(প্রথম পর্ব) একদিন সম্পর্কের বাজারে গিয়েছিলাম। বাজারটা অদ্ভুত! সেখানে আলু-পেঁয়াজ, কাপড়-চোপড়, সোনা-রুপা কিছুই বিক্রি হয় না। শুধু সর্ম্পক। ছোট ছোট দোকানে সাজানো আছে মানবতা, ভালোবাসা, বিশ্বাস, দায়িত্ব, আত্মীয়তা, স্বার্থ, ক্ষমতা, যেন মানুষের জীবনকে টুকরো টুকরো করে তুলে রাখা হয়েছে। একজন দোকানির সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই সে মাথা তুলে তাকাল— কী চাই? আমি বললাম— একটু সর্ম্পক। সে হেসে বলল— কোনটা? মানবতার, না ভালোবাসার? বিশ্বাসের, না ব্যবসার? আমি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললাম— বন্ধুত্বের। লোকটা তখন অদ্ভুতভাবে আমার দিকে তাকাল। যেন বহুদিন পরে কোনো বিলুপ্ত শব্দ শুনেছে। তারপর ধীরে ধীরে বলল— জনাব, পৃথিবী এখনো যে কটা কারণে টিকে আছে, বন্ধুত্ব তার মধ্যে একটা। কিন্তু দুঃখিত, এই জিনিসি বিক্রির জন্য নয়। সেদিন দোকান থেকে বেরিয়ে এসে অনেকক্ষণ হাঁটলাম। মনে হচ্ছিল, লোকটা বোধহয় সত্যি কথা বলেছে। চারপাশে কত মানুষ! বিমানবন্দরে মানুষ, রেলস্টেশনে মানুষ, বিশ্ববিদ্যালয়ে মানুষ, অফিসে মানুষ, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মানুষ। মানুষ আর মানুষ। কিন্তু বন্ধু? বন্ধু যেন বর্ষার দিনে মাঠের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা একা কদমগাছ। আছে কিন্তু সহজে পাওয়া যায় না। প্রবাসে এসে এই অভাবটা আরও বেশি টের পাই। একেক দিন শরীর ভালো থাকে না; একেক দিন মন। আবার কোনো কোনো দিন দুটোই ভালো থাকে না। সেই দিনগুলোতে খুব ইচ্ছে করে পাশে বসে কেউ নির্বিকার মুখে এক কাপ চা খেতে খেতে বলুক— তোর চেহারা দেখে মনে হচ্ছে পৃথিবীর শেষ দিন আজ। তারপর দুজন মিলে হাসতে হাসতে পৃথিবীর শেষ দিনটাও পার করে দেয়া যেত। এখানে অনেক মানুষের সঙ্গে পরিচয় হয়েছে। একসঙ্গে খয়েছি, গল্প করেছি, লং ড্রাইভে গিয়েছি, ইউরোপের পুরোনো শহরে হাঁটাহাঁটি করেছি, আমেরিকার সরল রেখার মতো দীর্ঘ মহাসড়কে গাড়ি চালাতে চালাতে সূর্যাস্ত দেখেছি। কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার হলো, পরিচয় হয়েছে অনেক, বন্ধুত্ব হয়নি তেমন। আজকাল সর্ম্পকগুলো কেমন যেন মোবাইল ফোনের অ্যাপের মতো। ডাউনলোড করা যায় সহজে, আবার ডিলিট করাও সহজ। একটি অপছন্দের মন্তব্য। একটি ভিন্ন মত। একটি না-পছন্দ সিদ্ধান্ত। ব্যস, সম্পর্কের সমাপ্তি। তখন স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের বন্ধুদের কথা মনে পড়ে। তারা ছিল অন্য রকম। আমাদের কাছে তখন পৃথিবী ছিল ছোট। কিন্তু বন্ধুত্ব ছিল বিশাল। আমাদের জাতিসংঘ ছিল না, ছিল বন্ধুসংঘ। আমাদের পাখা ছিল না, কিন্তু উড়ে যাওয়ার স্বপ্ন ছিল। ঘাসফড়িংয়ের পেছনে দৌড়ানোর সময় ছিল। আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকার সময় ছিল। বৃষ্টির শব্দ শোনার সময় ছিল। কোজাগরী পূর্ণিমার রাতে জ্যোৎস্না গুনে গুনে ভোর করে দেয়ার সময় ছিল। আমরা তখন জানতাম না পৃথিবী কত জটিল! জানতাম না মানুষ একদিন এত ব্যস্ত হয়ে যাবে। শুধু জানতাম, বিকেলে মাঠে দেখা হবে। এই জানাটুকুই যথেষ্ট ছিল। আজ বুঝি, মানুষ বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জিনিস নয়, সময় হারায়। আমি বাংলাদেশকে যতটা মিস করি, তার চেয়েও বেশি মিস করি বাংলাদেশের কিছু সময়কে। ঝুমবৃষ্টির দুপুর। বর্ষণমুখর সন্ধ্যা। শীতের সকাল। ডিমভরা পুঁটি মাছ ভাজা ঘ্রাণ। ধানখেতের পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়া বিকেল। আর মিস করি সেই সব মানুষকে যাদের সঙ্গে কোনো প্রয়োজন ছাড়া ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকা যেত। একবার একজন জিজ্ঞেস করেছিল— বাংলাদেশে যাচ্ছি, তোর জন্য কী আনব? আমি বলছেলিাম— যদি পারিস, চৈত্রদিনের একটা ঘুঘু-ডাকা দুপুর নিয়ে আয়। সে ভেবেছিল আমি মজা করছি। আসলে করিনি। মানুষের জীবনে একটা সময় আসে, যখন সে বস্তু নয়, মুহূর্ত সংগ্রহ করতে চায়। আমাদেরও মনে হয় সেই সময় এসেছে। ছোটবেলায় আমাদের বাড়িতেও কোনো ঘড়ি ছিল না। আম্মা শুকতারা দেখে ভোরের সময় আন্দাজ করতেন। তারপর আমাকে ডাকতেন। আমি আধোঘুমে চোখ খুলে বলতাম— এখনো তো অন্ধকার। আম্মা বলতেন— আগে শুরু কর বাবা। পড়তে পড়তে সব আলো হয়ে যাবে। বহু বছর কেটে গেছে। আমি এখনো পড়ছি। কতটুকু আলো হলো জানি না। তবে এটুকু বুঝেছি, মানুষের জীবনের সবচেয়ে সুন্দর আলোগুলো বই থেকে আসে না। আসে মানুষ থেকে। বন্ধু থেকে। ভালোবাসা থেকে। স্মৃতি থেকে। এই যে আজ এত দূরে বসে আছি, হাজার হাজার মাইল দূরে, তবু কোনো কোনো সন্ধ্যায় হঠাৎ মনে হয়, ক্যাম্পাসের কোনো রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছি। বন্ধুরা পাশে আছে। কেউ রাজনীতি নিয়ে তর্ক করছে। কেউ প্রেমে ব্যর্থ হয়ে পৃথিবী ধ্বংসের ঘোষণা দিচ্ছে। কেউ আবার অবলীলায় পকেট থেকে শেষ দশ টাকা বের করে সবাইকে চা খাওয়াচ্ছে। সেই সব বিকেল কোথায় গেল? কোথায় গেল সেই মানুষগুলো? আমরা কি সত্যিই বড় হয়ে গেছি? নাকি শুধু দূরে সরে গেছি? বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে একটা বিষয় বুঝেছি। মানুষের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বর্পূণ সম্পর্কগুলো অনেক সময় নিয়মিত যোগাযোগে বেঁচে থাকে না। বেঁচে থাকে বিশ্বাসে। কোনো কোনো বন্ধুর সঙ্গে বছরের পর বছর কথা হয় না। তার পরও গভীর রাতে ফোন করলে সে বলবে— বল, কী হয়েছে? এবং এই একটি প্রশ্নই যথেষ্ট। কারণ সত্যিকারের বন্ধুত্বের অভিধানে ‘কেন’ শব্দটা খুব কম থাকে। সেখানে থাকে শুধু— ‘আমি আছি।’ [চলবে]
এক দিন দুদিন করে বাবার বুকেই কেটে যায় শৈশবের কয়েকটি বছর। আজ যেভাবে আমরা সন্তানকে রাতে বুকের ওপর শুইয়ে রাখি, এক দিন আমার বাবাও তার বুকের ওপর আমাকে ঘুমিয়ে রাখত। বাবারা এভাবেই সব সহ্য করে। বুকে সন্তান আর মাথায় সংসারের বোঝা বহন করে বাবা। কোনো দিন সন্তান বোঝা না হলেও ঠিকই অনেক বাবা একদিন সন্তানের কাছে বোঝা হয়! কেউ কেউ তাদের ছুড়ে ফেলে রাস্তায়। আমার বাবাকে আমি বহুভাবে দেখেছি। আমার শিশুবেলায় বাবার কাঁধে চড়ে যখন পৃথিবীটাকে দেখতাম, তখন বাবা ছিল এক রকম। বুঝতাম, বাবাদের কাঁধ আমার আশ্রয়। বিকেল হলেই কাঁধে চড়ে মাঠে যেতাম। যখন শিশুকাল পেরিয়ে আমি মুক্ত আকাশে উড়ে বেড়াই কৈশরের রঙিন জগতে, বাবা তখন আমার হিরো। আমি বাবাকেই অনুসরণ করতাম, আর আমার বড় হওয়ার সাথে সাথে বুঝলাম বাবা এক বটবৃক্ষ। শুধু বটবৃক্ষ নন, বাবা এক মেশিন। টাকা দরকার, পাচ্ছি, খাবার দরকার, বাবা বাজার থেকে আনছেন। সত্যি বলতে কি জীবনে যে নিশ্চিন্ত কয়েকটি বছর, তা কেবল মা-বাবা জীবিত থাকাকালীন শৈশব আর কৈশরের দিনগুলোই। তার পর থেকে সব ফ্যাকাশে হতে থাকে। সংসারে বাবাকে আমি বেশি অনুভব করেছি আমি নিজে বাবা হওয়ার পর থেকে। বাবাকে নিয়ে যেসব প্রশ্নের উত্তর আমি যৌবনে পাইনি, সেসবের উত্তর পেয়েছি আমি বাবা হওয়ার পর। বাবা যে সংসারের একটি বটগাছ, তখন আমি আস্তে আস্তে বুঝতে শুরু করি। আমাদের সমাজে যখন মাতৃত্বের জয়গান, সেখানে কমই বন্দনা হয় পিতৃত্বের, এ দোষ সমাজের নয়। আমাদের দৃষ্টিতে এই দৃষ্টিভঙ্গির সূত্রপাত সংসারেই। পরিশ্রান্ত সংসারের বাবার সাথে তার আদরের সন্তানদের দেখা হয় কমই। আহারের জোগান দিতেই কেটে যায় দিন-রাত। কোনোমতে টানা একটি সংসার সন্তান নিয়ে মা যখন কষ্ট করে, তখন সেটা চোখে পড়ে কিন্তু পেছন থেকে পুরো পরিবারের জন্য অবিশ্রান্ত খেটে যায় সেই সংসারের বাবা। আমার শৈশবের দেখা বাবা তখন বদলে যায়। আমি তখন বাবাকে বুঝতে শিখি। আমি বুঝতে পারি কেন বাবার কাছে চাইলেই কোনো জিনিস সহজে পাই না। একসময় ভাবতাম, হয়তো বাবা ইচ্ছে করেই আনে না। পরে বুঝলাম, এর জন্যও বাবার চোখের জল ঝরে। এই বাবার হাত ধরেই আমার স্কুলজীবনের সাথে পরিচয়, আমার প্রথম বাইরের জগতে পা রাখা। যখন আমি আমার সন্তানের চাহিদার জোগান দিতে পারতাম না, তখন বাবার মুখটা মনে পড়ত। বাবাও হয়তো দিতে না পারার কষ্টে বিঁধত। আমি ভাবতাম, বাবা চাইলেই পারে। বাবার ঘামে ভেজা শার্টের প্রতি বিরক্ত ছিলাম। বছর কেটে যেত এক জোড়া শার্ট আর প্যান্ট দিয়ে। জুতো জোড়া কেটে যেত বছরের পর বছর। কোনো দিন দেখিনি একটু বিলাসিতা করে সময় কাটানো। ভাবতাম, বাবারা মনে হয় এতটাই ব্যস্ত হয়। কিন্তু বুঝতাম না সকাল থেকে রাত পর্যন্ত কেন বাবা ব্যস্ত থাকে? আজ জানি, মধ্যবিত্ত পরিবারের বাবারা কোনো দিনই অবকাশ পায় না। পরিবারের সদস্যদের চিন্তা করতে করতেই দিন-রাত এক হয়ে যায়। এই যে আজ কত বাবাকে দেখা পাওয়া যায় দেশের বৃদ্ধাশ্রমগুলোতে, এসব কেন হয়েছে? আইন করে মা-বাবাকে সন্তানদের কাছে রাখতে বাধ্য করতে হবে। যখন দেখি সম্পত্তি ভাগাভাগি নিয়ে দ্বন্দ্বে বাবার লাশটা পর্যন্ত কবর দিতে আটকে রাখা হয়েছে, তখন মনে হয় বাবার ছোট্ট ওই বুকটা যে বড় জমিন ছিল, সেখানে তো সবার ঠাঁই ছিল। আজ তবে কেন এই পরিহাস! একবার অবশ্য অবসরের সময় পায়। আমার বাবাও পেয়েছিল। যেদিন আমার বাবার দেহটা নিথর নিস্তব্ধ হয়ে গেল, সেদিন আর বাবার কোনো ব্যস্ততা দেখলাম না। দেখলাম, আমার মধ্যবিত্ত বাবার তখন আর কোনো তাড়া নেই। নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে আছে। সংসারের সব ভার তখন ছেড়ে দিয়েছে আমার ওপর। মধ্যবিত্ত মার্কা সংসার আমাকে স্পর্শ করেনি। অথচ মানুষটাকে আমি কোনো দিন নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পর্যন্ত দেখিনি। ঘুমের ভেতরেই কী যেন ভাবত! আমি জানি, বাবা সংসারের কথা ভাবত। পরদিন কী দিয়ে চলবে, সেই কথা ভাবত। মধ্যবিত্ত বাবাদের এ কথা ভাবতে হয়। প্রতিটি দিন, প্রতিটি মুহূর্ত আমি বাবাকে সংগ্রাম করতে দেখেছি। আমি নিজেও এখন বাবার মতো হয়ে গেছি। এক শার্ট গায়েই মাসের পর মাস কেটে যায়। আর নতুন জুতো তো কয়েক বছর। আমিও পরের দিনের কথা ভাবি। আর রাত একটু গভীর হলে মাথা নিচু করে বাড়ি ফিরি। এভাবে বহু বাবা রাতে ব্যর্থতার বোঝা নিয়ে বাড়ি ফিরে আসে, সন্তানের চাহিদা পূরণ করতে না পারায় নীরব থাকে। রাতের আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে কোটি কোটি নক্ষত্রের মাঝে বাবাকে খুঁজি। বাবাকে কিছু কথা বলতে চাই। বলতে চাই, বাবা আমি ধীরে ধীরে তোমার মতো হয়ে গেছি। একদিন ঠিক তোমার কাছেই চলে আসব। বাবাকে এখন সবচেয়ে বেশি মিস করি। তখন বাবার সম্পর্কে যে ধারণাগুলো ছিল, এখন তা পাল্টেছে। জানি, একদিন আমিও বাবার মতো থেমে যাব। সব বাবাকেই থেমে যেতে হয়। আবার সব বাবাই বেঁচে থাকে সন্তানের বুকে।
মোবারক হোসেন ছিলেন শহরের প্রান্তে ছোট একটি ব্যবসার মালিক। সারা জীবন হিসাবি, কিপ্টে ও আত্মকেন্দ্রিক মনোভাবের কারণে তাঁর সুনাম কখনো গড়ে ওঠেনি। ছেলেবেলায় তাঁর পরিবার অভাবী ছিল, কিন্তু মা-বাবা সব সময় চেষ্টা করতেন সন্তানদের প্রয়োজন পূরণ করতে। অথচ সেই মোবারক সামান্য টাকা জমাতে গিয়ে মা-বাবার ওষুধ কেনা থেকেও পিছপা হয়েছেন। আত্মীয়স্বজনের বিপদে কখনো একটি পয়সা দেননি, এমনকি বন্ধুবান্ধবের কাছ থেকে দূরে থেকেছেন কেউ ধার চেয়ে বসে এই ভয়ে। সময়ের সাথে সাথে মোবারকের ব্যবসা জমে উঠল। দোকান থেকে উপার্জিত টাকা তিনি ব্যাংকে জমাতেন, ফিক্সড ডিপোজিট করতেন, আর স্বর্ণ কিনে লুকিয়ে রাখতেন পুরোনো ট্রাংকে। কেউ জানত না তাঁর আসল সম্পদের পরিমাণ। অথচ নিজের বাড়িটাও পুরোনো, ফাটল ধরা দেয়ালে ভরা। সেখানেই থাকতেন একাকী, রান্নার কাজ করতেন নিজেই, যেন একটা ডিমও অপচয় না হয়। বয়স যখন ষাট পেরিয়েছে, তখন হঠাৎ একদিন সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি একটি বাগানবাড়ি বানাবেন শহরের বাইরে। শেষ বয়সে একটু খোলামেলা পরিবেশে থাকা যাবে, এই যুক্তি দেখিয়ে অনেক টাকা খরচ করলেন। বাড়িটি বানাতে গিয়ে বহু শ্রমিক, ইঞ্জিনিয়ার নিয়োগ দিলেন। মোবারক বাড়ির সব খরচ নিজ হাতে হিসাব রাখতেন। ঘরগুলো আধুনিক, দেয়ালে কাঠের কারুকাজ, বারান্দায় দোলনা — সবই পরিপাটি, নিখুঁত। কিন্তু তবুও কেউ ছিল না পাশে। তিন বছর পর ওই বাড়িতে গিয়ে থাকতে শুরু করলেন মোবারক। বড় গেট, ফুলে ভরা বাগান, হাঁটার পথ, বিশ্রামের ছায়া — সবই ছিল, কিন্তু সঙ্গী বলতে কেউ ছিল না। একদিন হঠাৎ অসুস্থ বোধ করলেন। গা কাঁপুনি, জ্বর, দুর্বলতা। স্থানীয় ডাক্তার প্রথমে পাত্তা দিলেন না। কিন্তু দিন পেরোতে না পেরোতেই বোঝা গেল সমস্যাটা গুরুতর। শহরে গিয়ে রক্ত পরীক্ষা করালেন। ধরা পড়ল প্যানক্রিয়াস ক্যান্সার, তৃতীয় স্টেজ। হাসপাতালে শুয়ে শুয়ে মোবারক প্রথমবারের মতো ভাবলেন, এই বিশাল বাড়ি, জমানো টাকা, ব্যাংক ব্যালেন্স — সবই কেমন অর্থহীন লাগছে! জীবন এতটাই ক্ষণস্থায়ী, অথচ তিনি সারা জীবন কাটালেন হিসেব কষে। বাবার জীবনের শেষ সময়ে একটা ইনহেলার কেনেননি, মায়ের চোখে ছানি অপারেশনের খরচ দিতে অস্বীকার করেছিলেন। ভাতিজার পড়াশোনার খরচ না দেয়ায় কলেজে ভর্তি হতে পারেনি ছেলেটি। আজ সেই মোবারকের পাশে কেউ নেই। এক সন্ধ্যায় হাসপাতালের জানালায় তাকিয়ে থাকতে থাকতে চোখ ভিজে উঠল তাঁর। ছোট একটি মেয়ে পাশের রোগীকে তার বাবাকে ফল খাওয়াচ্ছে। দৃশ্যটি তাঁকে মনে করিয়ে দিল, তাঁর একটাই দোষ, ‘ভয় আর অবিশ্বাসে ভরা এক হৃদয়’। তিনি ভালোবাসতে পারেননি, কাউকে বিশ্বাস করতে পারেননি, এমনকি কাছের লোকজনকেও সাহায্য করতে পারেননি। টাকা ছিল, হৃদয় ছিল না। মোবারক সেই রাতে একজন নার্সকে ডেকে বললেন, “একটা কাজ করে দেবে মা?” নার্স বলল, “বলুন কাকা।” তিনি বললেন, “এই চিঠিটা আমার এলাকার মসজিদের ইমাম সাহেবকে পৌঁছে দেবে। আর যদি আমি বেঁচে না থাকি, আমার ঘরের আলমারির ভেতর থেকে সব কাগজ ও টাকা আমার গ্রামের দরিদ্র লোকজনের জন্য ওয়াকফ করে দিয়ো।” চিঠিতে তিনি তাঁর কিপ্টামির স্বীকারোক্তি লিখেছিলেন। ক্ষমা চেয়েছিলেন মা-বাবার কাছেও। আর সব সম্পত্তি দিয়ে যেতে চেয়েছিলেন এতিমখানা, হাসপাতাল এবং গ্রামের দরিদ্রদের জন্য। দুদিন পর মোবারক হোসেন মারা গেলেন। কেউ খুব একটা কাঁদেনি, কিন্তু তাঁর চিঠি যখন প্রকাশিত হলো, তখন অনেকের চোখে পানি এসেছিল। এক কাপুরুষ, কিপ্টে মানুষ শেষ জীবনে বুঝেছিলেন, মানুষের জীবনের আসল সম্পদ টাকা নয়, বরং সম্পর্ক, সহানুভূতি আর উদারতা। তাঁর তৈরি বাগানবাড়িটি এখন এক বৃদ্ধাশ্রম, যেখানে অনাথ ও অসহায় বৃদ্ধরা বসবাস করেন। তাঁর কিপ্টে জীবনের শেষ অধ্যায়ে পাওয়া অনুশোচনাই হয়তো মানুষের জন্য বড় একটি প্রাপ্তি হয়ে রয়ে গেল — একটা নিঃশব্দ শিক্ষা।
চলতি বছরের আগস্টের শেষ দিকে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে বলে জানিয়েছেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম। তিনি আশা প্রকাশ করেন, আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে কেন্দ্রটির প্রথম ইউনিট থেকে ১,০০০ মেগাওয়াটেরও বেশি বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা সম্ভব হবে। অন্যদিকে নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেডের (এনপিসিবিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. মো. জাহেদুল হাসান জানিয়েছেন, কেন্দ্রটির প্রথম ইউনিট ২০২৭ সালের শুরুতে এবং দ্বিতীয় ইউনিট ২০২৮ সালের শুরুতে পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্যিক উৎপাদনে যাবে। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের নিরাপত্তা, কমিশনিং, পরিচালনাগত প্রস্তুতি এবং সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত নানা প্রতিবেদনকে কেন্দ্র করে জনমনে বিভিন্ন প্রশ্ন ও কৌতূহল তৈরি হয়েছে। এসব বিষয়ে ড. জাহেদুল হাসানের সঙ্গে কথা হলে তিনি কেন্দ্রটির নিরাপত্তা, পরিচালনা, আন্তর্জাতিক তদারকি কাঠামোসহ গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সম্পর্কে ব্যাখ্যা দেন। ড. জাহেদুল হাসান বলেন, একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র কোনো একক প্রতিষ্ঠানের সিদ্ধান্তে পরিচালিত হয় না। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে একাধিক স্বাধীন কারিগরি, নিয়ন্ত্রক ও নিরাপত্তা সংস্থার সমন্বিত তদারকির মাধ্যমে এর প্রতিটি ধাপ পরিচালিত হয়। তিনি জানান, বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন (বিএইসি) প্রকল্পের মালিক হিসেবে নির্মাণ চুক্তি বাস্তবায়ন এবং স্থাপনা গ্রহণের দায়িত্ব পালন করছে। নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেড আইন অনুযায়ী কেন্দ্রটির অপারেটিং অর্গানাইজেশন। কমিশনিং, নিরাপদ পরিচালনা, রক্ষণাবেক্ষণ এবং ভবিষ্যতে ডিকমিশনিং পর্যন্ত সব অপারেশনাল দায়িত্ব এনপিসিবিএলের ওপর ন্যস্ত। অন্যদিকে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ একটি স্বাধীন নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে আন্তর্জাতিক ও জাতীয় নিরাপত্তা মানদণ্ড অনুযায়ী প্রকল্পের প্রতিটি ধাপ মূল্যায়ন করে প্রয়োজনীয় লাইসেন্স প্রদান করছে। কমিশনিং কার্যক্রমের স্বাধীন কারিগরি মূল্যায়নের জন্য বিএইবিএ আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ভিও সেফটিকে এক্সপার্ট অর্গানাইজেশন হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে। এ ছাড়া রাশিয়ার সিআরইএ কমিশনিং, অপারেশনাল প্রস্তুতি, অপারেটর প্রশিক্ষণ এবং জ্ঞান স্থানান্তরে এনপিসিবিএলকে সহায়তা করছে। রাশিয়ার স্বাধীন নিয়ন্ত্রক সংস্থা Rostechnadzor গুরুত্বপূর্ণ কমিশনিং পর্যায়ে বিএইআরএর সঙ্গে প্রযুক্তিগত অভিজ্ঞতা বিনিময় করছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা বিভিন্ন Peer Review Mission ও Technical Review পরিচালনার মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রস্তুতি আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মানদণ্ড অনুযায়ী মূল্যায়ন করছে এবং প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিচ্ছে। ড. জাহেদুল বলেন, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত একাধিক জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের স্বাধীন কারিগরি মূল্যায়ন, নিয়ন্ত্রক অনুমোদন এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মানদণ্ড অনুসরণ করেই গ্রহণ করা হয়। এনপিসিবিএল এখনো দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় সক্ষমতা অর্জন করতে পারেনি—এমন সমালোচনার বিষয়ে ড. জাহেদুল বলেন, পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনার মূল ভিত্তি হলো দক্ষ জনবল ও শক্তিশালী নিরাপত্তা সংস্কৃতি। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, গত এক দশকে সরকার এ খাতে ব্যাপক বিনিয়োগ করেছে। শত শত প্রকৌশলী, অপারেটর, রিঅ্যাক্টর বিশেষজ্ঞ, রসায়নবিদ, বিকিরণ সুরক্ষা কর্মকর্তা, রক্ষণাবেক্ষণ প্রকৌশলী রাশিয়াসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছেন। তারা Full Scope Simulator, On-the-Job Training এবং Classroom Training-সহ আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ সফলভাবে সম্পন্ন করেছেন। তিনি আরও বলেন, প্রতিটি অপারেটরকে বিএইআরএর কঠোর লাইসেন্সিং ও মূল্যায়ন প্রক্রিয়া অতিক্রম করতে হয়। একই সময়ে সিআরইএর বিশেষজ্ঞরা কমিশনিং পর্যায়ে এনপিসিবিএলের কর্মীদের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করে আন্তর্জাতিক সর্বোত্তম চর্চা অনুযায়ী জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা স্থানান্তর নিশ্চিত করছেন। ফলেএনপিসিবিএল বর্তমানে প্রযুক্তিগত, অপারেশনাল ও প্রাতিষ্ঠানিক—সব দিক থেকেই দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনার জন্য একটি সক্ষম Operating Organization হিসেবে গড়ে উঠেছে। স্পেন্ট ফুয়েল (ব্যবহৃত পারমাণবিক জ্বালানি) ব্যবস্থাপনা এবং রাশিয়ার সঙ্গে এ বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত চুক্তি হয়নি—এমন আলোচনার প্রসঙ্গে ড. জাহেদুল বলেন, আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শিল্পের প্রচলিত পদ্ধতি সম্পর্কে সীমিত ধারণার কারণেই এ ধরনের বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছে। তিনি জানান, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক সংস্থা রোসাটমের মধ্যে চুক্তি ইতোমধ্যে স্বাক্ষরিত হয়েছে। এর পাশাপাশি বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন ও টিভিইলের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি পারমাণবিক জ্বালানি সরবরাহের ফ্রেমওয়ার্ক এগ্রিমেন্ট বিদ্যমান রয়েছে। তিনি আরও বলেন, আইএইএর নিরাপত্তা নির্দেশিকা অনুযায়ী ব্যবহৃত পারমাণবিক জ্বালানি রিঅ্যাক্টর থেকে অপসারণের পর তাৎক্ষণিকভাবে অন্য দেশে পাঠানো হয় না। প্রথমে কেন্দ্রের নকশার অংশ হিসেবে নির্মিত স্পেন্ট ফুয়েল পোলে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত নিরাপদে সংরক্ষণ ও শীতলীকরণ করা হয়, যা বিশ্বের সব আধুনিক পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রেই অনুসরণ করা হয়। পরবর্তীতে বিদ্যমান আন্তঃরাষ্ট্রীয় চুক্তি, বাণিজ্যিক ব্যবস্থা এবং সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষের অনুমোদনের ভিত্তিতে পরবর্তী ব্যবস্থাপনা সম্পন্ন হয়। উল্লেখ্য, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পে রাশিয়ার ভিবিইআর-১২০০ মডেলের তৃতীয় প্রজন্মের দুটি রিয়্যাক্টর স্থাপন করা হচ্ছে। প্রতিটি ইউনিটের উৎপাদন ক্ষমতা ১,২০০ মেগাওয়াট। দুটি ইউনিট চালু হলে কেন্দ্রটির মোট উৎপাদন ক্ষমতা হবে ২,৪০০ মেগাওয়াট। সংশ্লিষ্টদের মতে, রিয়্যাক্টরগুলো আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মানদণ্ড পূরণে সক্ষম। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক সংস্থা রোসাটম।
আকাশের নীলে কীবা কবিতার মিলে না গোলাপের সুরভিতে ডানা মেলা চিলে না। গোধূলির রং এসে সন্ধ্যায় যায় মেশে কোথাও তো নেই তুমি গল্পের শুরু-শেষে। চাদরের আদরে না না ভোরের রবিতে না শিমুল কোলে থাকা কোকিলের ছবিতে। রিমঝিম টুপটাপ বরষার ছন্দে তোমাকেই খুঁজে পাই কামিনীর গন্ধে।
অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়েছে পৃথিবীর ভাগ্যাকাশ শুরু হয়েছে একের পর এক দুর্যোগ, দুর্ভিক্ষ; মহামারি চলছে পাল্লা দিয়ে। বর্ণাঢ্য আয়োজনে পশুত্ব গিলছে মনুষ্যত্ব অ-অনুমেয়— কতটা লম্বা মৃত্যুর মিছিল? অশান্ত, ভীষণ প্রকৃতি এখন। ধৈর্য, সহনশীলতার হয়েছে অকালমৃত্যু দানবীয় শক্তিতে জ্বলে উঠেছে আগ্নেয়গিরি। বিষাক্ত বিষ উদগিরিত হচ্ছে গলগলিয়ে লাভার তাপে অঙ্গার হলো পাখির নীড়। এমন দুর্যোগকালীন সময়ে তোমাকে ভীষণ প্রয়োজন, কবিতা। কেবল তুমিই জানো স্বার্থের বেড়া ভেঙে প্রেমের কুটির রচনার মন্ত্র। তুমিই পারো ধ্বংসস্তূপকে রূপ দিতে শৈল্পিক। এমন ধবধবে ভূতুড়ে দিনে তোমাকে ভীষণ প্রয়োজন, কবিতা। তোমার জাদুকরি শব্দরাই পারবে মোহের ঝকমকি সরিয়ে জাগ্রত পতাকা ওড়াতে। তোমার আগুনঝরা কথা স্ফুলিঙ্গের মতো ঘুরবে কালের আকাশে।
পিঠে পেট ঠেকেছে, তবু আনন্দ-বেসাতির কমতি নেই রোদে পুড়ে ঝড়-বৃষ্টিতে ভিজে একটা মানুষ জীবন-যুদ্ধে লড়ে যায় অহর্নিশি প্রসন্নতার আলপথে খোঁজে কষ্টের সুখ চোখের দীপ্র জ্যোতিতে প্রিয় সন্তানের মুখ কষ্টের টানাপোড়েনেও বাবা যেন সাঁকো বাঁধা সেতু- জীবন-নদীর দুই তীর অপত্য স্নেহে আগলে বেঁধে রাখে। নদীর স্রোত কোথাও খরস্রোতা, কোথাও ধীর লয় রোদে পুড়ে, ঝড়-বৃষ্টিতে ভিজে পরিশ্রমী বাবারা এমনই বহমান নদী।