জানতে চায়, “আসমা জান, কেমন আছ?   আসমা বলল, “আপনি কি আপনার মনের মানুষ খুঁজে পেয়েছেন?”   জয়নালের বুক কেঁপে উঠল। জয়নাল এক মুহূর্তে বুঝে গেল, তার গান, তার প্রেম, তার ভ্রমণ - সবকিছু ছিল মনের ঘোর। তরুণ আর বৃদ্ধ সাধকের তাত্ত্বিক কথায় জয়নালের বাউলজীবনের ঘোর কাটলেও আসমা জানের প্রশ্নের উত্তর জানা নেই।   সে পথে পথে ঘুরেফিরে অনেক মানুষ দেখেছে। অনেক গান গেয়েছে। কিন্তু স্ত্রী আসমা জানের মতো দরদি মানুষ পায়নি। একটা অচেনা কষ্টে চোখ ভিজে আসে। দোতারা বুকে চেপে ধরে সে গেয়ে ওঠে, ‘মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি...’   “আসমা জান, সত্যি বলতে তোমার মতো কাউকে খুঁজে পাইনি। তুমি যে আমার অন্তরে গানের সুরে মিশে আছ।”   জয়নালের কথা শুনে আসমা জান একটুখানি হেসে শাড়ির আঁচলে চোখ মুছল। তার পরও চোখে জল চিকচিক করছে, কিন্তু আসমা জান কিছু না বলে জানালার বাইরে তাকিয়ে বলল, “তোমার আসমা জান আর তোমার নেই। সে এখন দূর আকাশের চাঁদ-তারা।”   জয়নাল কিছু বুঝে ওঠার আগেই ঘরের ভেতর থেকে অপরিচিত পুরুষ কণ্ঠ ভেসে আসে, “বাহিরে কে এল?”   আসমা জান কোনো জবাব না দিয়ে ঘরের দরজা বিকট শব্দে এঁটে দেয়।   গলার স্বরটা জয়নালের চেনা চেনা লাগে। অনেকটা তার ওস্তাদজির কণ্ঠ। ওস্তাদ গানের তালিম দিতে গিয়ে আসমা জানের ঠিকানা নিয়েছিল। বলেছিল, যদি ওদিকে যায় তাহলে দেখা করবে। তাহলে কি ওস্তাদজি আসমা জানকে বিয়ে করেছে? কিছুই ভাবতে পারে না। সবকিছু এলোমেলো লাগে। বাতাসে শিউলি ফুল ঝরে পড়ে, আর সেই মুহূর্তে জয়নাল বুঝে যায়, তার জীবনটা তারছেঁড়া বেসুরা এক দোতারা। অন্তহীন গান, যার দুঃখের শেষ নেই।   জয়নালের চোখে কালো মেঘের বিজলি চমকাতে থাকে। বুকের ভেতর কেমন যেন হাহাকার করে ওঠে। এক মুহূর্তে সে বুঝে যায়, ওস্তাদই তার আসমা জানকে দখল করেছে। এখন পথই তার ঘর, খোলা আকাশই তার মাথার ছাদ, আর গানই তার মুক্তি।   আসমা জানের চোখে যে অশ্রুর ঝিলিক দেখেছিল, তা তার শেষ আশীর্বাদ, আবার শেষ বিদায়ও।   দোতারা বুকে জড়িয়ে সে হাঁটতে থাকে মেঠোপথ ধরে। বাতাসে শিউলি ফুল ঝরে পড়ছে, যেন প্রতিটি ফুল তার ছিন্ন জীবনের সাদা অশ্রুবিন্দু। চারপাশে নিস্তব্ধতা, কেবল দূরের নদীর স্রোতের সঙ্গে মিলেমিশে যায় জয়নালের কণ্ঠ-   ‘মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি মানুষ ছাড়া ক্ষ্যাপা রে তুই মূল হারাবি।।’   গানের সুর ভেসে ওঠে দূরের নদীতে, কাশবনে, হয়তো আসমা জানের জানালার কাচেও ঠেকে যায় জয়নালের সুর। আসমা জান হয়তো শুনবে, হয়তো শুনবে না। কিন্তু সেই সুরে তার ভালোবাসা আর অভিমান মিলেমিশে চিরকাল বেঁচে থাকবে। আর জয়নাল?   সে চলে যায় অদৃশ্য পথের দিকে, এক ছিন্ন দোতারার সুরে, যা থামবে না কোনো দিন, যেমন থামে না প্রেমের অশ্রু, যেমন থামে না বিরহের গান। হয়তো আসমা জানের বুকেও একদিন প্রতিধ্বনিত হয়ে বাজবে জয়নালের গান।  

জুলাই ১৯, ২০২৬ 0
Popular post
শেষের অনুশোচনা

মোবারক হোসেন ছিলেন শহরের প্রান্তে ছোট একটি ব্যবসার মালিক। সারা জীবন হিসাবি, কিপ্টে ও আত্মকেন্দ্রিক মনোভাবের কারণে তাঁর সুনাম কখনো গড়ে ওঠেনি। ছেলেবেলায় তাঁর পরিবার অভাবী ছিল, কিন্তু মা-বাবা সব সময় চেষ্টা করতেন সন্তানদের প্রয়োজন পূরণ করতে। অথচ সেই মোবারক সামান্য টাকা জমাতে গিয়ে মা-বাবার ওষুধ কেনা থেকেও পিছপা হয়েছেন। আত্মীয়স্বজনের বিপদে কখনো একটি পয়সা দেননি, এমনকি বন্ধুবান্ধবের কাছ থেকে দূরে থেকেছেন কেউ ধার চেয়ে বসে এই ভয়ে। সময়ের সাথে সাথে মোবারকের ব্যবসা জমে উঠল। দোকান থেকে উপার্জিত টাকা তিনি ব্যাংকে জমাতেন, ফিক্সড ডিপোজিট করতেন, আর স্বর্ণ কিনে লুকিয়ে রাখতেন পুরোনো ট্রাংকে। কেউ জানত না তাঁর আসল সম্পদের পরিমাণ। অথচ নিজের বাড়িটাও পুরোনো, ফাটল ধরা দেয়ালে ভরা। সেখানেই থাকতেন একাকী, রান্নার কাজ করতেন নিজেই, যেন একটা ডিমও অপচয় না হয়। বয়স যখন ষাট পেরিয়েছে, তখন হঠাৎ একদিন সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি একটি বাগানবাড়ি বানাবেন শহরের বাইরে। শেষ বয়সে একটু খোলামেলা পরিবেশে থাকা যাবে, এই যুক্তি দেখিয়ে অনেক টাকা খরচ করলেন। বাড়িটি বানাতে গিয়ে বহু শ্রমিক, ইঞ্জিনিয়ার নিয়োগ দিলেন। মোবারক বাড়ির সব খরচ নিজ হাতে হিসাব রাখতেন। ঘরগুলো আধুনিক, দেয়ালে কাঠের কারুকাজ, বারান্দায় দোলনা — সবই পরিপাটি, নিখুঁত। কিন্তু তবুও কেউ ছিল না পাশে। তিন বছর পর ওই বাড়িতে গিয়ে থাকতে শুরু করলেন মোবারক। বড় গেট, ফুলে ভরা বাগান, হাঁটার পথ, বিশ্রামের ছায়া — সবই ছিল, কিন্তু সঙ্গী বলতে কেউ ছিল না। একদিন হঠাৎ অসুস্থ বোধ করলেন। গা কাঁপুনি, জ্বর, দুর্বলতা। স্থানীয় ডাক্তার প্রথমে পাত্তা দিলেন না। কিন্তু দিন পেরোতে না পেরোতেই বোঝা গেল সমস্যাটা গুরুতর। শহরে গিয়ে রক্ত পরীক্ষা করালেন। ধরা পড়ল প্যানক্রিয়াস ক্যান্সার, তৃতীয় স্টেজ। হাসপাতালে শুয়ে শুয়ে মোবারক প্রথমবারের মতো ভাবলেন, এই বিশাল বাড়ি, জমানো টাকা, ব্যাংক ব্যালেন্স — সবই কেমন অর্থহীন লাগছে! জীবন এতটাই ক্ষণস্থায়ী, অথচ তিনি সারা জীবন কাটালেন হিসেব কষে। বাবার জীবনের শেষ সময়ে একটা ইনহেলার কেনেননি, মায়ের চোখে ছানি অপারেশনের খরচ দিতে অস্বীকার করেছিলেন। ভাতিজার পড়াশোনার খরচ না দেয়ায় কলেজে ভর্তি হতে পারেনি ছেলেটি। আজ সেই মোবারকের পাশে কেউ নেই। এক সন্ধ্যায় হাসপাতালের জানালায় তাকিয়ে থাকতে থাকতে চোখ ভিজে উঠল তাঁর। ছোট একটি মেয়ে পাশের রোগীকে তার বাবাকে ফল খাওয়াচ্ছে। দৃশ্যটি তাঁকে মনে করিয়ে দিল, তাঁর একটাই দোষ, ‘ভয় আর অবিশ্বাসে ভরা এক হৃদয়’। তিনি ভালোবাসতে পারেননি, কাউকে বিশ্বাস করতে পারেননি, এমনকি কাছের লোকজনকেও সাহায্য করতে পারেননি। টাকা ছিল, হৃদয় ছিল না। মোবারক সেই রাতে একজন নার্সকে ডেকে বললেন, “একটা কাজ করে দেবে মা?” নার্স বলল, “বলুন কাকা।” তিনি বললেন, “এই চিঠিটা আমার এলাকার মসজিদের ইমাম সাহেবকে পৌঁছে দেবে। আর যদি আমি বেঁচে না থাকি, আমার ঘরের আলমারির ভেতর থেকে সব কাগজ ও টাকা আমার গ্রামের দরিদ্র লোকজনের জন্য ওয়াকফ করে দিয়ো।” চিঠিতে তিনি তাঁর কিপ্টামির স্বীকারোক্তি লিখেছিলেন। ক্ষমা চেয়েছিলেন মা-বাবার কাছেও। আর সব সম্পত্তি দিয়ে যেতে চেয়েছিলেন এতিমখানা, হাসপাতাল এবং গ্রামের দরিদ্রদের জন্য। দুদিন পর মোবারক হোসেন মারা গেলেন। কেউ খুব একটা কাঁদেনি, কিন্তু তাঁর চিঠি যখন প্রকাশিত হলো, তখন অনেকের চোখে পানি এসেছিল। এক কাপুরুষ, কিপ্টে মানুষ শেষ জীবনে বুঝেছিলেন, মানুষের জীবনের আসল সম্পদ টাকা নয়, বরং সম্পর্ক, সহানুভূতি আর উদারতা। তাঁর তৈরি বাগানবাড়িটি এখন এক বৃদ্ধাশ্রম, যেখানে অনাথ ও অসহায় বৃদ্ধরা বসবাস করেন। তাঁর কিপ্টে জীবনের শেষ অধ্যায়ে পাওয়া অনুশোচনাই হয়তো মানুষের জন্য বড় একটি প্রাপ্তি হয়ে রয়ে গেল — একটা নিঃশব্দ শিক্ষা।

আগস্টেই রূপপুর থেকে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ

  চলতি বছরের আগস্টের শেষ দিকে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে বলে জানিয়েছেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম। তিনি আশা প্রকাশ করেন, আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে কেন্দ্রটির প্রথম ইউনিট থেকে ১,০০০ মেগাওয়াটেরও বেশি বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা সম্ভব হবে। অন্যদিকে নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেডের (এনপিসিবিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. মো. জাহেদুল হাসান জানিয়েছেন, কেন্দ্রটির প্রথম ইউনিট ২০২৭ সালের শুরুতে এবং দ্বিতীয় ইউনিট ২০২৮ সালের শুরুতে পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্যিক উৎপাদনে যাবে। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের নিরাপত্তা, কমিশনিং, পরিচালনাগত প্রস্তুতি এবং সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত নানা প্রতিবেদনকে কেন্দ্র করে জনমনে বিভিন্ন প্রশ্ন ও কৌতূহল তৈরি হয়েছে। এসব বিষয়ে ড. জাহেদুল হাসানের সঙ্গে কথা হলে তিনি কেন্দ্রটির নিরাপত্তা, পরিচালনা, আন্তর্জাতিক তদারকি কাঠামোসহ গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সম্পর্কে ব্যাখ্যা দেন।  ড. জাহেদুল হাসান বলেন, একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র কোনো একক প্রতিষ্ঠানের সিদ্ধান্তে পরিচালিত হয় না। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে একাধিক স্বাধীন কারিগরি, নিয়ন্ত্রক ও নিরাপত্তা সংস্থার সমন্বিত তদারকির মাধ্যমে এর প্রতিটি ধাপ পরিচালিত হয়।  তিনি জানান, বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন (বিএইসি) প্রকল্পের মালিক হিসেবে নির্মাণ চুক্তি বাস্তবায়ন এবং স্থাপনা গ্রহণের দায়িত্ব পালন করছে। নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেড আইন অনুযায়ী কেন্দ্রটির অপারেটিং অর্গানাইজেশন। কমিশনিং, নিরাপদ পরিচালনা, রক্ষণাবেক্ষণ এবং ভবিষ্যতে ডিকমিশনিং পর্যন্ত সব অপারেশনাল দায়িত্ব এনপিসিবিএলের ওপর ন্যস্ত। অন্যদিকে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ একটি স্বাধীন নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে আন্তর্জাতিক ও জাতীয় নিরাপত্তা মানদণ্ড অনুযায়ী প্রকল্পের প্রতিটি ধাপ মূল্যায়ন করে প্রয়োজনীয় লাইসেন্স প্রদান করছে। কমিশনিং কার্যক্রমের স্বাধীন কারিগরি মূল্যায়নের জন্য বিএইবিএ আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ভিও সেফটিকে এক্সপার্ট অর্গানাইজেশন হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে। এ ছাড়া রাশিয়ার সিআরইএ কমিশনিং, অপারেশনাল প্রস্তুতি, অপারেটর প্রশিক্ষণ এবং জ্ঞান স্থানান্তরে এনপিসিবিএলকে সহায়তা করছে। রাশিয়ার স্বাধীন নিয়ন্ত্রক সংস্থা Rostechnadzor গুরুত্বপূর্ণ কমিশনিং পর্যায়ে বিএইআরএর সঙ্গে প্রযুক্তিগত অভিজ্ঞতা বিনিময় করছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা বিভিন্ন Peer Review Mission ও Technical Review পরিচালনার মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রস্তুতি আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মানদণ্ড অনুযায়ী মূল্যায়ন করছে এবং প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিচ্ছে। ড. জাহেদুল বলেন, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত একাধিক জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের স্বাধীন কারিগরি মূল্যায়ন, নিয়ন্ত্রক অনুমোদন এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মানদণ্ড অনুসরণ করেই গ্রহণ করা হয়। এনপিসিবিএল এখনো দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় সক্ষমতা অর্জন করতে পারেনি—এমন সমালোচনার বিষয়ে ড. জাহেদুল বলেন, পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনার মূল ভিত্তি হলো দক্ষ জনবল ও শক্তিশালী নিরাপত্তা সংস্কৃতি। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, গত এক দশকে সরকার এ খাতে ব্যাপক বিনিয়োগ করেছে। শত শত প্রকৌশলী, অপারেটর, রিঅ্যাক্টর বিশেষজ্ঞ, রসায়নবিদ, বিকিরণ সুরক্ষা কর্মকর্তা, রক্ষণাবেক্ষণ প্রকৌশলী রাশিয়াসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছেন। তারা Full Scope Simulator, On-the-Job Training এবং Classroom Training-সহ আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ সফলভাবে সম্পন্ন করেছেন। তিনি আরও বলেন, প্রতিটি অপারেটরকে বিএইআরএর কঠোর লাইসেন্সিং ও মূল্যায়ন প্রক্রিয়া অতিক্রম করতে হয়। একই সময়ে সিআরইএর বিশেষজ্ঞরা কমিশনিং পর্যায়ে এনপিসিবিএলের কর্মীদের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করে আন্তর্জাতিক সর্বোত্তম চর্চা অনুযায়ী জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা স্থানান্তর নিশ্চিত করছেন। ফলেএনপিসিবিএল বর্তমানে প্রযুক্তিগত, অপারেশনাল ও প্রাতিষ্ঠানিক—সব দিক থেকেই দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনার জন্য একটি সক্ষম Operating Organization হিসেবে গড়ে উঠেছে।  স্পেন্ট ফুয়েল (ব্যবহৃত পারমাণবিক জ্বালানি) ব্যবস্থাপনা এবং রাশিয়ার সঙ্গে এ বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত চুক্তি হয়নি—এমন আলোচনার প্রসঙ্গে ড. জাহেদুল বলেন, আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শিল্পের প্রচলিত পদ্ধতি সম্পর্কে সীমিত ধারণার কারণেই এ ধরনের বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছে। তিনি জানান, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক সংস্থা রোসাটমের মধ্যে চুক্তি ইতোমধ্যে স্বাক্ষরিত হয়েছে। এর পাশাপাশি বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন ও টিভিইলের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি পারমাণবিক জ্বালানি সরবরাহের ফ্রেমওয়ার্ক এগ্রিমেন্ট বিদ্যমান রয়েছে। তিনি আরও বলেন, আইএইএর নিরাপত্তা নির্দেশিকা অনুযায়ী ব্যবহৃত পারমাণবিক জ্বালানি রিঅ্যাক্টর থেকে অপসারণের পর তাৎক্ষণিকভাবে অন্য দেশে পাঠানো হয় না। প্রথমে কেন্দ্রের নকশার অংশ হিসেবে নির্মিত স্পেন্ট ফুয়েল পোলে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত নিরাপদে সংরক্ষণ ও শীতলীকরণ করা হয়, যা বিশ্বের সব আধুনিক পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রেই অনুসরণ করা হয়।   পরবর্তীতে বিদ্যমান আন্তঃরাষ্ট্রীয় চুক্তি, বাণিজ্যিক ব্যবস্থা এবং সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষের অনুমোদনের ভিত্তিতে পরবর্তী ব্যবস্থাপনা সম্পন্ন হয়। উল্লেখ্য, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পে রাশিয়ার ভিবিইআর-১২০০ মডেলের তৃতীয় প্রজন্মের দুটি রিয়্যাক্টর স্থাপন করা হচ্ছে। প্রতিটি ইউনিটের উৎপাদন ক্ষমতা ১,২০০ মেগাওয়াট। দুটি ইউনিট চালু হলে কেন্দ্রটির মোট উৎপাদন ক্ষমতা হবে ২,৪০০ মেগাওয়াট। সংশ্লিষ্টদের মতে, রিয়্যাক্টরগুলো আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মানদণ্ড পূরণে সক্ষম। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক সংস্থা রোসাটম।  

কামিনীর গন্ধে তুমি

আকাশের নীলে কীবা কবিতার মিলে না গোলাপের সুরভিতে ডানা মেলা চিলে না। গোধূলির রং এসে সন্ধ্যায় যায় মেশে কোথাও তো নেই তুমি গল্পের শুরু-শেষে।   চাদরের আদরে না না ভোরের রবিতে না শিমুল কোলে থাকা কোকিলের ছবিতে। রিমঝিম টুপটাপ বরষার ছন্দে তোমাকেই খুঁজে পাই কামিনীর গন্ধে।  

তোমাকেই প্রয়োজন

অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়েছে পৃথিবীর ভাগ্যাকাশ শুরু হয়েছে একের পর এক দুর্যোগ, দুর্ভিক্ষ; মহামারি চলছে পাল্লা দিয়ে। বর্ণাঢ্য আয়োজনে পশুত্ব গিলছে মনুষ্যত্ব অ-অনুমেয়— কতটা লম্বা মৃত্যুর মিছিল?   অশান্ত, ভীষণ প্রকৃতি এখন। ধৈর্য, সহনশীলতার হয়েছে অকালমৃত্যু দানবীয় শক্তিতে জ্বলে উঠেছে আগ্নেয়গিরি। বিষাক্ত বিষ উদগিরিত হচ্ছে গলগলিয়ে লাভার তাপে অঙ্গার হলো পাখির নীড়।   এমন দুর্যোগকালীন সময়ে তোমাকে ভীষণ প্রয়োজন, কবিতা। কেবল তুমিই জানো স্বার্থের বেড়া ভেঙে প্রেমের কুটির রচনার মন্ত্র। তুমিই পারো ধ্বংসস্তূপকে রূপ দিতে শৈল্পিক।   এমন ধবধবে ভূতুড়ে দিনে তোমাকে ভীষণ প্রয়োজন, কবিতা। তোমার জাদুকরি শব্দরাই পারবে মোহের ঝকমকি সরিয়ে জাগ্রত পতাকা ওড়াতে। তোমার আগুনঝরা কথা স্ফুলিঙ্গের মতো ঘুরবে কালের আকাশে।  

বাবারা এমনই

পিঠে পেট ঠেকেছে, তবু আনন্দ-বেসাতির কমতি নেই রোদে পুড়ে ঝড়-বৃষ্টিতে ভিজে  একটা মানুষ জীবন-যুদ্ধে লড়ে যায় অহর্নিশি প্রসন্নতার আলপথে খোঁজে কষ্টের সুখ চোখের দীপ্র জ্যোতিতে প্রিয় সন্তানের মুখ কষ্টের টানাপোড়েনেও বাবা যেন সাঁকো বাঁধা সেতু- জীবন-নদীর দুই তীর অপত্য স্নেহে আগলে বেঁধে রাখে। নদীর স্রোত কোথাও খরস্রোতা, কোথাও ধীর লয় রোদে পুড়ে, ঝড়-বৃষ্টিতে ভিজে পরিশ্রমী বাবারা এমনই বহমান নদী।

Top week

শেষের অনুশোচনা
সাহিত্য

শেষের অনুশোচনা

জুলাই ২০, ২০২৬ 0